মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ২৭৭ কোটি ডলারের করপোরেট ও ব্যক্তিগত অনুদান
- আপডেট সময় : ১২:০০:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অর্থায়নের নজিরবিহীন রেকর্ড তৈরি হতে যাচ্ছে। আসন্ন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনেই প্রায় ১ হাজার ১৬০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে অ্যাডইমপ্যাক্ট নামের একটি তথ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা। রাজনৈতিক তহবিলের এই সুবিশাল অংশের যোগান আসছে মূলত প্রভাবশালী ধনকুবের, রাজনৈতিক অলাভজনক সংগঠন এবং বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে এই অনুদান দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫-২৬ নির্বাচনী চক্রের আইন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি ফেডারেল পর্যায়ের কোনো প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারে প্রতি নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ ডলার অনুদান দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে একাধিক অলাভজনক ও রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে কৌশলে বিপুল অর্থ হস্তান্তরিত হওয়ায় মূল অনুদানকারীদের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ তালিকায় রয়েছে ক্রীড়া বাজি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির পক্ষে কাজ করা বিভিন্ন গোষ্ঠী। গণতন্ত্রে একজন মানুষের যতটা গুরুত্ব থাকা উচিত বলে আমরা মনে করি, অনুদান দেওয়ার জন্য হাতে ১০ কোটি ডলার না থাকলে সেই গুরুত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।’।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের (এফইসি) সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আল-জাজিরা সম্প্রতি দেশটির সবচেয়ে বড় অনুদানদাতা ব্যক্তি, অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান ও অলাভজনক রাজনৈতিক সংস্থাগুলোর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। সেই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনে সরাসরি প্রার্থীর তহবিল ছাড়াও বিভিন্ন স্বতন্ত্র ব্যয়ের মাধ্যমে সিংহভাগ অর্থ রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর কারণ, তাঁদের বেশির ভাগ অর্থ সরাসরি প্রার্থীদের প্রচার তহবিলে যায়নি।
শীর্ষ ৫০ দাতার মোট অনুদান ২৭৭ কোটি ডলার
এফইসির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য গঠিত শীর্ষ ৫০ জন দাতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন সম্মিলিতভাবে মোট ২৭৭ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে। এই রাজনৈতিক অনুদানের সিংহভাগই গেছে দলীয় রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে।
- রিপাবলিকানপন্থী অনুদান: ১৬৭ কোটি ডলার (মোট অনুদানের প্রায় ৬০ শতাংশ)।
- ডেমোক্র্যাটপন্থী অনুদান: ৮৩ কোটি ২০ লাখ ডলার (মোট অনুদানের প্রায় ৩০ শতাংশ)।
- দ্বিদলীয় ও বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনুদান: ২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
দ্বিদলীয় ও বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট তালিকার মধ্যে ক্রীড়া বাজি এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত খাত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় শিবিরের প্রার্থীদের জন্য এসব খাত থেকে তহবিল সরবরাহ করা হচ্ছে।
সুপার পিএসি এবং ডার্ক মানির ভূমিকা
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সুপার পিএসি (পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি) এবং অলাভজনক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে অর্থ প্রবাহের সুযোগ তৈরি হয় ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের দুটি ঐতিহাসিক রায়ের পর। এই আইনি কাঠামোর কারণে প্রার্থীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্বাধীন সংস্থাগুলো নির্বাচনে অসীম পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার সুবিধা পায়। নীতিগতভাবে সুপার পিএসিগুলোকে তাদের দাতাদের তালিকা নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রকাশ করতে হয়। তবে ওয়ান নেশন বা মেজরিটি ফরোয়ার্ডের মতো অলাভজনক রাজনৈতিক সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে আইন আলাদা। তাদের নিজস্ব অর্থদাতাদের পরিচয় প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা নেই।
এর ফলে এসব অলাভজনক সংস্থা যখন অন্য কোনো সুপার পিএসিতে অর্থ হস্তান্তর করে, তখন আসল দাতার নাম জনসমক্ষে উন্মোচিত হয় না। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই ধরনের অপ্রকাশিত এবং গোপন উৎসের অর্থকে ‘ডার্ক মানি’ বা অন্ধকার অর্থ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব ও বিষেজ্ঞ মতামত
হার্ভার্ড ল স্কুলের আইন ও নেতৃত্ববিষয়ক অধ্যাপক এবং নির্বাচনী অর্থায়ন সংস্কার আন্দোলনের প্রবক্তা লরেন্স লেসিগ মনে করেন, গোপন হলেও রাজনীতিবিদেরা জানেন এই অর্থ কাদের কাছ থেকে আসছে। আল-জাজিরার ‘লেটস ফোকাস’ নামক অনুষ্ঠানে সাবেক ফেডারেল নির্বাচন কমিশন চেয়ারম্যান ব্র্যাডলি স্মিথের সঙ্গে এক বিশেষ বিতর্কে লেসিগ উল্লেখ করেন, ‘রাজনীতিবিদদের কাছে অর্থের উৎস অন্ধকারে থাকে না। রাজনীতিবিদদের দিক থেকে অর্থ কোথা থেকে আসছে, তা নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি নেই। তাঁদের জানা আছে, বিনিময়ে কী করতে হবে।’
