সরকারি বেতন দিতে ব্যাংক থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ
- আপডেট সময় : ১১:৩১:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অক্টোবরের বেতন এবং আগের তিন মাসের বকেয়া পরিশোধ করতে ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার। আগামী ১ নভেম্বর এই বেতন ও বকেয়া পরিশোধের সিদ্ধান্ত রয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করেছে। ২৮ অক্টোবর (বুধবার) বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে সরকারি চাকরিজীবীদের পাওনা মিটিয়ে দিতে অতিরিক্ত অর্থের জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তাই বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে এই অর্থ জোগাড় করা হচ্ছে। সাধারণত রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে সরকার ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের স্মরণাপন্ন হয়। অন্যান্য সময়ে সরকারের স্বল্পমেয়াদি বাজেট চাহিদা মেটাতে সাধারণত ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করা হয়ে থাকে।
অক্টোবরে ব্যাংক ঋণ ছাড়াবে ৬০ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ইতোমধ্যে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে। নতুন ট্রেজারি বিলের ৫ হাজার কোটি টাকা যোগ হলে চলতি অক্টোবরে মোট ঋণ উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পূর্ববর্তী মাসগুলোতেও ব্যাংক খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ সংগ্রহ করা হয়েছিল
- জুলাই মাসে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল ৫৬ হাজার কোটি টাকা।
- আগস্ট মাসে গৃহীত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার কোটি টাকা।
- সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে তোলা হয় সাড় ৪১ হাজার কোটি টাকা।
তবে সংগৃহীত ঋণের বড় একটি অংশ পূর্বের মেয়াদি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মেয়াদপূর্তিতে মূল্য পরিশোধ কিংবা পুনঃঅর্থায়নে ব্যয় করতে হয়েছে। যে কারণে মোট সংগৃহীত ঋণ এবং সরকারের প্রকৃত বা নিট ঋণের পরিমাণের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরবরাহ করেছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা এবং অবশিষ্টাংশ জুগিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সুদের হার বৃদ্ধি ও রাজস্ব ঘাটতি
সরকারের ঋণের চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ট্রেজারি বিলের সুদের হারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। গত ৫ অক্টোবর ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা আগামী ২৬ অক্টোবর বৃদ্ধি পেয়ে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে উন্নীত হয়। উল্লেখ্য, গত আগস্ট মাসের শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, কাঙ্ক্ষিত ও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় সম্ভব না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে বাড়তি ঋণ নিতে হচ্ছে। সরকারের চাহিদানুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থের জোগান দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। তবে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কমাতে চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ইস্যুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি
চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৫ হাজার ৪৯আই কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আয় কম হওয়ায় সরকারের ঋণনির্ভরতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই রাজস্ব আদায়ে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দেয়।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
প্রশাসন ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা সরকারের এই ধারাবাহিক ঋণপ্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন
- সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী মন্তব্য করেন, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় বৃদ্ধি না করে নতুন বেতনকাঠামোসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় বাড়ানো হলে সরকারের ঋণের বোঝা দ্রুত ভারী হবে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সংকুচিত হওয়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে।
- বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, রাজস্ব আদায় না বাড়ায় সরকারকে লাগাতার ঋণ নিতে হচ্ছে, এমনকি আগের ঋণের মেয়াদ শেষ হলে তা পরিশোধ করতেও নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
- অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান জানান, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো প্রয়োজন ছিল। তবে এই ব্যয়ের চাপ সামলাতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই।
নতুন বেতনকাঠামোর চিত্র ও সম্ভাব্য ব্যয়
নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাত মিলিয়ে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। পাশাপাশি দেশে পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ২৫ হাজার।
চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বেতন, ভাতা ও পেনশনের প্রাক্কলিত বরাদ্দ ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। এই নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সরকারি প্রাক্কলনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: দৈনিক এদিন























