ভূমিকম্পেই সরে গিয়েছিল গঙ্গা: বালির আগ্নেয়গিরি জানাল পথবদলের গল্প
- আপডেট সময় : ১২:০২:৪৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫ ৩৬০৪ বার পড়া হয়েছে
ভূমিকম্পেই সরে গিয়েছিল গঙ্গা: বালির আগ্নেয়গিরি জানাল পথবদলের গল্প
ভূমিকম্পেই সরে গিয়েছিল গঙ্গা: বালির আগ্নেয়গিরি জানাল পথবদলের গল্প।
নেচার কমিউনিকেশনস’ জার্নালে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে সংঘটিত এক শক্তিশালী ভূমিকম্প গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার গতিপথে নাটকীয় পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছিল। ঢাকার রাস্তার পাশে খোঁড়াখুঁড়ির সময় পাওয়া পলিমাটির স্তর সেই প্রাচীন ভূমিকম্পের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তুলে ধরেছে।
ঢাকার রাস্তায় উঁকি দিল প্রাচীন বালির আগ্নেয়গিরি:
নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. এলিজাবেথ চেম্বারলেন ও তাঁর সহকর্মীরা ঢাকা জরিপের সময় হঠাৎই দেখতে পান ‘বালির আগ্নেয়গিরি’র মতো একটি ভূ-গঠন। রাস্তার পাশে নতুন খোঁড়া একটি গর্তের দেয়ালে বালির স্তর অস্বাভাবিকভাবে উপরের দিকে উঠে আছে—যা সাধারণত প্রবল ভূমিকম্পের সময় সৃষ্ট তরলীকরণ প্রক্রিয়ার ফল।
ড. চেম্বারলেন বলেন, ভূমিকম্পের প্রচণ্ড কম্পনে নদীগর্ভে জমে থাকা হালকা বালির স্তর কাঁদামাটির নিচ থেকে তীব্র চাপে উপরের দিকে উঠে আসে। সেই বালি কাদা ভেদ করে ফেটে বের হয়ে আগ্নেয়গিরির শঙ্কুর মতো আকৃতি নেয়, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন স্যান্ড ভলকানো বা বালির আগ্নেয়গিরি।
ভূমিকম্প ছিল কমপক্ষে ৭–৮ মাত্রার:
নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া ক্লাইমেট স্কুলের ভূ-পদার্থবিদ ড. মাইকেল স্টেকলার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঢাকা শহরের এই বালির আগ্নেয়গিরির আকারেই বোঝা যায়—সেই ভূমিকম্প ছিল ভয়াবহ শক্তিশালী। কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ মাত্রার ওই কম্পন ১৯০৬ সালের স্যান ফ্রান্সিসকোর ঐতিহাসিক ভূমিকম্পের সমতুল্য হতে পারে।
পলিমাটি বলছে— আড়াই হাজার বছর আগের ঘটনা:
নমুনার বয়স নির্ণয়ে গবেষকরা ব্যবহার করেন অপটিক্যাল স্টিমুলেটেড লুমিনিসেন্স (OSL) প্রযুক্তি, যা মাটির কণা সর্বশেষ কখন সূর্যের আলো দেখেছিল তা জানায়।
পরীক্ষায় দেখা যায়, বালির আগ্নেয়গিরির বয়স প্রায় ২,৫০০ বছর। একই সময়ের একটি বৃহৎ নদীচ্যানেলের পলিমাটির নমুনাও পাওয়া গেছে কাছাকাছি এলাকায়।
এই দুটি প্রমাণই ইঙ্গিত দেয়—সেই সময়কার একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প গঙ্গা নদীর গতিপথকে বদলে দিতে ভূমিকা রেখেছিল। গবেষকদের ধারণা, নদীর পুরনো প্রবাহপথ সরে গিয়ে আজকের গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র ব্যবস্থার বিকাশে এই ভূমিকম্প ছিল একটি বড় পরিবর্তনকারী ঘটনা।
গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা:
বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী নদীপ্রবাহ ব্যবস্থা। হিমালয় থেকে উৎপত্তি হয়ে গঙ্গা ভারতের মধ্যভাগ পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়। এরপর মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয় এই বিশাল নদীপ্রবাহ। আমাজন ও কঙ্গোর পর গঙ্গা অববাহিকাতেই পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পানি প্রবাহ ঘটে।
বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ গড়ে উঠেছে গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা নদীর মিলিত পলিতে। ফলে এই অববাহিকায় ভূমিকম্প হলে তার প্রভাবও বিপুল ও বিস্তৃত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য গবেষণার গুরুত্ব:
গবেষণা বলছে—এই অঞ্চলে হাজার বছর পরপর বৃহৎ ভূমিকম্প হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। আরেকটি বড় কম্পন এলে বাংলাদেশের ১৪০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সিসমিক পর্যবেক্ষণ বাড়ানো, ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, নগর পরিকল্পনায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নির্ণয়, গণসচেতনতা বৃদ্ধি। এসব এখনই জোরদার করা জরুরি।
অতীতের শিক্ষা ভবিষ্যতের সুরক্ষা:
ঢাকার পলিমাটি যে প্রাচীন ভূমিকম্পের গোপন ইতিহাস উন্মোচন করেছে, তা শুধু ভূতত্ত্বেরই অনুসন্ধান নয়—এটি ভবিষ্যৎ বিপর্যয় রোধে একটি সতর্কবার্তাও। গঙ্গা অববাহিকার অতীত কাঁপন জানাচ্ছে, ভূমিকম্প-প্রবণ এই অঞ্চলে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

























