ঢাকা ০৮:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

অস্ট্রেলিয়ায় ক্ষমতার পালাবদলের আভাসে অভিবাসন ছাঁটাইয়ের কড়া পরিকল্পনা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৪৩:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

অস্ট্রেলিয়ায় আগামী ২০২৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হলে দেশটিতে বিদ্যমান অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক রদবদল আনার ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দল (কোয়ালিশন)। মঙ্গলবার বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর এই পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন, যা দেশটির ইতিহাসে অভিবাসন কমানোর সবচেয়ে বড় উদ্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে। বিরোধী জোটের লক্ষ্য হলো, আগামী চার বছরে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ অস্থায়ী ভিসাধারীর সংখ্যা কমিয়ে আনা।

প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রথম দুই বছরে নিট অভিবাসন কমিয়ে বছরে এক লাখে নামিয়ে আনা হবে। এরপর তৃতীয় বছরে ১ লাখ ৩০ হাজার এবং চতুর্থ বছরে এই সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে দেশটিতে নিট অভিবাসনের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১ হাজার। বর্তমান লেবার সরকারও অভিবাসন কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং তারা ২০২৮ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২ লাখ ২৫ হাজারে নামানোর ঘোষণা দিয়েছিল, তবে বিরোধী জোটের লক্ষ্যমাত্রা তার চেয়েও অনেক বেশি কঠোর। ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় নিট অভিবাসন (নতুন আসা মানুষের সংখ্যা থেকে দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাদ দিলে যা থাকে) ছিল ৩ লাখ ১ হাজার।

এই নতুন নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বিদেশি শিক্ষার্থী ও সদ্য স্নাতকদের ওপর। বর্তমানে দেশটিতে থাকা প্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার অস্থায়ী স্নাতক ভিসা (টেম্পোরারি গ্র্যাজুয়েট ভিসা) কমিয়ে মাত্র ১০ হাজারে নামিয়ে আনার কথা বলেছে বিরোধী জোট। পাশাপাশি নতুন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রেও বছরে ২ লাখ ৪০ হাজার জনের একটি সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবারকে অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তবে পিএইচডি গবেষক, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের শিক্ষার্থী এবং আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুটা ছাড় ও আলাদা ভিসা ব্যবস্থার সুযোগ রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা শিক্ষার্থীদের ওপর।

অস্থায়ী ভিসার আবেদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বা পরবর্তী আবেদনগুলো বাধ্যতামূলকভাবে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে করতে হবে। এছাড়া অপেক্ষমাণ আবেদনকারীদের ‘ব্রিজিং ভিসা’ এবং অস্থায়ী আশ্রয় ভিসাধারীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৯৫ হাজার কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মানবিক ভিসার সংখ্যাও অর্ধেক কমিয়ে ১০ হাজারে নামানো হবে। অন্যদিকে, দক্ষ কর্মীদের জন্য অস্থায়ী ভিসা এক লাখ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তাদের জন্য নতুন করে ‘পড়াশোনা-পরবর্তী সাময়িক ভিসা’ চালু হবে।

অ্যাঙ্গাস টেইলর অস্ট্রেলিয়াকে ‘হোটেল নয়, বাড়ি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে অভিবাসনের প্রতি দেশটির দায়বদ্ধতাকে বড় করে দেখার ওপর জোর দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসনবিরোধী দল ‘ওয়ান নেশন’-এর জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে পড়ার চাপ সামলাতেই বিরোধী জোট এমন কঠোর অবস্থানের দিকে ঝুঁকেছে। বিশ্লেষকদের মতে, টেইলর বোঝাতে চেয়েছেন—মানুষ এখানে কিছুদিন থেকে সুযোগ-সুবিধা ও অর্থ নিয়ে চলে যায়, কিন্তু দেশটির প্রতি তাদের কোনো দায় বা অঙ্গীকার থাকে না।

এদিকে এমন ঘোষণার পর প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিদেশি অভিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিম সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী জানান, মোটা অংকের টিউশন ফি দিয়ে পড়ার পর এখন কাজের সুযোগ ও স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হওয়ার উপক্রম। অনেকে একে ভোটের রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে আবাসন সংকট ও মূল্যস্ফীতির দায় অভিবাসীদের ওপর চাপানো হচ্ছে। এমন ঘোষণার পর সিডনিসহ অস্ট্রেলিয়াজুড়ে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিম সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করা এক শিক্ষার্থী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘বছরের পর বছর উচ্চ টিউশন ফি দিয়ে পড়েছি। স্থায়ী বসবাসের সুযোগ তো আগেই কমছে। এখন কাজের অভিজ্ঞতার ভিসাটুকুও গেলে পুরো বিনিয়োগ আর ক্যারিয়ার শেষ।’।

তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আবুল রিজভী এই লক্ষ্যমাত্রাকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, প্রশাসনিক জটিলতায় এই বিপুল সংখ্যক ভিসা বাতিল করা প্রায় অসম্ভব এবং এর ফলে জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। একই সুর শোনা গেছে বর্তমান সরকারের অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের কণ্ঠেও। তিনি এই ঘোষণাকে ‘হঠকারী’ হিসেবে অভিহিত করে জানিয়েছেন, এমন নীতি কার্যকর হলে উৎপাদন ও সেবা খাতে চরম কর্মিসংকট দেখা দেবে।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

