মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি: ইসরায়েল-আমিরাত জোটের জন্য কেন এটি বড় ধাক্কা?
- আপডেট সময় : ০৮:২২:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬ ২৮ বার পড়া হয়েছে
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি: ইসরায়েল-আমিরাত জোটের জন্য কেন এটি বড় ধাক্কা?
গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ আরব আমিরাত এবং ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য ছিল একটি বড় চমক। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সাধারণত চমক পছন্দ করে না, কিন্তু এই চুক্তিটি পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও নিরাপত্তা সমীকরণকে নতুন করে সাজিয়ে দিয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান একটি মুসলিম জোট গঠনের বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন। তবে পর্দার আড়ালে সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো শাসক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। তিনি এমনভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন যাতে ইরান ও যুদ্ধের অন্য পক্ষগুলো তাঁর কৌশলে সমন্বয় বা সহমর্মিতা খুঁজে পায়।
গত মাসে ওয়াশিংটনে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে বাধা দেন এবং সৌদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত জুড়ে দেন। এর মধ্যেই দক্ষিণ ইরাকে ইরান-সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের ওপর সৌদি ও মার্কিন যুদ্ধবিমান হামলা চালায়, যার নেতৃত্বে ছিল ইরানের আইআরজিসির উপদেষ্টারা।
সৌদি গোয়েন্দারা খবর পেয়েছিল যে, মিলিশিয়াগুলো কুয়েত সীমান্ত দিয়ে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সময়ে ইয়েমেনের সানাতেও সৌদি বিমান হামলা চালানো হয়, কারণ হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ইরানবিরোধী হামলায় যারা যোগ দিয়েছিল, তারা ভেবেছিল সৌদি শাসক তাদের পক্ষে রয়েছেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সরাসরি যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা এমবিএস-এর ছিল না।
পড়ুন>>ফিফা সভাপতি ইস্যুতে এশিয়ান ফুটবলে বিভাজন: এএফসি ও কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পাল্টাপাল্টি অবস্থান
মধ্যপ্রাচ্যে এখন মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে। ইরান, গাজা ও লেবাননে সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো সৌদি মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত সৌদি বিশ্লেষকরা দেখছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ইসরায়েলের গণহত্যায় অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করছেন। ফলে তারা নিজেদের আর পশ্চিমা শিবিরের অংশ ভাবতে পারছেন না। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নিজেদের বিমানঘাঁটিগুলো রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের প্রতি সৌদিদের মধ্যে চরম অবজ্ঞা তৈরি হয়েছে।
সৌদি শুরা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য ড. আহমেদ আলতুওয়াইজরি মক্কা চুক্তিকে এক সংকটকালে আলোর দিশা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের ওপর থেকে সবাই আস্থা হারিয়েছে। এই চুক্তি শুধু তিন দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং ভবিষ্যতে আরও আরব ও মুসলিম দেশ এতে যোগ দেবে। ড. আলতুওয়াইজরির মতে, এই চুক্তি ভারতকে সামলাতে পাকিস্তানকে সাহায্য করবে এবং তুরস্ককেও ইসরায়েলের হুমকির মুখে বাড়তি নিরাপত্তা দেবে। সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক শক্তি এবং গোয়েন্দা কৌশলের মাধ্যমে লাভবান হবে।
ইসরায়েলি কূটনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি ‘সুন্নি’ মুসলিম জোটের বিরুদ্ধে জোট তৈরির চেষ্টা করছিলেন। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ আক্রমণ সেই গোপন জোটকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। আব্রাহাম আকোর্ডে সই করা আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজে) যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে গভীর সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।
পড়ুন>>ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কয়েকজন দলে আছে: মুশফিক
ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী স্বপ্ন ছিল ভারত থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি জোট তৈরি করা, যেখানে তেল আবিব হবে তেল, গ্যাস ও প্রযুক্তির কেন্দ্র। এই পরিকল্পনায় মিসর ও সিরিয়ার মতো প্রথাগত আরব শক্তির পতন ছিল নিশ্চিত। তবে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি এই প্রকল্পের বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমিরাত ও ইসরায়েলের অভিন্ন স্বার্থ ছিল ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ উসকে দেওয়া এবং সোমালিল্যান্ডের মতো অঞ্চল ব্যবহার করে জলপথের সাম্রাজ্য গড়া।
মক্কা চুক্তির ফলে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার কৌশলগত বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। ইয়েমেন ইস্যু নিয়ে মতপার্থক্য এখন শীর্ষ পর্যায়ে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ স্পষ্ট করেছেন যে, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর নির্ভর করবে। এরপর আরব আমিরাত আল অ্যারাবিয়ার এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় এবং ওপেক ত্যাগ করে।
মক্কা চুক্তি নিয়ে ক্ষুব্ধ আমিরাতি বিশ্লেষক আবদুল খালেক আবদুল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন, এই জোটের উদ্দেশ্য কী? তিনি দাবি করেছেন যে, প্রধান দেশগুলো নিজ ঘরের বাইরে গিয়ে নিরাপত্তা খুঁজছে, যা জিসিসি-কে দুর্বল করে দিচ্ছে। জবাবে সৌদি প্রিন্স আবদুলরহমান বিন মুসাইদ পাল্টা প্রশ্ন করেছেন, যেকোনো দেশের নিজের পছন্দমতো চুক্তি করার অধিকার রয়েছে এবং এটি তাদের সার্বভৌম বিষয়।
আরও পড়ুন>>টেক্সাসে ইসলামবিদ্বেষী তৎপরতা বৃদ্ধি: আতঙ্কে স্থানীয় মুসলিমরা
সৌদির ড. আহমেদ আল-সানি মন্তব্য করেছেন, মক্কা চুক্তি তেতো সত্য সামনে এনেছে যে, রিয়াদ এখন কেবল অর্থায়নই করবে না, সিদ্ধান্তও তারাই নেবে। সৌদিরা এখন নিশ্চিত যে আমিরাত ইয়েমেন ও সুদানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে এবং মিসরকে সৌদির বিরুদ্ধে উসকানি দেবে। পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌঁছালে রিয়াদ আবুধাবিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের পথও ভাবতে পারে।
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা থিওডর সিঙ্গার বলেন, প্রথম দর্শনে আমিরাত-ইসরায়েল জোট তাৎক্ষণিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে মক্কা চুক্তি আরও ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকলেও ইসরায়েলের সেই অস্ত্র ব্যবহারের আঞ্চলিক বৈধতা নেই। নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প পুরো উপসাগরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন, যার ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধের উপক্রম হয়েছে। গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো তৈরি করছে, যা থেকে পিছু হটার কোনো লক্ষণ নেই। প্র/আ
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ
























