বাবার পথেই হাঁটছেন তেজনারায়ন চন্দরপল, বাংলাদেশকে ভোগালেন ধৈর্যশীল ব্যাটিংয়ে
- আপডেট সময় : ১১:৪৮:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
শিবনারায়ন চন্দরপল মানেই ছিল ক্রিজে বেল ফেলে গর্ত খুঁড়ে গার্ড নেওয়া আর অদ্ভুত এক ব্যাটিং স্টান্স। সেই চন্দরপল এখন আর মাঠ মাতান না, কিন্তু তার রক্তের উত্তরাধিকার বহন করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে খেলছেন ছেলে তেজনারায়ন চন্দরপল। বাংলাদেশ সফরে এসে বাবার সেই পুরনো ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা ও অনুশাসন’ যেন নতুন প্রজন্মের হাত ধরে ফিরে এসেছে। চন্দরপল, নামটা শুনলে আপনার কী মনে পড়ে। প্রথমেই মনে পড়তে পারে বেল খুলে ক্রিজে গর্ত খুঁড়ে গার্ড নেওয়ার জায়গা ঠিক করা, এরপর অদ্ভুত এক ব্যাটিং স্টান্সের বিষয়টি। সেই চন্দরপল এখন আর নেই, অবসর নিয়েছেন বহু আগে। দেখিয়েছেন, প্রজন্ম বদলে গেলেও ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, অনুশাসন’ কখনো কখনো একই থেকে যায়। উইন্ডিজ যখন ওভাবে ব্যাট করছিল ইনিংসের শুরুতে, একেই মনে হচ্ছিল যথার্থ অ্যাপ্রোচ। এরপরই মুদ্রার উল্টো পিঠটা দেখালেন চন্দরপল। হতেই হতো অবশ্য, বাবা শিব তো বহু বছর তাকে হাতে ধরে শিখিয়েছেন কী করে তার মতো ব্যাটিং করতে হয়। বাংলাদেশে আসার আগে তাদেরকে কী করে পড়তে হয়, এখানে কী করে খেলতে হয়, সেটাও কি শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
ম্যাচের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত তেজনারায়নের ব্যাটিং দেখে বাংলাদেশ দলের অতীতের তিক্ত স্মৃতির কথা মনে পড়াটাই স্বাভাবিক। যেভাবে কাজটা করছিলেন, তাতে বাংলাদেশ খানিকটা ফ্ল্যাশব্যাকও পাচ্ছিল অতীতের।
বাংলাদেশের ২৭৩ রানের জবাবে ক্যারিবীয়রা গতকাল বেশ আক্রমণাত্মক শুরু করেছিল। যদিও ৪.৫ ওভারে ২৯ রান তুলেই ওয়ানডে মেজাজে ১৫ রান করে বিদায় নেন ব্রেন্ডন কিং। যখন দ্রুত রান তোলাই ছিল উইকেটের দাবি, তখন তেজ দেখালেন ধৈর্য আর টেকনিকের আসল রূপ। রান উঠছিল ওভারপ্রতি ৬-এর কাছে। বাংলাদেশের মাটিতে পরিসংখ্যানটা অত সমৃদ্ধ নয়, তবে ক্যারিয়ারসেরা ২০৩ রানের ইনিংসটা তিনি খেলেছিলেন এখানেই।
বাবার মতোই অবিচল ছিলেন তেজনারায়ন। ভালো বলগুলো রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে সামলেছেন, আর বাজে বল পেলে আদায় করেছেন রান। প্রথম দিনে সাদমান ইসলামও কিছুটা একই রকম ধৈর্য দেখিয়েছিলেন, তবে তেজনারায়ন তাতে যোগ করেছেন নিখুঁত ধ্রুপদী ছোঁয়া। ক্যারিয়ারজুড়ে শিবনারায়ন বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৪৯.৫ গড়ে রান তুলেছেন, সেই একই যন্ত্রণা যেন ফিরিয়ে আনলেন তার ছেলে। তার ক্যারিয়ার গড় যেখানে ৫১.৩৭, সেখানে বাংলাদেশের বিপক্ষে তা উঠে যেত ১৪৯.৫-এ। একের পর এক বল আসছিল, তিনি সেসব হয় ঠেকাচ্ছিলেন, নাহয় ছেড়ে দিচ্ছিলেন, বাজে বল পেলে শাস্তিও দিচ্ছিলেন। ভালো বলেও তাকে নড়ানো যাচ্ছে না, ফাঁদ পাতলে পা দিচ্ছেন না, একের পর এক বল ঠেকিয়েই যাচ্ছেন… বিষয়টা আর যাই হোক বোলিং দলের জন্য বেশ হতাশা জাগানিয়া।
ব্যাটিংয়ের স্টাইল ভিন্ন হলেও, উইকেট আঁকড়ে থাকার মানসিকতায় তেজ হুবহু তার বাবার প্রতিচ্ছবি। প্রায় ৩১ ওভার উইকেটে থেকে ১৮৪ বল মোকাবেলা করে ৫৬ রান করেছেন তিনি। দীর্ঘ এই ইনিংস কেবল বাংলাদেশের বোলারদের মনোবলেই চিড় ধরায়নি, বরং টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে যাওয়ার সমীকরণেও বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। উইকেটে শুরুর দিন থেকেই টার্ন পাচ্ছিলেন সফরকারী স্পিনাররা। সেখানে উইকেটে টিকে থাকার চেয়ে দ্রুত রান তোলার অ্যাপ্রোচই শ্রেয়, এমনই মনে হচ্ছিল। ধৈর্য্যের প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে যান উইকেটে। ১৪ ইনিংস খেলেই করেছিলেন ৪টি, ফিফটি আছে আরও ৩টি। তবে এইসব পরিসংখ্যান ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে তার ব্যাটিংয়ের বিপরীতে থাকার অনুভূতিটা।
শরীফুল ইসলামের বলে শেষ পর্যন্ত আউট হলেও, সফরকারীদের জন্য তার এই অবদান ছিল অমূল্য। বাবা শিবনারায়ন দীর্ঘ সময় ধরে তাকে যে শিক্ষা দিয়েছেন, তার প্রতিফলন ঘটেছে এই সফরে। তবে সিরিজ কেবল শুরু হয়েছে, সামনে আরও তিনটি ইনিংস খেলার সুযোগ পাবেন তেজ। বাবার শেখানো পথ ধরে বাংলাদেশকে আরও কতবার ভোগাতে পারেন জুনিয়র চন্দরপল, সেটাই এখন দেখার বিষয়। শিবনারায়ন চন্দরপলের আরও একটা বিশেষত্ব ছিল, বাংলাদেশকে পেলেই জ্বলে ওঠা। বাবা শিবনারায়ন যে অতীতে বহুবার তেঁতো স্বাদ দিয়েছেন দলকে।
সূত্র: যুগান্তর
























