ঢাকা ০৭:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
১ নভেম্বর থেকে খাদ্য ব্যবসায় লাইসেন্স ও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক দারোয়ানী রেলস্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজের দাবিতে রেলপথ অবরোধ যত শো বাড়ছে, ততই ভয় পাচ্ছি: রোজী সিদ্দিকী ওয়্যারেবল এআই: দৈনন্দিন সঙ্গী নাকি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ঝুঁকি? অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাভুমার রেকর্ড গড়া ১৭৯ রানের ইনিংস রৌমারীতে অবৈধ কাঁকড়া গাড়ির ধাক্কায় দুমড়েমুচড়ে গেল সবজিবোঝাই অটোরিকশা বিএমএসআরআই-তে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা নিয়োগ লুসাইল প্রাসাদে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁকে কাতারের আমিরের রাজকীয় নাগেশ্বরীতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন ময়মনসিংহে সিঁদুর খেলায় বিদায় জানালেন ভক্তরা

ওয়্যারেবল এআই: দৈনন্দিন সঙ্গী নাকি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ঝুঁকি?

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:১৫:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সকাল ৮টার সময় অফিসের পথে বাসে বসে নুসরাত নামের এক কর্মী তাঁর সহকর্মীর গলায় ঝোলানো অদ্ভুত এক পেনডেন্ট দেখে চমকে ওঠেন। গয়না নয়, বরং সেটি একটি পরিধানযোগ্য এআই বা ‘ওয়্যারেবল এআই’ ডিভাইস, যা সার্বক্ষণিক আশেপাশের কথাবার্তা রেকর্ড করে দিনশেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার সারাংশ তৈরি করে দেয়। নুসরাতের মনে স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তি তৈরি হয়, কারণ তাঁর সম্মতি ছাড়াই সহকর্মী এই যন্ত্রের মাধ্যমে কথাবার্তা রেকর্ড করছিলেন। অফিসের পথে বাসে বসে নুসরাত (ছদ্মনাম) হঠাৎ খেয়াল করলেন, তাঁর সহকর্মীর গলায় ঝোলানো ছোট্ট একটা পেনডেন্ট বা লকেট, যেটা আসলে কোনো গয়না নয়। ‘এটা কী। জিজ্ঞেস করতেই সহকর্মী হেসে বললেন, ‘এটা সারাক্ষণ শুনছে আমার আশেপাশের কথাবার্তা, আর দিনশেষে নিজে থেকেই একটা সারাংশ লিখে দেয়। নুসরাত কিছুটা অবাক, কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে ভাবলেন, তাহলে তো এই যন্ত্র আমার কথাও শুনছে, অথচ আমার সম্মতিই নেয়নি।

প্রযুক্তি বিশ্বে এখন ওয়্যারেবল এআই এক নতুন প্রবণতা। স্মার্টফোনের বিকল্প হিসেবে বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এমন সব যন্ত্রে বিনিয়োগ করছে যা সবসময় শরীরে পরিধান করা সম্ভব। একটি বড় প্রতিষ্ঠান এ বছরেই প্রায় এক কোটি ডিভাইস বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্মার্ট চশমার হিসাব ধরলে গত বছর প্রায় ৭০ লাখ ইউনিট বিক্রি হয়েছে, যা এই খাতের দ্রুত বিকাশের প্রমাণ দেয়। বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এখন স্মার্টফোনের পরের ধাপ হিসেবে এমন সব যন্ত্রে বিনিয়োগ করছে, যা সব সময় শরীরে পরিধেয় হয়ে থাকবে আর চারপাশের কথাবার্তা থেকে সাহায্য নিয়ে আসবে সরাসরি। একটি বড় প্রতিষ্ঠান এ বছরেই প্রায় এক কোটি এমন ডিভাইস বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, আর তাদের নতুন স্মার্ট চশমার সিরিজও বাজারে আসছে; একের পর একেকটা মডেল এরই মধ্যে বাজারে এসেছে, আরও তিন-চারটা মডেল আসছে আগামী কয়েক মাসে।

প্রশ্ন উঠছে, কেন সবাই হঠাৎ এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী হচ্ছে? টাইপ করা বা ফোন ব্যবহারের বদলে এই ডিভাইসগুলো ব্যবহারকারীকে সার্বক্ষণিক এআইয়ের সাথে যুক্ত রাখে। চোখের ইশারা বা কথা বলার মাধ্যমেই সভার সারাংশ, টু-ডু লিস্ট বা হারিয়ে যাওয়া তথ্য উদ্ধারের মতো কাজগুলো এখন সহজ। এমনকি বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের কাজের সুবিধার্থে শতাধিক ডিভাইস একসাথে কিনে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে।

