ঢাকা ১১:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজধানীর জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ট্রাম্পের লাগাম কতটা টেনে ধরতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে জয়ী গাজায় সেবা দেওয়া চিকিৎসক অ্যাডাম হামাউয়ি গ্রামবাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী কাচারি ঘর: যে ঘর ছিল গ্রামের প্রাণ, আজ তা শুধুই স্মৃতি সিলেটের মাটিতে জয়ের খরায় থাকা বাংলাদেশের লক্ষ্য ঘুরে দাঁড়ানো ৯ম শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ডিসেম্বরে হতে পারে: এনটিআরসিএ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক চলাচল নিয়ে চীন-কাতার ফোনালাপ সাতক্ষীরা সীমান্তে বিজিবি’র অভিযানে সাড়ে ৩ লাখ টাকার পণ্য জব্দ ইউএনওর সহযোগিতায় রাণীশংকৈলে নবজাতকের  জন্ম, মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন পা হারিয়েও মেলেনি চিকিৎসার সহযোগিতা! ক্ষোভে জলঢাকায় যাত্রীবাহী বাস আটক

ট্রাম্পের লাগাম কতটা টেনে ধরতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩৫:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। এর মাধ্যমে তারা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে রয়েছে। নির্বাচনকালে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং তার কঠোর অভিবাসন নীতির লাগাম টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। তবে আগামী জানুয়ারির আগে কংগ্রেসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে না দলটি। দায়িত্ব নেওয়ার পরও রিপাবলিকানদের সহযোগিতা ছাড়া তাদের পক্ষে নিজেদের সব অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। এর মধ্যে রয়েছে, কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়েই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানো হয়নি। এ ছাড়া ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া শুরু করা কোনো সামরিক সংঘাত ৬০ দিনের বেশি চালানোর ক্ষেত্রে আইনপ্রণেতাদের তা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।

তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের হাতে নতুন কিছু ক্ষমতাও আসছে। সিনেটে বিভিন্ন পদে নিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় প্রভাব রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পাবে তারা। তা সত্ত্বেও সিনেটে যেকোনো সাধারণ বিল পাস করাতে সাধারণত ৬০টি ভোটের প্রয়োজন হয়, যা ডেমোক্র্যাটদের একক শক্তিতে অর্জন করা কঠিন। এর পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। সোমবার এক পডকাস্টে তিনি সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমি সবকিছুতে ভেটো দেব।’ ফলে আগামী দুই বছরে ডেমোক্র্যাটরা বাস্তবে কতটুকু কাজ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সিনেটে কোনো বিল পাস করাতে সাধারণত ৬০ ভোট প্রয়োজন হয়। এতে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এ নিয়ে তিনি ‘একটুও’ উদ্বিগ্ন নন। বিল পাস করুন, কী হয় দেখুন, প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠান।

জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর চ্যালেঞ্জ

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সাধারণ ভোটারদের প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। ডেমোক্র্যাটদের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা। সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও অর্থনীতিবিদ ডিন বাকের জানান, সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং প্রধান বাণিজ্যপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কংগ্রেসের তদারকি ক্ষমতা ব্যবহার করে কিছুটা চাপ তৈরি করা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইরান। এমনকি শুল্ক প্রত্যাহার করা গেলেও বাজারে পণ্যের দাম কমতে সময় লাগতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন বা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় দেওয়া বর্ধিত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক মার্কিন নাগরিকের স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম বেড়েছে। বাকের বলেন, এ ক্ষেত্রেও দুই দলের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। বাকের আরও বলেন, ‘ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে থাকা রিপাবলিকানরা মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া বন্ধ করা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করার পক্ষে থাকতে চাইবেন বলে মনে হয় না।’ বাকেরের মতে, সরকারের নিয়মিত ব্যয়সংক্রান্ত বিলেই এসব স্বাস্থ্যসেবা পদক্ষেপ যুক্ত করে পাশ করিয়ে নেওয়া সম্ভব।

ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ার পেছনে ট্রাম্পের শুল্কনীতিও ভূমিকা রাখছে। উদারপন্থি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভের নীতি ও প্রচারবিষয়ক প্রধান অ্যালেক্স জ্যাকেজ বলেন, ‘দাম রকেটের মতো দ্রুত বাড়ে, কিন্তু পালকের মতো ধীরে কমে।’ আলজাজিরাকে জ্যাকেজ বলেন, ‘কমিটির নেতৃত্বের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এবং প্রধান নির্বাহীদের তলব করে কংগ্রেসে হাজির করানোর মাধ্যমে বাস্তব কিছু ফল পাওয়ার অনেক নজির রয়েছে।’ এসব তদন্তের মাধ্যমে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ বন্ধের নৈতিক চাপ তৈরি করা যায়। তবে কোম্পানিগুলোর ওপর তাদের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। পারসি বলেন, ‘তখন এটি আর শুধু ট্রাম্পের যুদ্ধ থাকবে না। কোন এলাকায় অভিযান চালানো হবে কিংবা কাদের আটক করা হবে, সে বিষয়ে তাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রয়োজনও কমে গেছে।

