জাতীয় কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়েই উপেক্ষিত নজরুলের স্মৃতি ও গবেষণা
- আপডেট সময় : ০৯:০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
জাতীয় কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়েই উপেক্ষিত নজরুলের স্মৃতি ও গবেষণা
ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে কবির নাম যুক্ত থাকলেও, তার স্মৃতি ও গবেষণার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবহেলা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের সীমানার বাইরেই পড়ে আছে কবির স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ‘নজরুল বটতলা’ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর। কবির নামে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠানে এমন বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে নজরুল গবেষণার চিত্রও বেশ হতাশাজনক। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেশের প্রথম ও একমাত্র ‘ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ’ প্রতিষ্ঠার ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সেখানে কোনো স্থায়ী পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ২৩ জনের অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বিপরীতে বর্তমানে মাত্র তিনজন কর্মী দিয়ে চলছে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি। উপাচার্য পদাধিকারবলে দায়িত্ব পালন করলেও, প্রশাসনিক ও একাডেমিক ব্যস্ততার কারণে তার পক্ষে গবেষণায় পূর্ণ সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
পড়ুন>>আল নাসরের জয়সূচক গোল করে হাজার গোলের পথে রোনালদো
২০১৪ সালে কবির অমর স্মৃতি সংরক্ষণ, জীবন ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা, এবং তার ভাবমূর্তি বিশ্বজুড়ে তুলে ধরার লক্ষ্যে এই ইনস্টিটিউটটি যাত্রা শুরু করেছিল। যদিও গবেষণা অনুদান, আন্তর্জাতিক জার্নাল প্রকাশ ও সম্মেলনের মাধ্যমে কিছু কাজ হয়েছে, তবে সামগ্রিক পরিকল্পনার তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য।
বর্তমানে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে ইনস্টিটিউটটি স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান জানান, দুই বছর আগে শুরু হওয়া এই ভবনের নির্মাণকাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
পড়ুন>>নেপাল ও চীনে বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি বেড়ে ৫৮৪, নিখোঁজ আড়াই হাজার
ঐতিহাসিক নজরুল বটতলা নিয়ে স্থানীয় গবেষক আমিনুল ইসলাম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবহেলায় এই স্মৃতিচিহ্নটি অযত্নে পড়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধনী ফলকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নাম থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে এটি নিয়ে কোনো পক্ষই কথা বলেনি। তিনি একে সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নজরুলবর্ষ চলাকালেও কবির জন্মবার্ষিকীর আয়োজন ছিল সাদামাটা। এছাড়া ‘নজরুল সিটি’ নামে বাণিজ্য উৎসবের পরিকল্পনা নিয়েও ক্যাম্পাসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষক ও গবেষকদের অনেক সময় দলাদলির ভয়ে ন্যায্য বিষয়েও চুপ থাকতে হয়, যা নজরুল চর্চার পরিবেশকে ব্যাহত করছে।
পড়ুন>>আল নাসরের জয়সূচক গোল করে হাজার গোলের পথে রোনালদো
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন জানান, তিনি নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর ভিত্তিপ্রস্তরের পাশের জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। জমি পাওয়া গেলে ভিত্তিপ্রস্তরটি ক্যাম্পাসের ভেতরে নিয়ে আসা হবে। এছাড়া নতুন ভবন বুঝে পাওয়ার পর দেশসেরা কোনো নজরুল গবেষককে ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
ত্রিশালের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সিন্ডিকেট সদস্য মো. মাহবুবুর রহমান লিটন জানান, গত ১৭ বছরে নজরুলের স্মৃতিগুলো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ সিন্ডিকেট গঠিত হলে নজরুল বটতলা ক্যাম্পাসে স্থানান্তর এবং ইনস্টিটিউটের পরিচালক নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নজরুল গবেষক ও কবি মজিদ মাহমুদ মনে করেন, কেবল এই বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং দেশের অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। তিনি বলেন, নজরুলের সামগ্রিক দর্শন, মানবতা ও বিদ্রোহের চেতনাকে ধারণ না করে কেবল নামে প্রতিষ্ঠান তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। কবির নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি তার চিন্তা ও সৃষ্টিকর্ম উপেক্ষিত থাকে, তবে সেই নামের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এটি কেবল কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা নয়, বরং রাষ্ট্রেরও জবাবদিহির বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আরও পড়ুন>>বাউফলের চন্দ্রদ্বীপকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদের
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় বর্তমানে দেশে ‘নজরুলবর্ষ’ পালিত হচ্ছে এবং জাতীয় পর্যায়ে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এমন সময়ে নজরুলের নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে তার স্মৃতি ও গবেষণার এই দৈন্যদশা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।


















