ঢাকা ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ ব্যাংক

সৃষ্টি নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৮:১৬:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ৫১৩৫ বার পড়া হয়েছে

প্রতিকী ছবি

(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

 

ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ ব্যাংক

 

ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশেষে বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কাটিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে রূপান্তর সম্পন্ন করেছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ডেটা ব্যবস্থাপনা ও সাইবার নিরাপত্তায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

 

 

গত ১৪ বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মডিউল বিদেশভিত্তিক (ভারতীয়) একটি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। এতে সার্ভার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ডাটাবেজ ব্যবস্থাপনা, আপডেট ও রক্ষণাবেক্ষণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও সার্ভিস প্রোভাইডারের সরাসরি অ্যাকসেস ছিল।

 

 

      কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, দীর্ঘ প্রস্তুতি, দেশীয় বিশেষজ্ঞ তৈরির উদ্যোগ এবং নতুন সিস্টেমের নিরাপত্তা যাচাই শেষে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। এখন থেকে মুদ্রানীতি, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, আন্তব্যাংক লেনদেন, অ্যাকাউন্টিং ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুতিসহ সব কাজ নিজস্ব সার্ভারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

 

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, “নিজস্ব কোর সিস্টেমে স্থানান্তর শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, এটি দেশের আর্থিক খাতের সাইবার সার্বভৌমত্বের একটি বড় মাইলফলক। বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বা তৃতীয় পক্ষের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে।”

 

ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ ব্যাংক
ছবি: নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

আইটি বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন সফটওয়্যারটি উন্নত নিরাপত্তা প্রটোকল, মাল্টি-লেয়ার এনক্রিপশন এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা সমৃদ্ধ। একই সঙ্গে দেশীয় প্রযুক্তিবিদদের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ করায় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাতীয় অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে এটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। বিদেশি সফটওয়্যারের উপর নির্ভরতা কমায় সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি ও ডেটা নিরাপত্তা জটিলতা অনেকটাই কমবে।

 

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবস্থার ফলে ব্যাংকিং সেক্টরে স্বচ্ছতা, গতি এবং ডেটা সুরক্ষা আরও জোরদার হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলো।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘ ১৪ বছরের পর অবশেষে নিজস্ব কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারে ফিরছে। এর মাধ্যমে কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, দেশের আর্থিক সাইবার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের এক বড় দিক উন্মোচিত হচ্ছে।

 

 

২০০১ সালের পর এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার কোর সিস্টেমে বিদেশী সফটওয়্যারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। ২০১১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ভারতের টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (টিসিএস) বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০ তলা অফিসে স্থায়ীভাবে উপস্থিত ছিল। তাদের হাতে ছিল:

 

১.সার্ভার অপারেশন।
২.ডাটাবেজ অ্যাডমিন পোর্ট।
৩.এনক্রিপ্টেড ফাইল সিস্টেম।
৪.সিস্টেম পাসওয়ার্ড লেভেলের কনফিগারেশন।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংবেদনশীল তথ্য বিদেশী টেকনিশিয়নের হাতে থাকা বিষয়টি দীর্ঘদিন বিতর্কিত ছিল। একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ‘কত তথ্য বাহিরে গিয়েছে, তা কেউ জানে না।’ ২০১৬ সালের রিজার্ভ চুরির তদন্তেও টিসিএস সিস্টেমের নিরাপত্তা দুর্বলতার বিষয় উঠে আসে।

 

     কেন এতদিন পরিবর্তন হয়নি?

 

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা হয়েছিল নানা কারণে:

 

১.কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে লবিং করতেন।
২.প্রকল্প পরিবর্তন বিলম্বিত করতে ফাইল ট্র্যাপ ও সিদ্ধান্তগত বাধা তৈরি হতো।
৩.লাইসেন্স নবায়ন ও পরামর্শক নিয়োগে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পান।
৪.প্রযুক্তিগত স্যাবোটাজের অভিযোগও ওঠে।

 

যেখানে ব্যাংক ইতিমধ্যেই ২০ বছরের মধ্যে ১০০টির বেশি সফটওয়্যার নিজস্বভাবে তৈরি করেছে, সেখানে কোর সিস্টেমে স্বনির্ভর হতে ১৪ বছর লাগার ঘটনা আরও সন্দেহজনক হয়ে ওঠে।

     বিদেশী সফটওয়্যারের খরচ:

হাজার কোটি টাকার প্রভাব ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক টিসিএস-কে দিয়েছে এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা—সার্ভিস চার্জ, লাইসেন্স নবায়ন, পরামর্শক খরচ ও সাপোর্ট ফি মিলিয়ে। অভিযোগ উঠেছে, ‘এই খরচের বড় অংশই ছিল অদৃশ্য লুটপাটের জানালা।’

     কোর সফটওয়্যার পরিবর্তনের সাফল্য:

আইসিটি-১ বিভাগের তরুণ প্রযুক্তিবিদরা বছরের পর বছর ধীরে ধীরে নিজস্ব কোর সফটওয়্যার ‘বিসিবিআইসিএস’ তৈরি করছেন। ২০২৫ সালে প্রকল্পের সব মডিউল পাস, নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন, এবং সমান্তরাল রানের মাধ্যমে কার্যক্রম স্থিতিশীল হয়েছে। ৮ ডিসেম্বর সভায় নতুন সফটওয়্যারকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।

এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যারা পরিবর্তন আটকাতে চেয়েছিল, তারা এবার ব্যর্থ হয়েছেন।’

      নতুন সফটওয়্যার চালু হলে কী হবে?

