ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক দায়িত্বে যুক্তরাষ্ট্র এবং তেলশিল্পে মার্কিন কোম্পানি
- আপডেট সময় : ০৮:১৫:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬ ৬০৩৯ বার পড়া হয়েছে
ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক দায়িত্বে যুক্তরাষ্ট্র এবং তেলশিল্পে মার্কিন কোম্পানি
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযানে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পর দেশটির রাষ্ট্রক্ষমতা ও তেল সম্পদ নিয়ে ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য ঘোষণা বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, আপাতত ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র নেবে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুত থাকা দেশটির তেলশিল্প পুনর্গঠনে মার্কিন কোম্পানিগুলো সরাসরি কাজ করবে।
এ ঘোষণা শুধু ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, পুরো লাতিন আমেরিকা ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সমালোচকদের মতে, এটি আদতে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ, যার কেন্দ্রে রয়েছে তেল।
শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলায় চালানো এক আকস্মিক অভিযানে মার্কিন বাহিনী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে। পরে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। হোয়াইট হাউস জানায়, মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার, মাদক-সন্ত্রাসবাদ ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এবং এসব অভিযোগেই তার বিচার হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এ অভিযান ছিল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনের অংশ। তবে একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই স্পষ্ট করে বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ এবং সেই তেল খাতের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনাও এ সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান কারণ।
ট্রাম্পের ঘোষণা ও তেল পরিকল্পনা:
এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প বছরের পর বছর ধরে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অপচয়ের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। তার ভাষায়, এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে বড় বিনিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দরকার যা যুক্তরাষ্ট্র দিতে পারে।
তিনি জানান, মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ করবে, ভাঙাচোরা অবকাঠামো সংস্কার করবে এবং উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়াবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক দায়িত্ব নেবে, যতক্ষণ না সেখানে একটি স্থিতিশীল ও গ্রহণযোগ্য সরকার গঠিত হয়। তবে এ দায়িত্ব কতদিন চলবে, কীভাবে দেশ পরিচালিত হবে বা ভেনেজুয়েলার জনগণের মতামত কীভাবে নেওয়া হবে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়নি।
ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক বাস্তবতা:
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত অপরিশোধিত তেল মজুতের দেশ। আন্তর্জাতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশটির মাটির নিচে রয়েছে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল যা বিশ্বের মোট তেল মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
কিন্তু এত বড় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশটি আজ চরম অর্থনৈতিক সংকটে। ১৯৭০-এর দশকে ভেনেজুয়েলা দৈনিক সাড়ে ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল উৎপাদন করত। বর্তমানে সেই উৎপাদন নেমে এসেছে গড়ে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেলের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক বাজারে মোট অপরিশোধিত তেলের সরবরাহের মাত্র শূন্য দশমিক আট শতাংশ আসে ভেনেজুয়েলা থেকে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের অভাব ও দুর্নীতির কারণে অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানি ঘাটতি ও নিত্যপণ্যের অভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
তেলের জন্যই এই রক্তপাত:
মার্কিন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জ্যাক অচিনক্লজ এই অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে সরাসরি তেলের জন্য রক্তপাত বলে অভিহিত করেন। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এর সঙ্গে মাদক পাচারের কোনো বাস্তব সম্পর্ক নেই। ভেনেজুয়েলার মাদক ইউরোপে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে যে মাদক মানুষকে হত্যা করছে, তা ফেন্টানিল যার উৎস চীন। কিন্তু এখানে তেলের বিষয়টিই আসল।
তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুত রয়েছে এ বিষয়টি বরাবরই আলোচনায় ছিল। জ্যাকের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের বড় তেল কোম্পানিগুলোর কাছে ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করছেন এবং শেভরনের মতো কোম্পানির জন্য ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবহারের পথ সহজ করছেন।
ভেনেজুয়েলার তেলে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ কেন:
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের মূল কারণ শুধু মজুতের পরিমাণ নয়, তেলের ধরনও। যুক্তরাষ্ট্রে যে তেল বেশি পাওয়া যায়, তা হালকা বা সুইট ক্রুড । এটি মূলত গ্যাসোলিন তৈরিতে উপযোগী। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার তেল ভারী ও ঘন। এই তেল পরিশোধন করে উন্নতমানের ডিজেল, অ্যাসফল্ট, শিল্পকারখানার জ্বালানি এবং ভারী যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারের জ্বালানি তৈরি করা যায়। এ ছাড়া ভৌগোলিকভাবে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি হওয়ায় পরিবহন খরচও তুলনামূলক কম।
এসব কারণেই ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্প খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা:
এ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক দেশ এটিকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়েছে। চীন
ও রাশিয়া প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্বব্যবস্থাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, মাদুরোর পতনের পর ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক শূন্যতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এর ফলে নতুন করে শরণার্থী সংকট দেখা দিতে পারে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে কিউবার মতো দেশ, যারা ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নির্ভরশীল, তারাও বড় সংকটে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ভেনেজুয়েলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ শুধু একটি দেশের সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এটি তেল, ক্ষমতা ও বৈশ্বিক আধিপত্যের এক জটিল সংঘর্ষ, যার প্রভাব পড়তে পারে লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে বিশ্ব রাজনীতির বহু ক্ষেত্রে। প্রশ্ন একটাই এ হস্তক্ষেপ ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য মুক্তি বয়ে আনবে, না কি আরও দীর্ঘ অস্থিরতার সূচনা করবে।তথ্য সুত্র ও ছবি
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ

























