ক্যাপাসিটি চার্জের চাপে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত: দায় কার? : দৈনিক সৃষ্টি নিউজ
  1. admin@sristy.net : admin :
ক্যাপাসিটি চার্জের চাপে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত: দায় কার? : দৈনিক সৃষ্টি নিউজ
শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
নেপাল ও চীনে বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি বেড়ে ৫৮৪, নিখোঁজ আড়াই হাজার জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন আইরিন জুবাইদা খান পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ভাসমান সেতুই ভরসা: সবজি চাষিদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নেপালে আকস্মিক বন্যায় মৃত অবস্থায় পাওয়া ব্যক্তি সংরক্ষণ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন জাতীয় কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়েই উপেক্ষিত নজরুলের স্মৃতি ও গবেষণা ক্যাপাসিটি চার্জের চাপে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত: দায় কার? ক্লাব ছাড়ার অপেক্ষায় এনজো ও আলভারেজ: দুই বন্ধুর গন্তব্য এখন অনিশ্চিত আগামী সপ্তাহ থেকে শুরু হচ্ছে সংকটে থাকা বীমা কোম্পানির গ্রাহকদের বকেয়া দাবি পরিশোধ তিক্ততা কাটিয়ে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী ইরান রাণীশংকৈলে রিকশা-ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রিবার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত

ক্যাপাসিটি চার্জের চাপে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত: দায় কার?

মোখলেছুর রহমান
  • প্রকাশিত : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

 

 

ক্যাপাসিটি চার্জের চাপে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত: দায় কার?

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হলো বিদ্যুৎ খাত। শিল্প, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সবকিছুই নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও খাতটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে ক্যাপাসিটি চার্জ।

ক্যাপাসিটি চার্জের মূল ধারণাটি অস্বাভাবিক নয়। কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রকে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রাখা, তার সক্ষমতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগের নির্দিষ্ট ব্যয় পরিশোধের জন্য চুক্তি অনুযায়ী এ ধরনের অর্থ প্রদান করা হয়।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, “যে বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজনের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না, কিংবা বছরের বড় একটি সময় নিষ্ক্রিয় থাকছে, তার জন্য বিপুল অর্থ কেন পরিশোধ করতে হবে?”

সাম্প্রতিক হিসাব সমস্যাটির গভীরতা স্পষ্ট করে। ২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এ ব্যয় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক অবস্থাও উদ্বেগজনক। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে BPDB-এর বার্ষিক লোকসান ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একই সময়ে গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুতগতিতে।

এখানেই বিদ্যুৎ পরিকল্পনার মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও সেই সক্ষমতার প্রকৃত প্রয়োজন কতটুকু, কোন মৌসুমে চাহিদা কত থাকবে এবং কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর। এসব বিষয়ের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় সবসময় নিশ্চিত করা হয়নি।

ফলে একদিকে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিল পরিশোধে সরকারের আর্থিক সংকট। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধে দীর্ঘ বিলম্বের কথাও উঠে এসেছে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধ করতে হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত এসব অর্থের জোগান আসছে জনগণের করের টাকা থেকে। অর্থাৎ ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কোনো না কোনোভাবে সাধারণ মানুষের ওপরই এসে পড়ছে।

প্রশ্ন হলো; এই ব্যবস্থা আর কতদিন চলবে? বিদ্যুৎ খাতে এখন শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা নয়; প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অর্থনৈতিক দক্ষতা। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের আগে দেশের প্রকৃত চাহিদা, বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কাঠামো বিবেচনা করা জরুরি।

বিশেষ করে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে কম উৎপাদন করছে বা কার্যত নিষ্ক্রিয়, সেগুলোর চুক্তি ও ক্যাপাসিটি চার্জ স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। চুক্তিতে রাষ্ট্রের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত ছিল, মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া কী ছিল এবং অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতার জন্য জনগণের অর্থ ব্যয় হচ্ছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের সামনে উপস্থাপন করা উচিত।

বিদ্যুৎ খাতকে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রভাবমুক্ত রেখে জাতীয় অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে পরিচালনা করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ পরিকল্পনা করা হলে তার আর্থিক দায় বহন করতে হয় পুরো দেশকে।

একই সঙ্গে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর উদ্যোগ নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয়, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা, সিস্টেম লস এবং বিদ্যুৎ বিল আদায়ের সক্ষমতাও সমান গুরুত্ব দিয়ে সংস্কার করতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বেশি হলেই বিদ্যুৎ খাত শক্তিশালী হয় না; প্রয়োজনের সময় সাশ্রয়ী মূল্যে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারাই একটি কার্যকর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রকৃত পরিচয়।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ভুল সিদ্ধান্তের আর্থিক মূল্য জনগণকে আরও বহু বছর বহন করতে হতে পারে। তাই অতীতের চুক্তি ও সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতা হ্রাস, প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ বিদ্যুৎ ক্রয়ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বাস্তবসম্মত রূপান্তর জরুরি।

ক্যাপাসিটি চার্জ নিজে কোনো সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতার জন্য জনগণের অর্থ ব্যয় করা হয় এবং সেই ব্যয়ের যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয় না।

বিদ্যুৎ খাতকে স্লোগাননির্ভর উন্নয়নের বাইরে এনে জনস্বার্থভিত্তিক, ব্যয়সাশ্রয়ী ও টেকসই ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নেওয়ার। অন্যথায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যতই বাড়ুক, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও জনগণের অর্থনীতি উভয়ই ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর















error: Content is protected !!