বারবার ভিসি নিয়োগ ও অপসারণ: অস্থিরতায় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
- আপডেট সময় : ০৭:৩৩:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) নিয়োগ কেন্দ্রিক অস্থিরতা যেন থামছেই না। একের পর এক বিতর্কিত নিয়োগ এবং তার জেরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে নিয়মিত ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। নিয়োগের পর ত্রুটি শনাক্ত বা বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার বদলে কেন নিয়োগের আগেই যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে না, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) স্থবিরতা কাটছে না টানা আট দিন ধরে। মাত্র ৫৬ দিন দায়িত্ব পালনের পর সরকার অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক ড. শেখ শরিফুল আলমকে নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়। এতে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সাবেক ভিসিকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। বর্তমানে আগের ভিসি অনলাইনে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করলেও ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম পুরোপুরি অচল। এদিকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে নতুন ভিসি অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। গত ২৬শে সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করলেও শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট থেকে আসা কোনো শিক্ষককে ভিসি হিসেবে মানতে নারাজ। আন্দোলনের মধ্যেই বারিধারার অস্থায়ী কার্যালয়ে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের মধ্যে দুইবার ভিসি নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ টানা কর্মসূচি পালন করেছেন। গত ৭ই সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষকসহ এগারো জন কর্মকর্তা পদত্যাগ করার পর থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেদিন থেকেই আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরে দু’বার ভিসি নিয়োগ দেয়া হলো। এরই ধারাবাহিকতায় ‘নতুন ভিসিকে লাল কার্ড’ কর্মসূচির ডাক দেয়া হয়।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন নিয়োগ বিভ্রাট নতুন কিছু নয়। গত ১৪ই মে দেশের ১১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনিসুর রহমানকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলেও, নিয়োগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা বাতিল করা হয়। গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসিকে প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার্থীরা মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে নিয়োগের পর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল, যার জেরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। এছাড়া গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. নাজমুস সাদাতকে মাত্র ৩৭ দিন দায়িত্ব পালনের পর সরিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) ক্ষেত্রেও প্রজ্ঞাপনে বিভ্রান্তি দেখা গিয়েছিল। প্রথমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে নিয়োগ দেওয়া হলেও, দুই দিন পর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেনকে একই পদে নিয়োগ দিয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সে সময় বিষয়টি টাইপিং মিসটেক বলে আলোচনা হয়েছিল। আবার একই নামে দুই ভিসি; ২৩ দিনের মাথায় জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) ভিসি বদল নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগের জন্য বর্তমানে একটি সার্চ কমিটি কাজ করছে। সবশেষ ১লা এপ্রিল গঠিত এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক এবং সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন একই বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অতিরিক্ত সচিব। কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান এবং অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক ভিসি বলেন, নিয়োগের পর পূর্বের কর্মকাণ্ডের ছবি বা অভিযোগ সামনে আনাটা একজন শিক্ষকের জন্য অপমানজনক। তিনি মন্তব্য করেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া নতুন কিছু নয়, তবে দলীয় লোকদের মধ্য থেকেও যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে যাচাই করে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব। তিনি মনে করেন, ভিসির পদ কোনো রাজনৈতিক পদ নয়, তাই পপুলিস্ট ডিসিশন থেকে বেরিয়ে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম ফায়েজ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের হতাশ করেছে এবং এ বিষয়ে সরকারের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, কোনো শিক্ষক যদি ভিসি হওয়ার জন্য নিজে লবিং করেন, তবে তিনি শুরুতেই অযোগ্যতার পরিচয় দেন। তাই ভবিষ্যতে লবিং করা শিক্ষকদের আবেদন শুরুতেই বাতিল করার পরামর্শ দেন তিনি। সবমিলিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য ও যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি নিয়ে এখন জনমনে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অষ্টম দিনের মতো চলা এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে যোগ দিয়েছেন শিক্ষক, কর্মকর্তারাও। এ নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সূত্র: মানবজমিন
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ

























