ঢাকা ০৫:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ধর্মীয় বিশ্বাস পুঁজি করে ফায়দা হাসিল বন্ধের আহ্বান জহির উদ্দিন স্বপনের টিআইবি: ১০ দলের নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র, সিদ্ধান্ত ব্যক্তিনির্ভর তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক মঙ্গলবার শপথ নেবেন মির্জা ফয়সল ও এলিজা জামান রাজবাড়ীতে মানবপাচার মামলায় দুই আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পুরোনো বাণিজ্য মেলায় শেকৃবি শিক্ষার্থীদের ভাঙচুর, দাবি জমি ফেরত আরব আমিরাতে লরির ধাক্কায় প্রাণ হারালেন বোয়ালখালীর প্রবাসী মহসিন ৩০ বছর পূর্তি উদযাপনে আল জাজিরার আয়োজনে কাতারের আমীর গার্মেন্টস খাতে অস্থিতিশীলতা বরদাশত নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নারায়ণগঞ্জে দুই আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার

টিআইবি: ১০ দলের নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র, সিদ্ধান্ত ব্যক্তিনির্ভর

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:১২:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের চর্চা নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি বিশদ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এই গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অন্তত ১০টি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পরিবারকেন্দ্রিক। এর মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি।

গবেষণাটি ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়কালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ক্ষেত্রবিশেষে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় মোট ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ৩২টি দল তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনা সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় নেতৃত্বে রয়েছেন। এছাড়া ১২টি দলের প্রধান অন্তত ১০ বছর ধরে তাদের পদে আসীন আছেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বাদে অন্য কোনো দলের গঠনতন্ত্রে দলীয় প্রধানের মেয়াদে সীমাবদ্ধতার উল্লেখ নেই।

দলের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় একক ব্যক্তির প্রভাবও ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গেছে। কাউন্সিল বা সম্মেলনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পন্থায় নেতৃত্ব নির্বাচনের বিধান গঠনতন্ত্রে থাকলেও, বাস্তবে ১৬টি দলের কাউন্সিল অনিয়মিত। নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ব্যালটের পরিবর্তে কণ্ঠভোটের ব্যবহারই বেশি। এছাড়া প্রার্থী মনোনয়নের সময়ও তৃণমূল বা স্থানীয় কমিটির মতামত উপেক্ষা করে দলীয় প্রধানের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিশেষ করে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। বড় দলগুলোতে অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ ও আর্থিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রেও দলগুলো পিছিয়ে রয়েছে। মাত্র দুটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৩৩ শতাংশ বা তার বেশি নারী সদস্য রয়েছেন। আবার জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যের কোনো উপস্থিতি নেই। দলগুলোর অধিকাংশেরই সুনির্দিষ্ট আর্থিক নীতিমালা বা বার্ষিক বাজেট নেই। পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের জন্য কোনো স্বতন্ত্র আচরণবিধি, অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া বা শৃঙ্খলাভঙ্গের বিচারের স্বচ্ছ পথ নেই।

রাজনীতিতে সহিংসতা ও অপরাধের চিত্রও ভয়াবহ। ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ২৮০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৪৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৪৬ হাজার ৩৫১ জন।

প্রতিষ্ঠানটি এই সংকট কাটাতে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করা, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন, নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ব্যালট এবং নেতৃত্বের মেয়াদসীমা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। এছাড়া দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় নিয়ে আসার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। টিআইবি মনে করে, দলের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা অসম্ভব।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

টিআইবি: ১০ দলের নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র, সিদ্ধান্ত ব্যক্তিনির্ভর

আপডেট সময় : ০৫:১২:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের চর্চা নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি বিশদ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এই গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অন্তত ১০টি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পরিবারকেন্দ্রিক। এর মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টি।

গবেষণাটি ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়কালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ক্ষেত্রবিশেষে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় মোট ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ৩২টি দল তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনা সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় নেতৃত্বে রয়েছেন। এছাড়া ১২টি দলের প্রধান অন্তত ১০ বছর ধরে তাদের পদে আসীন আছেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বাদে অন্য কোনো দলের গঠনতন্ত্রে দলীয় প্রধানের মেয়াদে সীমাবদ্ধতার উল্লেখ নেই।

দলের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় একক ব্যক্তির প্রভাবও ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গেছে। কাউন্সিল বা সম্মেলনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পন্থায় নেতৃত্ব নির্বাচনের বিধান গঠনতন্ত্রে থাকলেও, বাস্তবে ১৬টি দলের কাউন্সিল অনিয়মিত। নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ব্যালটের পরিবর্তে কণ্ঠভোটের ব্যবহারই বেশি। এছাড়া প্রার্থী মনোনয়নের সময়ও তৃণমূল বা স্থানীয় কমিটির মতামত উপেক্ষা করে দলীয় প্রধানের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিশেষ করে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। বড় দলগুলোতে অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ ও আর্থিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রেও দলগুলো পিছিয়ে রয়েছে। মাত্র দুটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৩৩ শতাংশ বা তার বেশি নারী সদস্য রয়েছেন। আবার জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যের কোনো উপস্থিতি নেই। দলগুলোর অধিকাংশেরই সুনির্দিষ্ট আর্থিক নীতিমালা বা বার্ষিক বাজেট নেই। পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের জন্য কোনো স্বতন্ত্র আচরণবিধি, অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া বা শৃঙ্খলাভঙ্গের বিচারের স্বচ্ছ পথ নেই।

রাজনীতিতে সহিংসতা ও অপরাধের চিত্রও ভয়াবহ। ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ২৮০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৪৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৪৬ হাজার ৩৫১ জন।

প্রতিষ্ঠানটি এই সংকট কাটাতে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করা, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন, নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ব্যালট এবং নেতৃত্বের মেয়াদসীমা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। এছাড়া দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় নিয়ে আসার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। টিআইবি মনে করে, দলের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া দেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা অসম্ভব।

Facebook Comments Box