ট্রাম্পকে জবাবদিহির আওতায় আনার পরিকল্পনা

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লরা ব্লেসিং মনে করেন, নতুন তদন্তের মাধ্যমে ট্রাম্পকে জবাবদিহিতে রাখার সুযোগ রয়েছে। আলজাজিরাকে ই-মেইলে তিনি বলেন, ‘সময় ব্যয় এবং সংবাদপত্রের শিরোনামের বিচারে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা যাবে এই ক্ষেত্রেই।’ হোয়াইট হাউসের অনুমতি ছাড়াই কংগ্রেস বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার খতিয়ে দেখতে পারে।

আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরুর পর ট্রাম্প পরিবারের সম্পদের উৎস নিয়ে তদন্তের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অনেক ডেমোক্র্যাট। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ প্রায় ২২০ কোটি ডলার বেড়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি, ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের ব্যবসা এর অন্যতম উৎস। সম্ভাব্য তদন্তের অংশ হিসেবে ডেমোক্র্যাট সিনেটররা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি দপ্তরে চিঠিপত্র পাঠিয়েছেন। এসব চিঠিতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে করা এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা বা আইসিই তাদের কার্যক্রমে ‘সীমা ছাড়িয়ে গেছে’।

তদন্ত প্রক্রিয়া অবশ্য পুরোপুরি মসৃণ হবে না। কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা আদালতে সমন চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। ব্লেসিং মনে করেন, ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যরা সরাসরি হাজিরা দেবেন না। এ ছাড়া তদন্তে অনিয়ম মিললেও তা থেকে বিচার বিভাগ কতটুকু আইনি ব্যবস্থা নেবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মতো কর্মকর্তাদের অভিশংসনের উদ্যোগ নিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। প্রথম মেয়াদে দুবার অভিশংসিত হওয়া ট্রাম্প বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, তারা এমনটা করলে ডেমোক্রেটিক পার্টি ধ্বংস হয়ে যাবে।’ চূড়ান্ত অভিশংসনের জন্য সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন, যা ডেমোক্র্যাটদের কাছে নেই। তবে ডেমোক্র্যাটরা সরকারি কর্মকর্তা এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। রিপাবলিকান প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য থমাস ম্যাসি জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে বিদায়ী কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে হেগসেথের অভিশংসনের বিষয়ে ভোটাভুটি করতে উদ্যোগ নেবেন তিনি।

অভিবাসন ও সীমান্ত নীতিতে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা

ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি পর্যালোচনা করাও ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম অগ্রাধিকার। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ল সেন্টারের নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হেইডি অল্টম্যান বলেন, এসব তদন্তে আটককেন্দ্রগুলোর পরিবেশ, নির্যাতনের অভিযোগ এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগে করদাতাদের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। অল্টম্যানের মতে, গত দুই বছরে ট্রাম্প প্রশাসনকে অভিবাসন আইন প্রয়োগের জন্য প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ায় আইসিই প্রায় কোনো বাধা ছাড়াই কাজ করতে পারছে।

অল্টম্যান মনে করেন, এই বাহিনীর অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম কমাতে বাজেটে কাটছাঁট করা প্রয়োজন। অল্টম্যান বলেন, ‘অভিযানের গতি কমানো এবং প্রকৃত অর্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও আইন প্রয়োগে নিয়ন্ত্রণ আনতে হলে আগের অধিবেশনে দেওয়া অর্থের বড় অংশ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।’ সীমানা সংক্রান্ত কঠোর অবস্থান শিথিল করতে অর্থসংক্রান্ত বিলে শর্ত যুক্ত করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশল

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, নির্বাহী বিভাগের ভেটো ও রিপাবলিকান বাধার মুখে ডেমোক্র্যাটদের কাজ করা কঠিন হবে। তবে ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বের একাংশের মতে, নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা ভুল হবে। অল্টম্যান বলেন, ‘আমাদের জন্য সবচেয়ে খারাপ হবে হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং বলা যে আমাদের ক্ষমতা সীমিত।’ তবে ত্রিতা পারসির মতে, এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকা রাজনৈতিকভাবে দলটির জন্য টেকসই হবে না।