এই ডিভাইসগুলো শুধু ব্যবহারকারীর কথাই শোনে না, বরং আশপাশের প্রত্যেকের কথোপকথন রেকর্ড করে ফেলে।

অথচ তারা জানেই না যে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য কোথাও জমা হচ্ছে। পূর্বেও এমন ডিভাইস বাজারে এসে গোপনীয়তা ও উপযোগিতার অভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। এবারের নতুন প্রজন্মের ডিভাইসগুলো ফ্যাশন ব্র্যান্ডের অংশীদারত্বের মাধ্যমে পণ্যকে সাধারণ জিনিসের মোড়কে বাজারে আনলেও গোপনীয়তার মূল সংকটটি একই থেকে গেছে। প্রযুক্তির এই সুন্দর মোড়ক কি তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে আড়াল করছে?

বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর হার্ডওয়্যার বিভাগ বছরের পর বছর লোকসানে থাকায় বাজার দখলের চাপে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার দিকগুলো অনেক সময় উপেক্ষিত হতে পারে। তাই সচেতনতা জরুরি।

এসব ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে সতর্কতাগুলো মেনে চলা উচিত

  1. অফিসে এমন ডিভাইস ব্যবহারের আগে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা যাচাই করুন—কোন তথ্য সংরক্ষিত থাকবে, আর কর্মী ছেড়ে দিলে সেই তথ্যের কী হবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
  2. অন্যের সঙ্গে কথা বলার সময় ডিভাইসটি রেকর্ড করছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানিয়ে দেওয়াটাই ভদ্রতা আর অনেক জায়গায় আইনি বাধ্যবাধকতাও। সেটা মেনে ব্যবহার করুন।
  3. সংবেদনশীল আলোচনার সময় (পারিবারিক, চিকিৎসা বা আর্থিক বিষয়) ডিভাইসটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

নুসরাত নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, স্মার্ট চশমা কিনলেও তিনি ব্যক্তিগত আলোচনায় বসার আগে সেটি খুলে রাখবেন এবং বন্ধুদের আগাম জানিয়ে রাখবেন যে তাঁর সাথে কথা বলার সময় এআই রেকর্ড করছে। পরিশেষে, এই যন্ত্র জীবনের বন্ধু হবে নাকি গোপনীয়তার শত্রু, তা নির্ভর করছে আমরা কাকে কতটা শোনার অনুমতি দিচ্ছি তার ওপর। কোন সভায় কী বলা হলো, কাকে কী প্রতিশ্রুতি দিলাম, সব।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ওয়্যারেবল এআই: দৈনন্দিন সঙ্গী নাকি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ঝুঁকি?

আপডেট সময় : ০৬:১৫:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

সকাল ৮টার সময় অফিসের পথে বাসে বসে নুসরাত নামের এক কর্মী তাঁর সহকর্মীর গলায় ঝোলানো অদ্ভুত এক পেনডেন্ট দেখে চমকে ওঠেন। গয়না নয়, বরং সেটি একটি পরিধানযোগ্য এআই বা ‘ওয়্যারেবল এআই’ ডিভাইস, যা সার্বক্ষণিক আশেপাশের কথাবার্তা রেকর্ড করে দিনশেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার সারাংশ তৈরি করে দেয়। নুসরাতের মনে স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তি তৈরি হয়, কারণ তাঁর সম্মতি ছাড়াই সহকর্মী এই যন্ত্রের মাধ্যমে কথাবার্তা রেকর্ড করছিলেন। অফিসের পথে বাসে বসে নুসরাত (ছদ্মনাম) হঠাৎ খেয়াল করলেন, তাঁর সহকর্মীর গলায় ঝোলানো ছোট্ট একটা পেনডেন্ট বা লকেট, যেটা আসলে কোনো গয়না নয়। ‘এটা কী। জিজ্ঞেস করতেই সহকর্মী হেসে বললেন, ‘এটা সারাক্ষণ শুনছে আমার আশেপাশের কথাবার্তা, আর দিনশেষে নিজে থেকেই একটা সারাংশ লিখে দেয়। নুসরাত কিছুটা অবাক, কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে ভাবলেন, তাহলে তো এই যন্ত্র আমার কথাও শুনছে, অথচ আমার সম্মতিই নেয়নি।

