পাতার বাঁশিতে সুর তোলা গোলাম রাব্বানীর অনন্য জাদু
- আপডেট সময় : ১০:১৮:৩৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার গোলাম রাব্বানী (৫৬) এক অদ্ভুত শিল্পকলার অধিকারী। কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই কেবল গাছের পাতা দিয়ে তিনি অনায়াসে তুলে আনেন রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, লোকগীতি থেকে শুরু করে আধুনিক কিংবা হিন্দি সিনেমার সুর। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে তিনি মেহগনি গাছের পাতা দিয়ে সুর তুলে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। এমন সময় মাঠে ঢুকলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। মেহগনিগাছ থেকে ছিঁড়ে নিলেন দুটি পাতা।
রাব্বানীর এই যাত্রার শুরু ১৯৮২ সালে, যখন তিনি পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। বাড়ির পাশে রেললাইনের ধারে বড় ভাই শামীম আহমেদকে পাতার বাঁশি বাজাতে দেখে তিনি শেখার প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেন। দীর্ঘ চার মাসের নিরন্তর চেষ্টার পর তিনি পাতার বাঁশিতে সুর তোলার কৌশলটি রপ্ত করতে সক্ষম হন। তাঁর ভাষ্যমতে, এই শিল্পটি কেবল জেদের ওপর ভর করেই তিনি অর্জন করেছেন।
পাতার বাঁশিতে সুর তোলার জন্য ঠোঁটের সঠিক অবস্থান, পাতার ভাঁজ এবং ফুঁ দেওয়ার কৌশল নিখুঁত হওয়া জরুরি। রাব্বানীর মতে, যেকোনো গাছের পাতা দিয়েই সুর তোলা সম্ভব, তবে আতা ও মেহগনি গাছের পাতায় তুলনামূলকভাবে বেশি সুমধুর সুর পাওয়া যায়। যখন তিনি সুর তোলেন, অনেকেই তা বিস্ময় নিয়ে শোনেন এবং নিজেরাও চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে স্বীকার করেন যে কাজটা বেশ কঠিন। একটির এক প্রান্ত সামান্য ভাঁজ করে ঠোঁটে চেপে ধরলেন। এরপর ফুঁ দিতেই ভেসে এল সুর, ‘আমরা করব জয়, আমরা করব জয় একদিন’।
তাঁর এই দক্ষতা স্থানীয় পর্যায় পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়েও পরিচিতি পেয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-এর পরিচালক হানিফ সংকেতের সাথে পরিচয় হয় তাঁর। এরপর থেকে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘অল্পস্বল্প গল্প’, এটিএন বাংলার ‘কনকা কমেডিয়ান আওয়ার’ এবং ‘নেসক্যাফে গেট সেট রক’-এর মতো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। ২০২৩ সালে কোক স্টুডিও বাংলার ‘দেখা না দিলে বন্ধু কথা কইয়ো না’ গানে তাঁর পাতার বাঁশির সুর নতুন করে দর্শক-শ্রোতার মনোযোগ কেড়ে নেয়। মাঠের একপাশে মেহগনিগাছের ছায়ায় গল্প-আড্ডায় মেতেছে শিক্ষার্থীরা। একে একে শোনালেন ‘অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান’, ‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া’, ‘দেখা না দিলে বন্ধু কথা কইয়ো না’।
পেশাগত জীবনে রাব্বানী বিভিন্ন সময় কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৯৪ সালে সেতাবগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা রাব্বানী এখন নিজের বাড়ির পাশে একটি আর্ট স্কুল পরিচালনা করছেন। সেখানে শিশুদের ছবি আঁকা ও সুন্দর হাতের লেখার কলাকৌশল শেখানোর পাশাপাশি তিনি নিজে গান ও কবিতা লেখেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পাতার বাঁশি বাজিয়ে তাঁর উপার্জনের পথ সুগম হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থীও এগিয়ে এসে কুশল বিনিময়ের পর আবদার জুড়ে দিল, ‘রাব্বানী স্যার, একটা গান শোনান।’।
বোচাগঞ্জ পৌরসভার বাসিন্দা ফরিদুল ইসলাম জানান, মন খারাপের মুহূর্তে তাঁরা রাব্বানীর আর্ট স্কুলে যান। সেখানে পাতার বাঁশির সুর ও আড্ডা তাঁদের প্রশান্তি দেয়। স্থানীয় আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুর আলম জানান, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবদারে রাব্বানী প্রায়ই চমৎকার সুর শোনান।
এত পরিচিতি পাওয়ার পরেও রাব্বানী সাধারণ জীবনযাত্রায় বিশ্বাসী। স্কুলের মাঠ হোক কিংবা টং দোকানের আড্ডা, তিনি যখনই সুযোগ পান, নিজের শিল্প দিয়ে শ্রোতাদের আনন্দ দেন। তাঁর জীবনের এই অনন্য সাধনা আজ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ

























