ঢাকায় ৮৭ দিন অবস্থানের পর ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমান কূটনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। একান্ত আলাপচারিতায় তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়—এমন ধারণা তিনি মানতে রাজি নন। বরং প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে ভারত সরকার অত্যন্ত আগ্রহী এবং তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত।
ত্রিবেদীর মতে, এই সফর যেন কেবল গতানুগতিক কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, ভারত সেটাই প্রত্যাশা করছে। তিনি অহেতুক বিতর্ক এড়িয়ে দুই দেশের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ঢাকায় এসে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন। এখানকার মানুষের আতিথেয়তা এবং প্রধানমন্ত্রীসহ যাদের সঙ্গেই তার কথা হয়েছে, তাদের আচরণে তিনি মুগ্ধ। তার মতে, ভাষা, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের মিল থাকায় তিনি এখানে খুব একটা তফাৎ অনুভব করেন না। যদিও দুই দেশের মধ্যে কিছু সমস্যা ও সংকট রয়েছে, তবে আলোচনার মাধ্যমেই সেগুলোর সুরাহা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে কেউ নেই।
দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপড়েন ও নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে কূটনৈতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। তবে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকায় আসা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের স্পিকার ওম বিড়লা ও পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির উপস্থিতি সম্পর্ক জোরদারের নতুন সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় পাঠানোর পেছনে ভারতের বিশেষ রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভার প্রাক্তন এই সংসদ সদস্য ও অভিজ্ঞ রাজনীতিকের ওপর দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের বড় দায়িত্ব রয়েছে।
দাওয়াতপত্র নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা সম্পর্কে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ব্রিকস আউটরিচ সেশনের জন্য আমন্ত্রণ দেওয়া হয়। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নাম উল্লেখ না থাকায় ঢাকার পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছিল। এ নিয়ে কূটনৈতিক ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলেও দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার কথা জানিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি দিল্লি গিয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেছেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলানোর ইঙ্গিত দেয়।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত কোনো আগাম প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি নয়। তবে ওসমান হাদির দুই হত্যাকারীকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ভারত ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। অন্যদিকে, শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে বাংলাদেশের কড়া প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার স্পষ্ট করেছে যে, তারা সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়—এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এখন দেখার বিষয়, দুই দেশের মধ্যকার এই দেয়াল ভাঙতে কূটনীতি কতটা সফল হয়।
Leave a Reply