ডেমোক্র্যাটদের মূল কৌশল হবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিলগুলো উত্থাপন করা এবং ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে ভেটো দিতে বাধ্য করা। এরপর তাকে চ্যালেঞ্জ জানান—মার্কিন জনগণের বিপুল সমর্থন রয়েছে, এমন কোনো বিলে স্বাক্ষর না করার সাহস তিনি দেখাতে পারেন কি না। এর মাধ্যমে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় টান ফেলার রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়ন করতে চায় ডেমোক্রেটিক পার্টি।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ট্রাম্পের লাগাম কতটা টেনে ধরতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা

আপডেট সময় : ১০:৩৫:৪৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। এর মাধ্যমে তারা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে রয়েছে। নির্বাচনকালে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং তার কঠোর অভিবাসন নীতির লাগাম টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনি প্রচার চালিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। তবে আগামী জানুয়ারির আগে কংগ্রেসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে না দলটি। দায়িত্ব নেওয়ার পরও রিপাবলিকানদের সহযোগিতা ছাড়া তাদের পক্ষে নিজেদের সব অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। এর মধ্যে রয়েছে, কংগ্রেসের অনুমোদন না নিয়েই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানো হয়নি। এ ছাড়া ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া শুরু করা কোনো সামরিক সংঘাত ৬০ দিনের বেশি চালানোর ক্ষেত্রে আইনপ্রণেতাদের তা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।

তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের হাতে নতুন কিছু ক্ষমতাও আসছে। সিনেটে বিভিন্ন পদে নিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় প্রভাব রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পাবে তারা। তা সত্ত্বেও সিনেটে যেকোনো সাধারণ বিল পাস করাতে সাধারণত ৬০টি ভোটের প্রয়োজন হয়, যা ডেমোক্র্যাটদের একক শক্তিতে অর্জন করা কঠিন। এর পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। সোমবার এক পডকাস্টে তিনি সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমি সবকিছুতে ভেটো দেব।’ ফলে আগামী দুই বছরে ডেমোক্র্যাটরা বাস্তবে কতটুকু কাজ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সিনেটে কোনো বিল পাস করাতে সাধারণত ৬০ ভোট প্রয়োজন হয়। এতে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এ নিয়ে তিনি ‘একটুও’ উদ্বিগ্ন নন। বিল পাস করুন, কী হয় দেখুন, প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠান।

জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর চ্যালেঞ্জ

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সাধারণ ভোটারদের প্রধান দুশ্চিন্তা ছিল জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। ডেমোক্র্যাটদের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা। সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও অর্থনীতিবিদ ডিন বাকের জানান, সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং প্রধান বাণিজ্যপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কংগ্রেসের তদারকি ক্ষমতা ব্যবহার করে কিছুটা চাপ তৈরি করা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইরান। এমনকি শুল্ক প্রত্যাহার করা গেলেও বাজারে পণ্যের দাম কমতে সময় লাগতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। ২০২৫ সালে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন বা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের আওতায় দেওয়া বর্ধিত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক মার্কিন নাগরিকের স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম বেড়েছে। বাকের বলেন, এ ক্ষেত্রেও দুই দলের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। বাকের আরও বলেন, ‘ট্রাম্প-পরবর্তী সময়ে থাকা রিপাবলিকানরা মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া বন্ধ করা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করার পক্ষে থাকতে চাইবেন বলে মনে হয় না।’ বাকেরের মতে, সরকারের নিয়মিত ব্যয়সংক্রান্ত বিলেই এসব স্বাস্থ্যসেবা পদক্ষেপ যুক্ত করে পাশ করিয়ে নেওয়া সম্ভব।

ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ার পেছনে ট্রাম্পের শুল্কনীতিও ভূমিকা রাখছে। উদারপন্থি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভের নীতি ও প্রচারবিষয়ক প্রধান অ্যালেক্স জ্যাকেজ বলেন, ‘দাম রকেটের মতো দ্রুত বাড়ে, কিন্তু পালকের মতো ধীরে কমে।’ আলজাজিরাকে জ্যাকেজ বলেন, ‘কমিটির নেতৃত্বের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এবং প্রধান নির্বাহীদের তলব করে কংগ্রেসে হাজির করানোর মাধ্যমে বাস্তব কিছু ফল পাওয়ার অনেক নজির রয়েছে।’ এসব তদন্তের মাধ্যমে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ বন্ধের নৈতিক চাপ তৈরি করা যায়। তবে কোম্পানিগুলোর ওপর তাদের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। পারসি বলেন, ‘তখন এটি আর শুধু ট্রাম্পের যুদ্ধ থাকবে না। কোন এলাকায় অভিযান চালানো হবে কিংবা কাদের আটক করা হবে, সে বিষয়ে তাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রয়োজনও কমে গেছে।