১.ডাটা সার্বভৌমত্ব ফিরে আসবে: সংবেদনশীল তথ্য বিদেশী হাত থেকে মুক্ত।
২.খরচ কমবে: বিদেশী সাপোর্ট ও লাইসেন্স খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ কমবে।
৩.সাইবার ঝুঁকি শূন্যের কোঠায়: নিজস্ব কোড মানে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
৪.দ্রুত নীতি পরিবর্তন ও কাস্টমাইজেশন: আর ভারত থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
৫.নিরাপদ রিয়েল-টাইম সার্ভিলেন্স ও ফরেন রিজার্ভ ৬.অ্যাকাউন্টিং: ২০১৬ সালের মতো সাইবার ঘটনার ঝুঁকি কমবে।

    কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোর সিস্টেম স্বাধীন হওয়া মানে আর্থিক তথ্য, নীতিনির্ধারণ ও ডিজিটাল টাকার রোডম্যাপে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এক সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এটি দেশের আর্থিক স্বাধীনতার দ্বিতীয় ঘোষণা।’

 

‘স্বাধীনতা দিবস’ আসছে ১৮ ডিসেম্বর, পুরনো টিসিএস সফটওয়্যার বন্ধ হওয়ার সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নতুন প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করবে। ১৪ বছরের ভুল সিদ্ধান্ত, বিদেশী লবিং ও নিরাপত্তাজনিত অবহেলার দায় এখনও অমীমাংসিত থাকলেও, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশেষে নিজস্ব সক্ষমতায় দাঁড়াচ্ছে। ব্যাংক জানাচ্ছে, ‘আমরা আর কাউকে আমাদের ডাটা ভল্টের চাবি দেবো না।’

 

 

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ ব্যাংক

আপডেট সময় : ০৮:১৬:১৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫

 

 

ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ ব্যাংক

 

ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশেষে বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কাটিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে রূপান্তর সম্পন্ন করেছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ডেটা ব্যবস্থাপনা ও সাইবার নিরাপত্তায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

 

 

গত ১৪ বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মডিউল বিদেশভিত্তিক (ভারতীয়) একটি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল। এতে সার্ভার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ডাটাবেজ ব্যবস্থাপনা, আপডেট ও রক্ষণাবেক্ষণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও সার্ভিস প্রোভাইডারের সরাসরি অ্যাকসেস ছিল।

 

 

      কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, দীর্ঘ প্রস্তুতি, দেশীয় বিশেষজ্ঞ তৈরির উদ্যোগ এবং নতুন সিস্টেমের নিরাপত্তা যাচাই শেষে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। এখন থেকে মুদ্রানীতি, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, আন্তব্যাংক লেনদেন, অ্যাকাউন্টিং ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুতিসহ সব কাজ নিজস্ব সার্ভারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

 

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, “নিজস্ব কোর সিস্টেমে স্থানান্তর শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, এটি দেশের আর্থিক খাতের সাইবার সার্বভৌমত্বের একটি বড় মাইলফলক। বিদেশি নিয়ন্ত্রণ বা তৃতীয় পক্ষের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে।”

 

ভারতীয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ ব্যাংক
ছবি: নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

আইটি বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন সফটওয়্যারটি উন্নত নিরাপত্তা প্রটোকল, মাল্টি-লেয়ার এনক্রিপশন এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা সমৃদ্ধ। একই সঙ্গে দেশীয় প্রযুক্তিবিদদের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ করায় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাতীয় অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে এটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। বিদেশি সফটওয়্যারের উপর নির্ভরতা কমায় সম্ভাব্য সাইবার ঝুঁকি ও ডেটা নিরাপত্তা জটিলতা অনেকটাই কমবে।

 

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবস্থার ফলে ব্যাংকিং সেক্টরে স্বচ্ছতা, গতি এবং ডেটা সুরক্ষা আরও জোরদার হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলো।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘ ১৪ বছরের পর অবশেষে নিজস্ব কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারে ফিরছে। এর মাধ্যমে কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, দেশের আর্থিক সাইবার সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের এক বড় দিক উন্মোচিত হচ্ছে।

 

 