প্রযুক্তি বিশ্বে এখন ওয়্যারেবল এআই এক নতুন প্রবণতা। স্মার্টফোনের বিকল্প হিসেবে বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এমন সব যন্ত্রে বিনিয়োগ করছে যা সবসময় শরীরে পরিধান করা সম্ভব। একটি বড় প্রতিষ্ঠান এ বছরেই প্রায় এক কোটি ডিভাইস বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্মার্ট চশমার হিসাব ধরলে গত বছর প্রায় ৭০ লাখ ইউনিট বিক্রি হয়েছে, যা এই খাতের দ্রুত বিকাশের প্রমাণ দেয়। বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এখন স্মার্টফোনের পরের ধাপ হিসেবে এমন সব যন্ত্রে বিনিয়োগ করছে, যা সব সময় শরীরে পরিধেয় হয়ে থাকবে আর চারপাশের কথাবার্তা থেকে সাহায্য নিয়ে আসবে সরাসরি। একটি বড় প্রতিষ্ঠান এ বছরেই প্রায় এক কোটি এমন ডিভাইস বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, আর তাদের নতুন স্মার্ট চশমার সিরিজও বাজারে আসছে; একের পর একেকটা মডেল এরই মধ্যে বাজারে এসেছে, আরও তিন-চারটা মডেল আসছে আগামী কয়েক মাসে।

প্রশ্ন উঠছে, কেন সবাই হঠাৎ এই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী হচ্ছে? টাইপ করা বা ফোন ব্যবহারের বদলে এই ডিভাইসগুলো ব্যবহারকারীকে সার্বক্ষণিক এআইয়ের সাথে যুক্ত রাখে। চোখের ইশারা বা কথা বলার মাধ্যমেই সভার সারাংশ, টু-ডু লিস্ট বা হারিয়ে যাওয়া তথ্য উদ্ধারের মতো কাজগুলো এখন সহজ। এমনকি বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের কাজের সুবিধার্থে শতাধিক ডিভাইস একসাথে কিনে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে।

এই ডিভাইসগুলো শুধু ব্যবহারকারীর কথাই শোনে না, বরং আশপাশের প্রত্যেকের কথোপকথন রেকর্ড করে ফেলে।

অথচ তারা জানেই না যে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য কোথাও জমা হচ্ছে। পূর্বেও এমন ডিভাইস বাজারে এসে গোপনীয়তা ও উপযোগিতার অভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। এবারের নতুন প্রজন্মের ডিভাইসগুলো ফ্যাশন ব্র্যান্ডের অংশীদারত্বের মাধ্যমে পণ্যকে সাধারণ জিনিসের মোড়কে বাজারে আনলেও গোপনীয়তার মূল সংকটটি একই থেকে গেছে। প্রযুক্তির এই সুন্দর মোড়ক কি তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে আড়াল করছে?

বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর হার্ডওয়্যার বিভাগ বছরের পর বছর লোকসানে থাকায় বাজার দখলের চাপে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার দিকগুলো অনেক সময় উপেক্ষিত হতে পারে। তাই সচেতনতা জরুরি।

এসব ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে সতর্কতাগুলো মেনে চলা উচিত

  1. অফিসে এমন ডিভাইস ব্যবহারের আগে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা যাচাই করুন—কোন তথ্য সংরক্ষিত থাকবে, আর কর্মী ছেড়ে দিলে সেই তথ্যের কী হবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
  2. অন্যের সঙ্গে কথা বলার সময় ডিভাইসটি রেকর্ড করছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানিয়ে দেওয়াটাই ভদ্রতা আর অনেক জায়গায় আইনি বাধ্যবাধকতাও। সেটা মেনে ব্যবহার করুন।
  3. সংবেদনশীল আলোচনার সময় (পারিবারিক, চিকিৎসা বা আর্থিক বিষয়) ডিভাইসটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

নুসরাত নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, স্মার্ট চশমা কিনলেও তিনি ব্যক্তিগত আলোচনায় বসার আগে সেটি খুলে রাখবেন এবং বন্ধুদের আগাম জানিয়ে রাখবেন যে তাঁর সাথে কথা বলার সময় এআই রেকর্ড করছে। পরিশেষে, এই যন্ত্র জীবনের বন্ধু হবে নাকি গোপনীয়তার শত্রু, তা নির্ভর করছে আমরা কাকে কতটা শোনার অনুমতি দিচ্ছি তার ওপর। কোন সভায় কী বলা হলো, কাকে কী প্রতিশ্রুতি দিলাম, সব।

Facebook Comments Box