ট্রাম্পকে জবাবদিহির আওতায় আনার পরিকল্পনা

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লরা ব্লেসিং মনে করেন, নতুন তদন্তের মাধ্যমে ট্রাম্পকে জবাবদিহিতে রাখার সুযোগ রয়েছে। আলজাজিরাকে ই-মেইলে তিনি বলেন, ‘সময় ব্যয় এবং সংবাদপত্রের শিরোনামের বিচারে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা যাবে এই ক্ষেত্রেই।’ হোয়াইট হাউসের অনুমতি ছাড়াই কংগ্রেস বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার খতিয়ে দেখতে পারে।

আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরুর পর ট্রাম্প পরিবারের সম্পদের উৎস নিয়ে তদন্তের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অনেক ডেমোক্র্যাট। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ প্রায় ২২০ কোটি ডলার বেড়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি, ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের ব্যবসা এর অন্যতম উৎস। সম্ভাব্য তদন্তের অংশ হিসেবে ডেমোক্র্যাট সিনেটররা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি দপ্তরে চিঠিপত্র পাঠিয়েছেন। এসব চিঠিতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে করা এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা বা আইসিই তাদের কার্যক্রমে ‘সীমা ছাড়িয়ে গেছে’।

তদন্ত প্রক্রিয়া অবশ্য পুরোপুরি মসৃণ হবে না। কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা আদালতে সমন চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। ব্লেসিং মনে করেন, ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যরা সরাসরি হাজিরা দেবেন না। এ ছাড়া তদন্তে অনিয়ম মিললেও তা থেকে বিচার বিভাগ কতটুকু আইনি ব্যবস্থা নেবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মতো কর্মকর্তাদের অভিশংসনের উদ্যোগ নিতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। প্রথম মেয়াদে দুবার অভিশংসিত হওয়া ট্রাম্প বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, তারা এমনটা করলে ডেমোক্রেটিক পার্টি ধ্বংস হয়ে যাবে।’ চূড়ান্ত অভিশংসনের জন্য সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন, যা ডেমোক্র্যাটদের কাছে নেই। তবে ডেমোক্র্যাটরা সরকারি কর্মকর্তা এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। রিপাবলিকান প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য থমাস ম্যাসি জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে বিদায়ী কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে হেগসেথের অভিশংসনের বিষয়ে ভোটাভুটি করতে উদ্যোগ নেবেন তিনি।

অভিবাসন ও সীমান্ত নীতিতে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা

ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি পর্যালোচনা করাও ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম অগ্রাধিকার। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ল সেন্টারের নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হেইডি অল্টম্যান বলেন, এসব তদন্তে আটককেন্দ্রগুলোর পরিবেশ, নির্যাতনের অভিযোগ এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগে করদাতাদের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। অল্টম্যানের মতে, গত দুই বছরে ট্রাম্প প্রশাসনকে অভিবাসন আইন প্রয়োগের জন্য প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ায় আইসিই প্রায় কোনো বাধা ছাড়াই কাজ করতে পারছে।

অল্টম্যান মনে করেন, এই বাহিনীর অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম কমাতে বাজেটে কাটছাঁট করা প্রয়োজন। অল্টম্যান বলেন, ‘অভিযানের গতি কমানো এবং প্রকৃত অর্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও আইন প্রয়োগে নিয়ন্ত্রণ আনতে হলে আগের অধিবেশনে দেওয়া অর্থের বড় অংশ ফিরিয়ে নিয়ে তাদের বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।’ সীমানা সংক্রান্ত কঠোর অবস্থান শিথিল করতে অর্থসংক্রান্ত বিলে শর্ত যুক্ত করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশল

অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, নির্বাহী বিভাগের ভেটো ও রিপাবলিকান বাধার মুখে ডেমোক্র্যাটদের কাজ করা কঠিন হবে। তবে ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বের একাংশের মতে, নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা ভুল হবে। অল্টম্যান বলেন, ‘আমাদের জন্য সবচেয়ে খারাপ হবে হাত গুটিয়ে বসে থাকা এবং বলা যে আমাদের ক্ষমতা সীমিত।’ তবে ত্রিতা পারসির মতে, এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকা রাজনৈতিকভাবে দলটির জন্য টেকসই হবে না।

ডেমোক্র্যাটদের মূল কৌশল হবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিলগুলো উত্থাপন করা এবং ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে ভেটো দিতে বাধ্য করা। এরপর তাকে চ্যালেঞ্জ জানান—মার্কিন জনগণের বিপুল সমর্থন রয়েছে, এমন কোনো বিলে স্বাক্ষর না করার সাহস তিনি দেখাতে পারেন কি না। এর মাধ্যমে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় টান ফেলার রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়ন করতে চায় ডেমোক্রেটিক পার্টি।

Facebook Comments Box