২০০১ সালের পর এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার কোর সিস্টেমে বিদেশী সফটওয়্যারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। ২০১১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ভারতের টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (টিসিএস) বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০ তলা অফিসে স্থায়ীভাবে উপস্থিত ছিল। তাদের হাতে ছিল:

 

১.সার্ভার অপারেশন।
২.ডাটাবেজ অ্যাডমিন পোর্ট।
৩.এনক্রিপ্টেড ফাইল সিস্টেম।
৪.সিস্টেম পাসওয়ার্ড লেভেলের কনফিগারেশন।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংবেদনশীল তথ্য বিদেশী টেকনিশিয়নের হাতে থাকা বিষয়টি দীর্ঘদিন বিতর্কিত ছিল। একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ‘কত তথ্য বাহিরে গিয়েছে, তা কেউ জানে না।’ ২০১৬ সালের রিজার্ভ চুরির তদন্তেও টিসিএস সিস্টেমের নিরাপত্তা দুর্বলতার বিষয় উঠে আসে।

 

     কেন এতদিন পরিবর্তন হয়নি?

 

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা হয়েছিল নানা কারণে:

 

১.কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে লবিং করতেন।
২.প্রকল্প পরিবর্তন বিলম্বিত করতে ফাইল ট্র্যাপ ও সিদ্ধান্তগত বাধা তৈরি হতো।
৩.লাইসেন্স নবায়ন ও পরামর্শক নিয়োগে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পান।
৪.প্রযুক্তিগত স্যাবোটাজের অভিযোগও ওঠে।

 

যেখানে ব্যাংক ইতিমধ্যেই ২০ বছরের মধ্যে ১০০টির বেশি সফটওয়্যার নিজস্বভাবে তৈরি করেছে, সেখানে কোর সিস্টেমে স্বনির্ভর হতে ১৪ বছর লাগার ঘটনা আরও সন্দেহজনক হয়ে ওঠে।

     বিদেশী সফটওয়্যারের খরচ:

হাজার কোটি টাকার প্রভাব ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক টিসিএস-কে দিয়েছে এক হাজার কোটিরও বেশি টাকা—সার্ভিস চার্জ, লাইসেন্স নবায়ন, পরামর্শক খরচ ও সাপোর্ট ফি মিলিয়ে। অভিযোগ উঠেছে, ‘এই খরচের বড় অংশই ছিল অদৃশ্য লুটপাটের জানালা।’

     কোর সফটওয়্যার পরিবর্তনের সাফল্য:

আইসিটি-১ বিভাগের তরুণ প্রযুক্তিবিদরা বছরের পর বছর ধীরে ধীরে নিজস্ব কোর সফটওয়্যার ‘বিসিবিআইসিএস’ তৈরি করছেন। ২০২৫ সালে প্রকল্পের সব মডিউল পাস, নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন, এবং সমান্তরাল রানের মাধ্যমে কার্যক্রম স্থিতিশীল হয়েছে। ৮ ডিসেম্বর সভায় নতুন সফটওয়্যারকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।

এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যারা পরিবর্তন আটকাতে চেয়েছিল, তারা এবার ব্যর্থ হয়েছেন।’

      নতুন সফটওয়্যার চালু হলে কী হবে?

১.ডাটা সার্বভৌমত্ব ফিরে আসবে: সংবেদনশীল তথ্য বিদেশী হাত থেকে মুক্ত।
২.খরচ কমবে: বিদেশী সাপোর্ট ও লাইসেন্স খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ কমবে।
৩.সাইবার ঝুঁকি শূন্যের কোঠায়: নিজস্ব কোড মানে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
৪.দ্রুত নীতি পরিবর্তন ও কাস্টমাইজেশন: আর ভারত থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
৫.নিরাপদ রিয়েল-টাইম সার্ভিলেন্স ও ফরেন রিজার্ভ ৬.অ্যাকাউন্টিং: ২০১৬ সালের মতো সাইবার ঘটনার ঝুঁকি কমবে।

    কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোর সিস্টেম স্বাধীন হওয়া মানে আর্থিক তথ্য, নীতিনির্ধারণ ও ডিজিটাল টাকার রোডম্যাপে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এক সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এটি দেশের আর্থিক স্বাধীনতার দ্বিতীয় ঘোষণা।’

 

‘স্বাধীনতা দিবস’ আসছে ১৮ ডিসেম্বর, পুরনো টিসিএস সফটওয়্যার বন্ধ হওয়ার সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নতুন প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করবে। ১৪ বছরের ভুল সিদ্ধান্ত, বিদেশী লবিং ও নিরাপত্তাজনিত অবহেলার দায় এখনও অমীমাংসিত থাকলেও, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশেষে নিজস্ব সক্ষমতায় দাঁড়াচ্ছে। ব্যাংক জানাচ্ছে, ‘আমরা আর কাউকে আমাদের ডাটা ভল্টের চাবি দেবো না।’

 

 

Facebook Comments Box