ঢাকা ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শহীদ জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, ক্ষমতার পালাবদল ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা গাজায় ইসরায়েলি হামলায় হতাহত আড়াই লাখ ছাড়াল ইরানের কেশম দ্বীপে ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা: ভিসার নিয়মে পরিবর্তন ও চাকরির সুযোগ ব্যাটের আওয়াজ নকল করে নিষিদ্ধ ইংলিশ ক্রিকেটার গাজীপুরে সাংবাদিকদের জন্য জনস্বার্থমূলক সাংবাদিকতায় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা বাংলাদেশ হাইটেক পার্কে ৩৩টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ডোমারে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার মানবতার সেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত: কাউনিয়ার ‘অটোওয়ালা’ মিজানুর রহমান

সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, ক্ষমতার পালাবদল ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

সৃষ্টি নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৭:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে

সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, ক্ষমতার পালাবদল ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, ক্ষমতার পালাবদল ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

 

আজ ৭ নভেম্বর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ঘটনাবহুল দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। এর মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নতুন মোড় নেয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের প্রভাব ক্রমেই বাড়তে থাকে।

২০২৬ সালে ৭ নভেম্বরের ৫১ বছর পূর্ণ হলো। দিনটি বিএনপির কাছে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ দিনের ঘটনাবলি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ইতিহাসবিদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।

৭ নভেম্বরের পটভূমি

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা তৈরি হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একের পর এক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান বন্দি হন।

এরপর সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ ও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ৭ নভেম্বর ভোরে সেনাসদস্যদের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং সেনানিবাসের বাইরে সাধারণ মানুষেরও একটি অংশ রাস্তায় নেমে আসে।

ক্ষমতার পালাবদল ও রাজনৈতিক পরিবর্তন

৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

তবে এই ঘটনাকে শুধু সিপাহি-জনতার ঐক্যের মধ্য দিয়ে সংঘটিত একটি অভ্যুত্থান হিসেবে দেখলে এর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস বোঝা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, জাসদ-সমর্থিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থানও জড়িত ছিল।

ইতিহাসের বিতর্ক ও মূল্যায়ন

৭ নভেম্বরকে বিএনপি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। দলটির দৃষ্টিতে, এ দিন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সিপাহি-জনতার ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে, বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি ও বিভিন্ন ইতিহাস বিশ্লেষকের কাছে দিনটি সামরিক অভ্যুত্থান, সৈনিক বিদ্রোহ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের একটি জটিল অধ্যায়।

এ দিনের ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনীর ভেতরে প্রাণহানি এবং পরবর্তী সময়ে সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ৭ নভেম্বরের মূল্যায়নে শুধু রাজনৈতিক বিজয় বা পরাজয়ের হিসাব নয়, প্রাণহানি, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

ইতিহাস থেকে শিক্ষা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সংঘটিত ১৯৭৫ সালের ঘটনাবলি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক বিভাজন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সামরিক হস্তক্ষেপ একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে কতটা বিপন্ন করতে পারে। ৭ নভেম্বর তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক দিবস নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ।

৫১ বছর পরও ৭ নভেম্বরের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা হলো—কোনো একটি রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, বরং তথ্য, দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ও নিরপেক্ষ গবেষণার ভিত্তিতে অতীতকে মূল্যায়ন করা। ইতিহাসের সত্য অনুসন্ধান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত এ দিনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।

 

 

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, ক্ষমতার পালাবদল ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

আপডেট সময় : ০৯:৫৭:৩৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

 

সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান, ক্ষমতার পালাবদল ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা

 

আজ ৭ নভেম্বর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ঘটনাবহুল দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। এর মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নতুন মোড় নেয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের প্রভাব ক্রমেই বাড়তে থাকে।

২০২৬ সালে ৭ নভেম্বরের ৫১ বছর পূর্ণ হলো। দিনটি বিএনপির কাছে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ দিনের ঘটনাবলি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ইতিহাসবিদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।

৭ নভেম্বরের পটভূমি

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা তৈরি হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একের পর এক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান বন্দি হন।

এরপর সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ ও উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ৭ নভেম্বর ভোরে সেনাসদস্যদের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং সেনানিবাসের বাইরে সাধারণ মানুষেরও একটি অংশ রাস্তায় নেমে আসে।

ক্ষমতার পালাবদল ও রাজনৈতিক পরিবর্তন

৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

তবে এই ঘটনাকে শুধু সিপাহি-জনতার ঐক্যের মধ্য দিয়ে সংঘটিত একটি অভ্যুত্থান হিসেবে দেখলে এর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস বোঝা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, জাসদ-সমর্থিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থানও জড়িত ছিল।

ইতিহাসের বিতর্ক ও মূল্যায়ন

৭ নভেম্বরকে বিএনপি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। দলটির দৃষ্টিতে, এ দিন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সিপাহি-জনতার ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে, বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি ও বিভিন্ন ইতিহাস বিশ্লেষকের কাছে দিনটি সামরিক অভ্যুত্থান, সৈনিক বিদ্রোহ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের একটি জটিল অধ্যায়।

এ দিনের ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনীর ভেতরে প্রাণহানি এবং পরবর্তী সময়ে সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ৭ নভেম্বরের মূল্যায়নে শুধু রাজনৈতিক বিজয় বা পরাজয়ের হিসাব নয়, প্রাণহানি, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

ইতিহাস থেকে শিক্ষা

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সংঘটিত ১৯৭৫ সালের ঘটনাবলি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক বিভাজন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও সামরিক হস্তক্ষেপ একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে কতটা বিপন্ন করতে পারে। ৭ নভেম্বর তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক দিবস নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ।

৫১ বছর পরও ৭ নভেম্বরের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষা হলো—কোনো একটি রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, বরং তথ্য, দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ও নিরপেক্ষ গবেষণার ভিত্তিতে অতীতকে মূল্যায়ন করা। ইতিহাসের সত্য অনুসন্ধান এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত এ দিনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।

 

 

Facebook Comments Box