১৬ সরকারি মেডিকেল কলেজে তীব্র সংকট, তবুও নতুন অনুমোদন
- আপডেট সময় : ০৯:৪৪:১৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১১০টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৩৭টি। তবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ১৬টি মেডিকেল কলেজ মারাত্মক শিক্ষকস্বল্পতা, অবকাঠামোগত সংকট এবং নিজস্ব জমির অভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। মূলত ২০০৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রতিষ্ঠিত এসব মেডিকেল কলেজের অবস্থা নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১০ বছর পরও কলেজের নিজস্ব জমির বন্দোবস্ত হয়নি।
হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের উদাহরণটি সবচেয়ে প্রকট। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজের নিজস্ব কোনো জমি নেই। ২০১৮ সালে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও এটি এখনো শহরের ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালের একটি ছোট অংশে পরিচালিত হচ্ছে। তিন হাজার বর্গফুট জায়গায় পাঁচটি শ্রেণিকক্ষে চলছে কয়েক শ শিক্ষার্থীর পাঠদান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষার্থী জানান, মেডিকেল কলেজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় নিজস্ব হাসপাতালের সুবিধা তাদের নেই, যা তাদের শিক্ষার মানকে ব্যাহত করছে। হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালটির অবস্থান শহরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে। নেই শিক্ষার্থীদের আবাসনব্যবস্থা বা হোস্টেল। আমাদের নির্ভর করতে হয় সদর হাসপাতালের ওপর। কিন্তু এই হাসপাতালে রেজিস্ট্রার না থাকায় আমাদের কাজের তদারক করার কেউ নেই।
তালিকায় থাকা ১৬টি সংকটাপন্ন মেডিকেল কলেজের মধ্যে রয়েছে পাবনা, গোপালগঞ্জ, যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ, নীলফামারী, নেত্রকোনা, নওগাঁ, মাগুরা, চাঁদপুর ও সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ। এর মধ্যে পাঁচটি মেডিকেল কলেজের নিজস্ব জমি ও ভবন—কোনোটিই নেই। বাকিগুলোর নিজস্ব ভবন থাকলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও শিক্ষাসামগ্রীর অভাব প্রকট। পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের ছাত্রীদের জন্য কোনো আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় তারা একটি অব্যবহৃত ভবনে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
শিক্ষকসংকটের চিত্রটি আরও ভয়াবহ। মাগুরা মেডিকেল কলেজে ৮৪টি পদের মধ্যে ৩২ জন কর্মরত, অর্থাৎ ৬২ শতাংশ পদই শূন্য। একইভাবে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ৪৫ শতাংশ এবং সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে ৩৯ শতাংশ শিক্ষকের পদ খালি পড়ে আছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই ১৬টি মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক, সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপকের ২৭২টি পদের মধ্যে ১০০টি পদে শিক্ষক কর্মরত। মৌলিক আটটি বিষয়ে ১৭২টি পদ বা ৬৩ শতাংশ পদ শূন্য থাকায় পাঠদান প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে নওগাঁ মেডিকেল কলেজে মৌলিক বিষয়ে সব পদই খালি পড়ে আছে। নেই প্রয়োজনীয় শিক্ষক, ব্যবহারিক শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবরেটরি।
মেডিকেল শিক্ষায় ‘আইটেম’ ও ‘কার্ড’ পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাবনা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন যে, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় তাদের নিয়মিত মূল্যায়ন পরীক্ষাগুলো ঠিকঠাকভাবে নেওয়া সম্ভব হয় না। পাবনা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ১৮ বছর পরও সেখানে বায়োকেমিস্ট্রির মতো মৌলিক বিষয়ে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন।
রাজনৈতিক বিবেচনায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা এখনো অব্যাহত। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও নতুন করে মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মুন্সিগঞ্জে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার জন্য জমি চিহ্নিত করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে নৌবাহিনীকে চট্টগ্রামের বিমানবন্দর সড়কে মেডিকেল কলেজ করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
নরসিংদীতে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে, অথচ এখনো এর কোনো জমি ঠিক হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী কমপক্ষে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকা বাঞ্ছনীয় হলেও সেখানে বর্তমানে মাত্র ১০০ শয্যার অপর্যাপ্ত জনবলসম্পন্ন হাসপাতাল রয়েছে। একইভাবে বিএনপি সরকারের আমলে ঠাকুরগাঁও মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং ভোলা ও জয়পুরহাটে নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আটতলা হাসপাতাল ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও অষ্টম তলায় মেডিকেল কলেজ চলছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, অধিকাংশ মেডিকেল কলেজই শিক্ষার মান নিশ্চিত করার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় গড়ে তোলা হয়েছে। অথচ একটি মানসম্মত মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজস্ব জমি, ভবন ও হাসপাতাল থাকা বাধ্যতামূলক। সরকারি খাতে এমন আইন বা বিধি না থাকায় অপরিকল্পিতভাবে কলেজ স্থাপনের ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে ৭টি এবং বেসরকারি খাতে ৬৬টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। ১১০টি মেডিকেল কলেজের অধিকাংশেরই শিক্ষক ও শিক্ষাসামগ্রীর সংকট দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়লেও, মান নিশ্চিত করার দিকে কর্তৃপক্ষের নজর কম বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
সূত্র: প্রথম আলো
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ

























