ঢাকা ১২:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

নতুন ঋণেও আইএমএফের পুরোনো শর্ত: রাজস্ব সংস্কারে কতটুকু অগ্রগতি?

ঢাকা মহানগর প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৯:৪০:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ২৮ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

নতুন ঋণেও আইএমএফের পুরোনো শর্ত: রাজস্ব সংস্কারে কতটুকু অগ্রগতি?

 

রাজস্ব খাত সংস্কারের উদ্যোগ এখন অনেকটা গতি পেয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন করে রাজস্ব নীতি ও আদায় বিভাগকে আলাদা করা, একক মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট কার্যকর করা এবং অযৌক্তিক শুল্ক-কর ছাড় কমিয়ে আনার মতো বিষয়গুলো প্রধান গুরুত্ব পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বের ঋণ কর্মসূচির শর্তাবলির অংশ ছিল এসব সংস্কার। যদিও আগের কর্মসূচিটি বাতিল হয়ে গেছে, তবুও নতুন করে যে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণের প্রাথমিক আলোচনা চলছে, সেখানেও একই ধরনের শর্তের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

 

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক যৌথ সভার সাইডলাইন বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিগত দুই-তিন মাস ধরে চলা এই ঋণ আলোচনার প্রেক্ষাপটে মূলত সংস্কার উদ্যোগগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। নতুন এই ঋণ কর্মসূচি তিন বছর মেয়াদি হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

পড়ুন>>সৈয়দপুরে অন্তঃসত্ত্বা নারীরবাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ

পুরোনো ঋণের শর্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের জন্য দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের বাধ্যবাধকতা ছিল। বর্তমানে এনবিআর একই সঙ্গে নীতি ও আদায়ের কাজটি করে থাকে। যদিও বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটি কাজ করেছে, তবে সরকার এখন পর্যন্ত তা আইনে রূপ দেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এ বিষয়ে তাদের প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি।

আইএমএফ একক ভ্যাট হার নির্ধারণের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন ভ্যাট হার প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে ১৫, ১০, ৭.৫, ৫, ৪.৫, ৪, ২.৪, ২, ১.৫ ও ০ শতাংশ অন্তর্ভুক্ত। তবে অধিকাংশ পণ্য ও সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য। এনবিআর একক ভ্যাট হার নির্ধারণে সময়ভিত্তিক একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে হ্রাসকৃত হারগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে দেওয়া। এনবিআর ২০৩০ সালের মধ্যে একক ভ্যাট হার কার্যকর করতে চায়। আইন অনুযায়ী এই হার ১৫ শতাংশ নির্ধারিত হলেও, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় তারা সাড়ে ৭ শতাংশের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

কর ছাড়ের ক্ষেত্রে আইএমএফের পূর্বের শর্ত ছিল ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সব ধরনের যৌক্তিক কর ছাড় বাতিলের। নতুন আলোচনার ক্ষেত্রেও একই শর্তের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। তবে এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতি সচল রাখতে সব কর ছাড় হঠাৎ তুলে দেওয়া সম্ভব নয়। রাজস্ব খাতের অটোমেশন বা আধুনিকায়নের বিষয়ে এনবিআর ও আইএমএফ উভয়েই একমত পোষণ করেছে।

পড়ুন>>ছাত্র-ছাত্রীদের মানবিক মানুষ হওয়ার আহবান হারাগাছ অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে এসএসসি কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও অভিভাবক সমাবেশে

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের দেশ, যেখানে এই হার মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, রাজস্ব খাতে সংস্কার অনিবার্য। তিনি বলেন, নীতি ও আদায় কার্যক্রম আলাদা করা এবং কর ছাড় কমানোর বিষয়ে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। আগের শর্তগুলোই নতুন করে সামনে এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে আইএমএফ তাদের অবস্থানে অটল। বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এসব সংস্কার যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, দেশের অর্থনীতির জন্য ততই মঙ্গলজনক।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ মনে করেন, করদাতাদের হয়রানি কমাতে রাজস্ব আদায় ও নীতি প্রণয়ন বিভাগকে আলাদা করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক উন্নত দেশেই এই পদ্ধতি কার্যকর রয়েছে। তাঁর মতে, এনবিআর তখন একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে সরাসরি মন্ত্রীর দপ্তরে রিপোর্ট করবে এবং নীতি বিভাগ পৃথকভাবে রাজস্ব নীতি প্রণয়নের কাজ করবে। কেবল আইএমএফের শর্ত পূরণের জন্য নয়, বরং দেশের অর্থের জোগানের প্রয়োজনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে এই সংস্কার সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি।

 

 

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

নতুন ঋণেও আইএমএফের পুরোনো শর্ত: রাজস্ব সংস্কারে কতটুকু অগ্রগতি?

