ফ্রান্সে বিক্ষোভের জেরে প্রায় ১০০০ জন গ্রেপ্তার
- আপডেট সময় : ০৫:০৩:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া এবং স্কুলের নাজুক অবস্থার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ফের রাস্তায় নেমেছেন লাখ লাখ মানুষ। শনিবার অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভের শেষ পর্যায়ে বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দাঙ্গা পুলিশকে প্যারিসসহ কয়েকটি বড় শহরে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়েছে। সরকারি হিসাবমতে, শনিবার সারা দেশে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন, তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি এই সংখ্যা প্রায় ৮ লাখের কাছাকাছি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছিল। একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িকে জ্বলন্ত ব্যারিকেডের মধ্য দিয়ে চলতে দেখা গেছে।
বিক্ষোভের অধিকাংশ সময় শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার পর প্যারিসের পোর্ট দ্য ইতালি থেকে পোর্ট দ্য ভিনসেন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ মিছিল শেষে একাংশ দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। একদল বিক্ষোভকারী অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করে পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করতে শুরু করেন। এ সময় কয়েকটি গাড়ির শোরুম ভাঙচুরের চেষ্টা হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, মিছিলের পেছনে অবস্থান নেওয়া প্রায় ৫০০ উগ্রপন্থীকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং সব মিলিয়ে প্যারিসে ১৪২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই অভিযানে বিশেষায়িত সন্ত্রাসবাদ দমন পুলিশ ইউনিটও অংশ নিয়েছে। তবে গত সপ্তাহান্তের তুলনায় এবার দাঙ্গা, লুটপাট ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা এড়াতে পেরেছে কর্তৃপক্ষ। মুখোশ পরা কয়েকজন তরুণ একটি গাড়ির শোরুমের জানালা ভাঙতে শুরু করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, মিছিলের পেছনের অংশে কয়েক হাজার উগ্রপন্থী কর্মী জড়ো হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনকে দাঙ্গায় অংশগ্রহণকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। গত সপ্তাহের একই দিনে গ্রেপ্তারের সংখ্যার তুলনায় এটি অর্ধেকেরও কম। এদিকে ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম শহরের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা প্রায় ১৫০ জন ছিলাম। দেশজুড়ে গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের চুপ করিয়ে রাখে। তার কাছাকাছি একটি বিস্ফোরকজাতীয় বস্তু বিস্ফোরিত হওয়ার পর এ ঘটনা ঘটে। আমাদের টাকা নেয়, অনেক কর আরোপ করে, অথচ আমরা কিছু বলতে পারি না।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। মার্সেই শহরের রাস্তায় ময়লার পাত্রে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি ধাতব পাত দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। বোর্দোতে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা ভবনের কাঠের পাটাতন খুলে সড়কে ব্যারিকেড তৈরির চেষ্টা করেন। লিয়ঁ শহরে নিষিদ্ধ ঘোষিত এলাকায় জড়ো হওয়া জনতাকে সরাতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। তুলুজ ও ক্লেরমঁ-ফেরাঁর সংঘর্ষে অন্তত দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া তুলুজে এক ২০ বছর বয়সী বিক্ষোভকারীর হাত থেকে কয়েকটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার খবর দিয়েছে ফ্রান্সইনফো। মার্সেইয়ের বুশ-দ্যু-রোন অঞ্চলে সাতটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্সেইয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে রাস্তায় তৈরি ব্যারিকেড। বেশির ভাগই মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এ ছাড়া রোববার ভোরেও বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা অব্যাহত ছিল।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান অভিযোগ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের কর নীতির প্রতি। প্যারিসের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ২৬ বছর বয়সী জেলি জানান, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ক্ষমতায় আসার পর থেকে সাধারণ মানুষ চরম হতাশা ও কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের দাবি, সরকার জনগণের কথা শুনতে নারাজ এবং করের চাপে তারা বিপর্যস্ত। এছাড়া মুখোশ পরা দুই কিশোর বিক্ষোভকারী জানান, বর্তমান প্রজন্ম নিজেদের পরিত্যক্ত মনে করছে। একই সময়ে ওর্লেয়াঁ শহরে কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি দলের বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার মানুষের আলাদা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর মেয়াদ শেষ হতে চলায় ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গন বর্তমানে বেশ উত্তপ্ত। নির্বাচনের ছয় মাস আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে দোষারোপের রাজনীতি বাড়ছে। জনমত জরিপগুলো বলছে, আগামী নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থি মারিন লে পেন এবং কট্টর বামপন্থি লা ফ্রঁস ইনসুমিজের প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার ও বিরোধীদের এই লড়াইয়ের মাঝখানে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষোভ দেশটিতে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করেছে। গত সপ্তাহের বিক্ষোভ-সহিংসতায় ফ্রান্সের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দোষারোপও বাড়ছে।
সূত্র: মানবজমিন
























