সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো একটি ভুয়া তথ্য কীভাবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও সংবেদনশীল পারমাণবিক আলোচনাকে প্রভাবিত করতে পারে, তার একটি বড় উদাহরণ সামনে এসেছে। পোস্টটিতে দাবি করা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ডস করপসের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ভাহিদি বলেছেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা পর্যন্ত ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করবে না। পোস্টটির সঙ্গে ওই জেনারেলের একটি ছবি এবং এআই দিয়ে তৈরি একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণের মাশরুম মেঘের ছবি জুড়ে দেয়া হয়। অথচ ওই কমান্ডার আদৌ এমন কোনো কথা বলেছেন কি না, তার কোনো প্রমাণ ছিল না। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে এমন কোনো তথ্যও ছিল না। কিন্তু তাতে দাবিটির দ্রুত ছড়িয়ে পড়া থামেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম ও অপতথ্যের মাধ্যমে এভাবেই এক নীরব যুদ্ধ চলছে।
পরস্পরবিরোধী দাবি ও পাল্টা দাবির স্রোত এখন যুদ্ধের গতিপথ এবং স্থবির হয়ে থাকা যুদ্ধবিরতি আলোচনাকেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত করছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস দাবিটির ছড়িয়ে পড়ার পথ অনুসরণ করে দেখেছে, এর শুরু হয়েছিল ভারতের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে। ওই অ্যাকাউন্টধারীর অনুসারী সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে ভারতের আরেকটি অ্যাকাউন্ট, যার অনুসারী প্রায় ৮২ হাজার, তা থেকে দাবিটির হিন্দি অনুবাদ প্রকাশ করা হয়। এরপর ‘মোসাদ কমেন্টারি’ নামে ইসরাইলি একটি অ্যাকাউন্ট দাবিটিকে আরও ছড়িয়ে দেয়। অ্যাকাউন্টটির নাম ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের নামের সঙ্গে মিলে গেলেও এর সঙ্গে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার কোনো নিশ্চিত সম্পর্ক নেই। অ্যাকাউন্টটি দাবি করে, ইরান আন্তরিকভাবে আলোচনা না করে সময়ক্ষেপণ করছে।
এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর ইসরাইলের চ্যানেল ১৪ উদ্ধৃতিটি ইংরেজিতে প্রচার করে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ইয়াইর নেতানিয়াহু কয়েক মিনিটের মধ্যেই এসব পোস্ট আরও ছড়িয়ে দেন। আর এর তিন ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে দাবিটি তার বাবার বক্তৃতায় জায়গা করে নেয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, কীভাবে যাচাইহীন একটি তথ্য মুহূর্তের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার এক বক্তৃতায় দাবিটির উল্লেখ করেন এবং পরে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজও সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ভাইরাল হওয়া এই পোস্টটিকে ‘ইসলামিক রিপাবলিকের বিরুদ্ধে মিথ্যার বন্যার একটি উদাহরণ’ বলে উড়িয়ে দেন। তিনি কোনো প্রমাণ না দিয়েই এ ধরনের অপপ্রচারের পেছনে ইসরাইল রয়েছে বলে সরাসরি অভিযোগ করেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দুই দশক ধরে ইরানের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগকে দেশটির ওপর সামরিক অভিযান চালানোর যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বাঘাইয়ের মতে, এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
এই পুরো ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল যুগে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যখন কোনো অখ্যাত অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো ভুয়া তথ্য কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি বা যুদ্ধের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে প্রভাব ফেলে, তখন তা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে পারমাণবিক আলোচনার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এ ধরনের বিভ্রান্তি কেবল আলোচনার পথই রুদ্ধ করে না, বরং আঞ্চলিক অস্থিরতাকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে তা শেয়ার করার প্রবণতা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন সংকটের জন্ম দিচ্ছে, যা থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর নজরদারি ও সচেতনতা প্রয়োজন।
সূত্র: মানবজমিন
Leave a Reply