খুলনায় চুইঝালের শতকোটি টাকার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
- আপডেট সময় : ০৩:০৩:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
খুলনায় চুইঝালের শতকোটি টাকার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
খুলনার বড় বাজারের মসলাপট্টিতে ঢুকলেই নাকে আসে চুইঝালের স্বতন্ত্র ঝাঁজালো ঘ্রাণ। মরিচজাতীয় উদ্ভিদ না হলেও, পর্তুগিজদের আগে এই অঞ্চলের মানুষের রান্নায় ঝাল স্বাদের প্রধান উৎস ছিল এই চুই। কালের আবর্তে এটি বৃহত্তর খুলনা ও যশোর অঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লেও, বর্তমানে এটি এক সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
গরু, খাসি কিংবা হাঁসের মাংসে চুইঝালের ব্যবহার ভোজনরসিকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়, যা খুলনার বড় বাজারসংলগ্ন হোটেল জাবেদসহ বিভিন্ন রেস্তোরাঁর ভিড় দেখলেই বোঝা যায়। সেখানকার হোটেলগুলোতে প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই মণ চুই-মাংস বিক্রি হয়, যার জন্য ক্রেতাদের লম্বা লাইনেও দাঁড়াতে হয়। রান্নাঘরের এই স্বতন্ত্র মসলা আসলে মরিচজাতীয় কোনো উদ্ভিদ নয়, এটি পানের নিকটাত্মীয়।
পর্তুগিজদের হাত ধরে এ দেশে মরিচ আসার আগে উপমহাদেশের রান্নায় ঝাঁজ আনতে যেসব স্থানীয় মসলা ব্যবহৃত হতো, চুইঝাল তার অন্যতম। একসময় অবিভক্ত বাংলার রান্নায় এর ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও কালের বিবর্তনে তা কেবল বৃহত্তর খুলনা ও যশোর অঞ্চলের মানুষের বসতবাড়ির আঙিনায় টিকে ছিল।
পড়ুন>>সুপারি চাষ পদ্ধতি
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ ও ২০২২ সালে সম্পন্ন একাধিক গবেষণায় চুইয়ের নির্যাস থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, এতে শক্তিশালী জীবাণুনাশক, ব্যথানাশক, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ক্যানসার-কোষ প্রতিরোধী উপাদান রয়েছে। লোকজ চিকিৎসা পদ্ধতিতে কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস্ট্রিক, সর্দি-কাশি ও হজমের সমস্যা নিরসনে এটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাশাপাশি এটি ক্ষুধামান্দ্য দূর করতে এবং স্নায়বিক উত্তেজনা কমাতে বেশ কার্যকর।
চুইঝালের ব্যবসায়িক প্রসারের চিত্র খুলনার বড় বাজারে স্পষ্ট। সেখানে অন্তত ১৫টি দোকান রয়েছে যারা শুধু চুই বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করে। বড় বাজারের অন্যান্য মসলার দোকানেও এর দেখা মেলে। তথ্যমতে, প্রতিদিন এখান থেকে এক হাজার কেজির বেশি চুইঝাল বিক্রি হয়, যার মূল্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার কাছাকাছি।
পড়ুন>>নিজ হাতেই বানিয়ে ফেলুন ভেষজগুণ যুক্ত এগারোটি ভিন্ন স্বাদের চা
বিক্রেতা অমল বিশ্বাস জানান, তিন বছর আগেও কৃষকের কাছ থেকে যে চুই ৮০০ টাকা কেজিতে কেনা যেত, এখন তা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় সংগ্রহ করতে হচ্ছে। গুণভেদে ভালো মানের চুই ও শিকড় ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরেও বিক্রি হয়। তবে প্রবীণ ক্রেতা অবনীন্দ্রনাথ কুমার স্মৃতির পাতায় ফিরে জানান, আশির দশকে প্রতি কেজি চুইঝালের দাম ছিল মাত্র ২ টাকা। গত কয়েক দশকে চুইয়ের চাহিদা যেমন বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দামও।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চুইঝালের উৎপাদন ৬০০ টন ছাড়িয়ে গেছে। গত ছয় বছরে এর উৎপাদন প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা গড় বাজারমূল্য ধরলে বর্তমানে এই খাতের আকার ৭০ কোটি টাকার বেশি। স্থানীয়দের দাবি, সার্বিক হিসাব করলে এই বাজারের প্রকৃত আকার প্রায় শতকোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বাণিজ্যিক চাষের ক্ষেত্রে এখন কৃষকরা আম, কাঁঠাল বা মেহগনিগাছকে আশ্রয় করে সাথি ফসল হিসেবে চুই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। গত কয়েক বছরে স্থানীয় নার্সারিগুলোতে চারা বিক্রির পরিমাণ ২-৩ হাজার থেকে বেড়ে ৫০-৬০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। বৃহত্তর খুলনার সীমানা ছাড়িয়ে এখন কুড়িগ্রাম, ফরিদপুর ও ঝিনাইদহেও বাণিজ্যিকভাবে চুইয়ের চাষাবাদ বিস্তৃত হচ্ছে। গত ছয় বছরে এর উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।
আরো পড়ুন>>শুধু পাহাড়েই নয় সমতলেও হচ্ছে কফি চাষ
চুইঝালের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২৪ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় এটিকে ১৫১টি সম্ভাব্য জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা এই কৃষিপণ্যের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করেছে।
সূত্র: প্রথম আলো
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ

























