দারিদ্র্য-নদীভাঙনের দুষ্টচক্রে কুড়িগ্রাম: উন্নয়নের চাবিকাঠি যোগাযোগ, শিল্পায়ন ও চর ব্যবস্থাপনা
- আপডেট সময় : ০৮:৩০:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ২৫৮৫৪ বার পড়া হয়েছে
দারিদ্র্য-নদীভাঙনের দুষ্টচক্রে কুড়িগ্রাম: উন্নয়নের চাবিকাঠি যোগাযোগ, শিল্পায়ন ও চর ব্যবস্থাপনা
উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জেলা কুড়িগ্রাম আজও দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা ও নদীভাঙনের এক জটিল দুষ্টচক্রে আটকে আছে। প্রায় ২,২৫৫ দশমিক ২৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ জেলায় ২৩ লাখের বেশি মানুষের বসবাস হলেও ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, জেলায় দারিদ্র্যের হার ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অতিদরিদ্রের হার ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ। চর রাজিবপুর উপজেলায় এ হার সর্বোচ্চ ৭৯ দশমিক ৮ শতাংশ, যা জেলার সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।
জেলায় ভূমিহীনতার হারও উদ্বেগজনক। প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পরিবার ভূমিহীন। একই সঙ্গে প্রায় ৫৭ শতাংশ মানুষ নানা রোগে ভুগছে। ফলে দারিদ্র্য ও স্বাস্থ্যঝুঁকি একে অপরকে আরও জটিল করে তুলছে।
নদীভাঙন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
পড়ুন>> কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে চাঞ্চল্য
ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলাসহ ১৬টি নদ-নদী কুড়িগ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। জেলার ৪৬৯টি চরের মধ্যে ২৬৯টি বসবাসযোগ্য, যেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বসবাস করছে। প্রতিবছর নদীভাঙনে হাজারো পরিবার নতুন করে ভূমিহীন হয়ে পড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নাগেশ্বরীর নারায়ণপুর থেকে চর রাজিবপুরের মোহনগঞ্জ পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদে প্রায় ৭০ কিলোমিটার, তিস্তা নদে ৪৫ কিলোমিটার এবং ধরলা নদে ৬০ কিলোমিটার এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে নদীশাসন প্রয়োজন।
শিল্পায়নের অভাবে জেলায় কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস ২০১১ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে বড় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ধরলা নদীর তীরে প্রস্তাবিত ভুটানিজ অর্থনৈতিক জোন বাস্তবায়ন না হওয়ায় সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
পড়ুন>> সীমান্তে বিজিবির অভিযানে অর্ধকোটি টাকার ভারতীয় মালামাল জব্দ, আটক-২
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কালির আলগা চরের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, “নদীভাঙনে কয়েকবার বাড়িঘর হারিয়েছি। এখনো স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রতি বছরই নতুন করে ভয় নিয়ে বাঁচতে হয়।”
একই এলাকার আকলিমা বেগম বলেন, “চরে সবকিছু থাকলেও বাজার, চিকিৎসা আর যোগাযোগ না থাকায় আমরা পিছিয়ে আছি।”
যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর বলেন, “চরাঞ্চলের উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নদীশাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি।”
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, কুড়িগ্রামের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। ধরলা ব্রিজ সংলগ্ন রেলসেতু নির্মাণ করে নাগেশ্বরী-ভূরুঙ্গামারী হয়ে সোনাহাট স্থলবন্দর পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন এবং গাইবান্ধা-বগুড়া-সিরাজগঞ্জ হয়ে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা গেলে জেলার অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।
আরও পড়ুন>>বড়ইবাড়ী দিবস : সাহস, আত্মত্যাগ ও সীমান্ত সার্বভৌমত্বের স্মরণ
তিনি আরও বলেন, বন্যাকালে গবাদিপশুর জন্য উঁচু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, স্থানীয় বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা, নদী পারাপারে সরকারি নৌযান চালু, টোলমুক্ত সুবিধা এবং স্বতন্ত্র ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন প্রয়োজন।
জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, কুড়িগ্রামের টেকসই উন্নয়নের জন্য সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। স্থায়ী নদীশাসন, শিল্পায়ন, যোগাযোগ উন্নয়ন এবং চর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কুড়িগ্রাম শুধু একটি জেলা নয়; এটি দেশের উন্নয়ন বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি—যেখানে সঠিক উদ্যোগই পারে বদলে দিতে হাজারো মানুষের জীবনমান।
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ






