আপডেট সময় : ০৯:৪০:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

 

নতুন ঋণেও আইএমএফের পুরোনো শর্ত: রাজস্ব সংস্কারে কতটুকু অগ্রগতি?

 

রাজস্ব খাত সংস্কারের উদ্যোগ এখন অনেকটা গতি পেয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন করে রাজস্ব নীতি ও আদায় বিভাগকে আলাদা করা, একক মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট কার্যকর করা এবং অযৌক্তিক শুল্ক-কর ছাড় কমিয়ে আনার মতো বিষয়গুলো প্রধান গুরুত্ব পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বের ঋণ কর্মসূচির শর্তাবলির অংশ ছিল এসব সংস্কার। যদিও আগের কর্মসূচিটি বাতিল হয়ে গেছে, তবুও নতুন করে যে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণের প্রাথমিক আলোচনা চলছে, সেখানেও একই ধরনের শর্তের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

 

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক যৌথ সভার সাইডলাইন বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিগত দুই-তিন মাস ধরে চলা এই ঋণ আলোচনার প্রেক্ষাপটে মূলত সংস্কার উদ্যোগগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। নতুন এই ঋণ কর্মসূচি তিন বছর মেয়াদি হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

পড়ুন>>সৈয়দপুরে অন্তঃসত্ত্বা নারীরবাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ

পুরোনো ঋণের শর্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের জন্য দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের বাধ্যবাধকতা ছিল। বর্তমানে এনবিআর একই সঙ্গে নীতি ও আদায়ের কাজটি করে থাকে। যদিও বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটি কাজ করেছে, তবে সরকার এখন পর্যন্ত তা আইনে রূপ দেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এ বিষয়ে তাদের প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করলেও বর্তমান সরকার তা আইনে পরিণত করেনি।

আইএমএফ একক ভ্যাট হার নির্ধারণের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১০টি ভিন্ন ভিন্ন ভ্যাট হার প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে ১৫, ১০, ৭.৫, ৫, ৪.৫, ৪, ২.৪, ২, ১.৫ ও ০ শতাংশ অন্তর্ভুক্ত। তবে অধিকাংশ পণ্য ও সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য। এনবিআর একক ভ্যাট হার নির্ধারণে সময়ভিত্তিক একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে হ্রাসকৃত হারগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে দেওয়া। এনবিআর ২০৩০ সালের মধ্যে একক ভ্যাট হার কার্যকর করতে চায়। আইন অনুযায়ী এই হার ১৫ শতাংশ নির্ধারিত হলেও, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় তারা সাড়ে ৭ শতাংশের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

কর ছাড়ের ক্ষেত্রে আইএমএফের পূর্বের শর্ত ছিল ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে সব ধরনের যৌক্তিক কর ছাড় বাতিলের। নতুন আলোচনার ক্ষেত্রেও একই শর্তের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। তবে এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতি সচল রাখতে সব কর ছাড় হঠাৎ তুলে দেওয়া সম্ভব নয়। রাজস্ব খাতের অটোমেশন বা আধুনিকায়নের বিষয়ে এনবিআর ও আইএমএফ উভয়েই একমত পোষণ করেছে।

পড়ুন>>ছাত্র-ছাত্রীদের মানবিক মানুষ হওয়ার আহবান হারাগাছ অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে এসএসসি কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও অভিভাবক সমাবেশে

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের দেশ, যেখানে এই হার মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, রাজস্ব খাতে সংস্কার অনিবার্য। তিনি বলেন, নীতি ও আদায় কার্যক্রম আলাদা করা এবং কর ছাড় কমানোর বিষয়ে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। আগের শর্তগুলোই নতুন করে সামনে এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে আইএমএফ তাদের অবস্থানে অটল। বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এসব সংস্কার যত দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, দেশের অর্থনীতির জন্য ততই মঙ্গলজনক।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ মনে করেন, করদাতাদের হয়রানি কমাতে রাজস্ব আদায় ও নীতি প্রণয়ন বিভাগকে আলাদা করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক উন্নত দেশেই এই পদ্ধতি কার্যকর রয়েছে। তাঁর মতে, এনবিআর তখন একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে সরাসরি মন্ত্রীর দপ্তরে রিপোর্ট করবে এবং নীতি বিভাগ পৃথকভাবে রাজস্ব নীতি প্রণয়নের কাজ করবে। কেবল আইএমএফের শর্ত পূরণের জন্য নয়, বরং দেশের অর্থের জোগানের প্রয়োজনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে এই সংস্কার সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি।

 

 

Facebook Comments Box