তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কবলে পড়ে দেশের শিল্প খাতে ভয়াবহ স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। চাহিদামতো জ্বালানি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় উদ্যোক্তারা চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন। বকেয়া বেতন, ব্যাংক ঋণ ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া অনেক কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গড়ে ১০০০ ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ৫০০ ঘনমিটারে নেমে এসেছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে সংকট সবচেয়ে প্রকট। অনেক কারখানায় যেখানে ১৫ থেকে ২০ পিএসআই প্রেসার প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ২ পিএসআই। বিকল্প হিসেবে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করা হলেও তাতে উৎপাদন খরচ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এই সংকটে উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পেরে অনেক রপ্তানিকারক ব্যয়বহুল এয়ার ফ্রেইট ব্যবহার করছেন, আবার অনেকে অর্ডার বাতিলের সম্মুখীন হচ্ছেন।
গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলগুলোতে শিফট কমিয়ে আনা হয়েছে এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যকর রোডম্যাপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হতো। বর্তমানে দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।
বুধবার ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হয়েছিল। এই সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জের ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৩০টিই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। জামালপুরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা নিয়মিত গ্যাস সরবরাহের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব রাজধানীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ডেসকো কর্মকর্তাদের মতে, গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রাজধানীতে লোডশেডিং শুরু হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ, যেখানে দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তারা পাচ্ছেন মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। দেশে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, যার ফলে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজারের বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে। অটোরিকশা চার্জে দৈনিক ৮০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বৃহস্পতিবার জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির মালিকানাধীন ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৌশলীদের প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামতে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া আপাতত আর কিছুই করার নেই।
মা//জ//ন
Leave a Reply