ঢাকা ১১:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বাংলাদেশ-চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানিতে বড় নিয়োগ কৃষ্ণপুরের সেই ট্র্যাজেডি: ৫৫ বছরেও অমোচনীয় স্বজন হারানোর বেদনা চেলসির হয়ে বাজে শুরু, সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চাইলেন মার্তিনেজ ভারত-বাংলাদেশ ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা নিয়ে মুখ খুলল নয়াদিল্লি ট্রাম্পের তোপে সিএনএনসহ তিন সংবাদমাধ্যম, হোয়াইট হাউসে নিষেধাজ্ঞা রাজধানীতে সিরিজ ককটেল বিস্ফোরণ ও তিনটি বাসে অগ্নিসংযোগ রাজধানীর কাফরুল থানার সামনে বাসে আগুন ভারতে ৩৩ মাস কারাভোগের পর ভূরুঙ্গামারী সীমান্ত দিয়ে দেশে ফিরলেন ৩ জন নিজ নাবালিকা কন্যাকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত পিতা গ্রেফতার ফুলবাড়ী সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ভারতীয় মাদকদ্রব্য আটক

কৃষ্ণপুরের সেই ট্র্যাজেডি: ৫৫ বছরেও অমোচনীয় স্বজন হারানোর বেদনা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪১:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দিনটি ক্যালেন্ডারের পাতায় সাধারণ তারিখ মনে হলেও হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে এটি এক বিভীষিকাময় স্মৃতির নাম। ৫৫ বছর আগের সেই রক্তাক্ত সকাল আজও গ্রামবাসীর মনে গভীর শোক আর ভয়ের সঞ্চার করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকারের সহায়তায় অষ্টগ্রাম ক্যাম্প থেকে স্পিডবোটে এসে কৃষ্ণপুর গ্রামটিকে কার্যত মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছিল।

ভোরের আলো ফোটার আগেই হানাদাররা গদাইনগর, চন্ডিপুর, লালচান্দপুর, গকুলনগর, গঙ্গানগর ও সিতারামপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘিরে ফেলে। ঘর থেকে ঘুমন্ত মানুষকে টেনে বের করে এনে জড়ো করা হয় গদাইনগর, চন্ডিপুর এবং ননী গোপাল রায়ের বাড়ির পুকুরঘাটের পাকা চত্বরে। দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে সেখানে চালানো হয় নির্বিচার গুলিবর্ষণ। স্থানীয় তথ্যমতে, সেদিন অন্তত ১২৭ জন গ্রামবাসী প্রাণ হারান, যার মধ্যে ৪৭ জনের নাম পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

শহীদদের মধ্যে রয়েছেন কালী দাস রায়, ডা. ননী রায়, রাধিকা মোহন রায়, গোপী মোহন সূত্রধর, সুনীল শর্মা, মুকুন্দ সূত্রধর, যোগেন্দ্র সূত্রধর, মহেন্দ্র রায়, অনিল মাঝি, চন্দ্র কুমার রায়, জয় কুমার রায়, শান্ত রায়, কিশোর রায়, ননী চক্রবর্তী, সুনিল চক্রবর্তী, ব্রজেন্দ্র দাস, জগদীশ দাস ও ইশান দাস। তালিকায় আরও আছেন ধীরেন্দ্র রায়, হরিচরণ রায়, মদন রায়, দাশু শুক্লবৈদ্য, হরি দাশ রায়, শব লঞ্জন রায়, রামাচরণ রায়, ডা. অবিনাশ রায়, শৈলেস রায়, ক্ষিতিশ গোপ, নীতিশ গোপ, হীরা লাল গোপ, প্যারি দাস, সুভাষ সূত্রধর, প্রমোদ দাস, সুদর্শন দাস, গোপাল রায়, দীগেন্দ্র আচার্য্য, রেবতী রায়, শুকদেব দাস, দীনেশ বিশ্বাস, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, রস রাজ দাস, জয় গোবিন্দ্র দাস, বিশ্বনাথ দাস, মহাদেব দাশ, মহেশ দাস, শবরঞ্জন রায় ও মনোরঞ্জন বিশ্বাস।

সেই বীভৎস ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তৎকালীন সাত বছর বয়সী শিশু গোপেন চন্দ্র রায়। বাবার সামনেই অনেককে রশি দিয়ে বেঁধে গুলি করার সেই দৃশ্য আজও তার স্মৃতিতে জীবন্ত। ঘটনার ভয়াবহতা থেকে বেঁচে যান গদাইনগরের দীনবন্ধু ও পরিতোষ রায়ের মতো অনেকেই, তবে চন্ডিপুর পাড়া প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছিল সেদিনের তাণ্ডবে।