লেসিগ আরও যুক্তি দেন যে, নির্বাচনে সর্বমোট কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে তার চেয়েও বড় সংকট হলো স্বল্পসংখ্যক ধনকুবেরের হাতে রাজনৈতিক প্রভাব কেন্দ্রীভূত হওয়া। একজন সাধারণ নাগরিকের যে রাজনৈতিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত, এই বিপুল অর্থের বলয়ে তা নষ্ট হয়ে যায়।
ব্যক্তি পর্যায়ে রিপাবলিকানপন্থী শীর্ষ অনুদানকারী
এফইসির তথ্যানুসারে, ২০২৬ সালের নির্বাচনী চক্রে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এককভাবে সর্বোচ্চ অনুদান দিয়েছেন টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক। ব্যক্তিপর্যায়ের শীর্ষ অনুদানকারীদের তালিকাটি নিচে উল্লেখ করা হলো
- ইলন মাস্ক: ৪ ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার
- এলিজাবেথ ও রিচার্ড ইউলেইন: ১৫ কোটি ডলার
- জেফ ও জ্যানিন ইয়াস: ১১ কোটি ডলার
পণ্য পরিবহনের সামগ্রী প্রস্তুতকারী ইউলাইন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এলিজাবেথ ও রিচার্ড ইউলেইন দম্পতি এবং অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান সাসকুয়েহানা ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জেফ ইয়াস ও জ্যানিন ইয়াস দম্পতি—সকলেই রিপাবলিকানপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে অনুদান নিশ্চিত করেছেন।
ব্যক্তি পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটপন্থী শীর্ষ অনুদানকারী
ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনে এগিয়ে আসা শীর্ষ ব্যক্তিরা হলেন বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী এবং ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ সরোস, সাবেক নিউ ইয়র্ক মেয়র মাইক ব্লুমবার্গ এবং লিঙ্কডইনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান।
- জ জর্জ সরোস: ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার
- মাইক ব্লুমবার্গ: ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার
- রিড হফম্যান ও মিশেল ই: ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার
এবারের নির্বাচনে অন্তত চারজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি এককভাবে ১০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ প্রদান করে রেকর্ড গড়েছেন।
রিপাবলিকানপন্থী শীর্ষ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন
ব্যক্তিগত অনুদানের বাইরে বিভিন্ন পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি এবং অলাভজনক সংস্থা কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছে। সিনেট রিপাবলিকান নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত অলাভজনক সংস্থা ‘ওয়ান নেশন’ তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। সংগঠনটি সিনেটে রিপাবলিকান নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
- ওয়ান নেশন: ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার
- আমেরিকান অ্যাকশন নেটওয়ার্ক: ৬ কোটি ৪৩ লাখ ডলার
- আমেরিকান প্রসপারিটি অ্যালায়েন্স: ৫ কোটি ৭ লাখ ডলার
ডেমোক্র্যাটপন্থী শীর্ষ রাজনৈতিক সংগঠন
ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনকারী শীর্ষ সংগঠনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মেজরিটি ফরোয়ার্ড, হাউস মেজরিটি ফরোয়ার্ড এবং ইকোনমিক অপরচুনিটি ফান্ড। এ সংস্থাগুলো ডেমোক্র্যাটিক সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের প্রচারকাজে মূল অর্থ যোগান দিচ্ছে।
- হাউস মেজরিটি ফরোয়ার্ড: ৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলার
- ইকোনমিক অপরচুনিটি ফান্ড: ৪ কোটি ১৫ লাখ ডলার
ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক খাতের বড় অনুদান
ব্যবসায়িক খাতের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানিগুলো মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিশাল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছে। শীর্ষ ক্রিপ্টো ও বাণিজ্যিক দাতারা হলো
- কয়েনবেস (বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ): ৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলার
- রিপল (ব্লকচেইনভিত্তিক লেনদেনকারী): ৪ কোটি ৯৬ লাখ ডলার
- ফরিস ডিএএক্স (ক্রিপ্টো ডটকমের চালক): ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার
- কচ (শিল্পগোষ্ঠী): ৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার
- ড্রাফটকিংস (ক্রীড়া বাজি প্রতিষ্ঠান): ৪ কোটি ৪ লাখ ডলার
সার্বিকভাবে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন দেশটির রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি নির্ধারণ ও নির্বাচনী প্রচারণা কৌশলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- ইলন মাস্ক: ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ
























