বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হলো বিদ্যুৎ খাত। শিল্প, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সবকিছুই নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও খাতটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে ক্যাপাসিটি চার্জ।
ক্যাপাসিটি চার্জের মূল ধারণাটি অস্বাভাবিক নয়। কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রকে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রাখা, তার সক্ষমতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগের নির্দিষ্ট ব্যয় পরিশোধের জন্য চুক্তি অনুযায়ী এ ধরনের অর্থ প্রদান করা হয়।
সাম্প্রতিক হিসাব সমস্যাটির গভীরতা স্পষ্ট করে। ২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এ ব্যয় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক অবস্থাও উদ্বেগজনক। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে BPDB-এর বার্ষিক লোকসান ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একই সময়ে গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুতগতিতে।
ফলে একদিকে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল পরিশোধে সরকারের আর্থিক সংকট। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধে দীর্ঘ বিলম্বের কথাও উঠে এসেছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধ করতে হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত এসব অর্থের জোগান আসছে জনগণের করের টাকা থেকে। অর্থাৎ ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কোনো না কোনোভাবে সাধারণ মানুষের ওপরই এসে পড়ছে।
বিশেষ করে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে কম উৎপাদন করছে বা কার্যত নিষ্ক্রিয়, সেগুলোর চুক্তি ও ক্যাপাসিটি চার্জ স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। চুক্তিতে রাষ্ট্রের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত ছিল, মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া কী ছিল এবং অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতার জন্য জনগণের অর্থ ব্যয় হচ্ছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের সামনে উপস্থাপন করা উচিত।
বিদ্যুৎ খাতকে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাবমুক্ত রেখে জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে পরিচালনা করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ পরিকল্পনা করা হলে তার আর্থিক দায় বহন করতে হয় পুরো দেশকে।
একই সঙ্গে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর উদ্যোগ নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয়, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা, সিস্টেম লস এবং বিদ্যুৎ বিল আদায়ের সক্ষমতাও সমান গুরুত্ব দিয়ে সংস্কার করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বেশি হলেই বিদ্যুৎ খাত শক্তিশালী হয় না; প্রয়োজনের সময় সাশ্রয়ী মূল্যে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারাই একটি কার্যকর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রকৃত পরিচয়।
ক্যাপাসিটি চার্জ নিজে কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতার জন্য জনগণের অর্থ ব্যয় করা হয় এবং সেই ব্যয়ের যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয় না।
বিদ্যুৎ খাতকে স্লোগাননির্ভর উন্নয়নের বাইরে এনে জনস্বার্থভিত্তিক, ব্যয়সাশ্রয়ী ও টেকসই ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নেওয়ার। অন্যথায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যতই বাড়ুক, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও জনগণের অর্থনীতি উভয়ই ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে।
Leave a Reply