অস্ট্রেলিয়ায় ক্ষমতার পালাবদলের আভাসে অভিবাসন ছাঁটাইয়ের কড়া পরিকল্পনা

আপডেট সময় : ০৬:৪৩:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

অস্ট্রেলিয়ায় আগামী ২০২৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হলে দেশটিতে বিদ্যমান অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক রদবদল আনার ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দল (কোয়ালিশন)। মঙ্গলবার বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর এই পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন, যা দেশটির ইতিহাসে অভিবাসন কমানোর সবচেয়ে বড় উদ্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে। বিরোধী জোটের লক্ষ্য হলো, আগামী চার বছরে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ অস্থায়ী ভিসাধারীর সংখ্যা কমিয়ে আনা।

প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রথম দুই বছরে নিট অভিবাসন কমিয়ে বছরে এক লাখে নামিয়ে আনা হবে। এরপর তৃতীয় বছরে ১ লাখ ৩০ হাজার এবং চতুর্থ বছরে এই সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে দেশটিতে নিট অভিবাসনের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১ হাজার। বর্তমান লেবার সরকারও অভিবাসন কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে এবং তারা ২০২৮ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২ লাখ ২৫ হাজারে নামানোর ঘোষণা দিয়েছিল, তবে বিরোধী জোটের লক্ষ্যমাত্রা তার চেয়েও অনেক বেশি কঠোর। ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় নিট অভিবাসন (নতুন আসা মানুষের সংখ্যা থেকে দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাদ দিলে যা থাকে) ছিল ৩ লাখ ১ হাজার।

এই নতুন নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বিদেশি শিক্ষার্থী ও সদ্য স্নাতকদের ওপর। বর্তমানে দেশটিতে থাকা প্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার অস্থায়ী স্নাতক ভিসা (টেম্পোরারি গ্র্যাজুয়েট ভিসা) কমিয়ে মাত্র ১০ হাজারে নামিয়ে আনার কথা বলেছে বিরোধী জোট। পাশাপাশি নতুন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রেও বছরে ২ লাখ ৪০ হাজার জনের একটি সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবারকে অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তবে পিএইচডি গবেষক, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের শিক্ষার্থী এবং আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুটা ছাড় ও আলাদা ভিসা ব্যবস্থার সুযোগ রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা শিক্ষার্থীদের ওপর।

অস্থায়ী ভিসার আবেদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বা পরবর্তী আবেদনগুলো বাধ্যতামূলকভাবে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে করতে হবে। এছাড়া অপেক্ষমাণ আবেদনকারীদের ‘ব্রিজিং ভিসা’ এবং অস্থায়ী আশ্রয় ভিসাধারীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৯৫ হাজার কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মানবিক ভিসার সংখ্যাও অর্ধেক কমিয়ে ১০ হাজারে নামানো হবে। অন্যদিকে, দক্ষ কর্মীদের জন্য অস্থায়ী ভিসা এক লাখ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তাদের জন্য নতুন করে ‘পড়াশোনা-পরবর্তী সাময়িক ভিসা’ চালু হবে।

অ্যাঙ্গাস টেইলর অস্ট্রেলিয়াকে ‘হোটেল নয়, বাড়ি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে অভিবাসনের প্রতি দেশটির দায়বদ্ধতাকে বড় করে দেখার ওপর জোর দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসনবিরোধী দল ‘ওয়ান নেশন’-এর জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে পড়ার চাপ সামলাতেই বিরোধী জোট এমন কঠোর অবস্থানের দিকে ঝুঁকেছে। বিশ্লেষকদের মতে, টেইলর বোঝাতে চেয়েছেন—মানুষ এখানে কিছুদিন থেকে সুযোগ-সুবিধা ও অর্থ নিয়ে চলে যায়, কিন্তু দেশটির প্রতি তাদের কোনো দায় বা অঙ্গীকার থাকে না।

এদিকে এমন ঘোষণার পর প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিদেশি অভিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিম সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী জানান, মোটা অংকের টিউশন ফি দিয়ে পড়ার পর এখন কাজের সুযোগ ও স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হওয়ার উপক্রম। অনেকে একে ভোটের রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে আবাসন সংকট ও মূল্যস্ফীতির দায় অভিবাসীদের ওপর চাপানো হচ্ছে। এমন ঘোষণার পর সিডনিসহ অস্ট্রেলিয়াজুড়ে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিম সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করা এক শিক্ষার্থী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘বছরের পর বছর উচ্চ টিউশন ফি দিয়ে পড়েছি। স্থায়ী বসবাসের সুযোগ তো আগেই কমছে। এখন কাজের অভিজ্ঞতার ভিসাটুকুও গেলে পুরো বিনিয়োগ আর ক্যারিয়ার শেষ।’।

তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আবুল রিজভী এই লক্ষ্যমাত্রাকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, প্রশাসনিক জটিলতায় এই বিপুল সংখ্যক ভিসা বাতিল করা প্রায় অসম্ভব এবং এর ফলে জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। একই সুর শোনা গেছে বর্তমান সরকারের অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্কের কণ্ঠেও। তিনি এই ঘোষণাকে ‘হঠকারী’ হিসেবে অভিহিত করে জানিয়েছেন, এমন নীতি কার্যকর হলে উৎপাদন ও সেবা খাতে চরম কর্মিসংকট দেখা দেবে।

Facebook Comments Box