১১ বছর বয়সে বাবাকে হারানো বেনুপদ রায় সেই স্মৃতিচারণ করে বলেন, পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের দোসর রাজাকার-আলবদররা মিলে তার বাবা জয় কুমার রায় এবং চাচা চন্দ্র কুমার রায়সহ পরিবারের সাতজনকে হত্যা করে। মরদেহগুলো নদী ও হাওরের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বেনুপদ রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষত সময় পেরিয়ে গেলেও শুকায় না, বরং স্মৃতি হয়ে বুকের ভেতর আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম মর্তুজা বলেন, কৃষ্ণপুরের এই গণহত্যা ইতিহাসের এক কলঙ্কিত সাক্ষ্য, যা আজও শিহরণ জাগায়। বর্তমানে ননী গোপাল রায়ের বাড়ির দেয়াল এবং পাশের দুর্গা মন্দিরের দেয়ালে এখনো সেই বুলেটের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে আছে। এই চিহ্নগুলো কেবল দেয়ালের ক্ষত নয়, এগুলো একটি গ্রামের গভীর যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমানে কৃষ্ণপুরের এলাকাবাসী ও স্বজনহারা পরিবারগুলোর দাবি একটাই— এই ইতিহাসের সঠিক সংরক্ষণ করা হোক। গুলির দাগ চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে যেন এই নির্মমতার কথা জানানো হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর তাদের কাছে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের দিন নয়, এটি ১২৭টি প্রাণের স্মরণে শোকের দিন এবং একাত্তরের বর্বরতার এক জীবন্ত দলিলে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ ||। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফিরে আসে স্বজন হারানোর কান্না, আতঙ্কে পালিয়ে বেড়ানোর স্মৃতি আর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের দৃশ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আতঙ্কে কেউ ডোবার কচুরিপানার আড়ালে, কেউ ঘরের গোপন স্থানে, আবার কেউ ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে, সেদিন অনেকের ভাগ্যে বাঁচার সুযোগটুকুও জোটেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একসময় ব্রাশফায়ারের শব্দে কেঁপে ওঠে কৃষ্ণপুরের বাতাস। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়তে থাকেন নিরস্ত্র মানুষ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নির্মাণকাজ বা অবহেলায় যেন একাত্তরের এই সাক্ষ্যগুলো হারিয়ে না যায়।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

কৃষ্ণপুরের সেই ট্র্যাজেডি: ৫৫ বছরেও অমোচনীয় স্বজন হারানোর বেদনা

আপডেট সময় : ০৯:৪১:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দিনটি ক্যালেন্ডারের পাতায় সাধারণ তারিখ মনে হলেও হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে এটি এক বিভীষিকাময় স্মৃতির নাম। ৫৫ বছর আগের সেই রক্তাক্ত সকাল আজও গ্রামবাসীর মনে গভীর শোক আর ভয়ের সঞ্চার করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্থানীয় রাজাকারের সহায়তায় অষ্টগ্রাম ক্যাম্প থেকে স্পিডবোটে এসে কৃষ্ণপুর গ্রামটিকে কার্যত মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছিল।

ভোরের আলো ফোটার আগেই হানাদাররা গদাইনগর, চন্ডিপুর, লালচান্দপুর, গকুলনগর, গঙ্গানগর ও সিতারামপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘিরে ফেলে। ঘর থেকে ঘুমন্ত মানুষকে টেনে বের করে এনে জড়ো করা হয় গদাইনগর, চন্ডিপুর এবং ননী গোপাল রায়ের বাড়ির পুকুরঘাটের পাকা চত্বরে। দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে সেখানে চালানো হয় নির্বিচার গুলিবর্ষণ। স্থানীয় তথ্যমতে, সেদিন অন্তত ১২৭ জন গ্রামবাসী প্রাণ হারান, যার মধ্যে ৪৭ জনের নাম পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

শহীদদের মধ্যে রয়েছেন কালী দাস রায়, ডা. ননী রায়, রাধিকা মোহন রায়, গোপী মোহন সূত্রধর, সুনীল শর্মা, মুকুন্দ সূত্রধর, যোগেন্দ্র সূত্রধর, মহেন্দ্র রায়, অনিল মাঝি, চন্দ্র কুমার রায়, জয় কুমার রায়, শান্ত রায়, কিশোর রায়, ননী চক্রবর্তী, সুনিল চক্রবর্তী, ব্রজেন্দ্র দাস, জগদীশ দাস ও ইশান দাস। তালিকায় আরও আছেন ধীরেন্দ্র রায়, হরিচরণ রায়, মদন রায়, দাশু শুক্লবৈদ্য, হরি দাশ রায়, শব লঞ্জন রায়, রামাচরণ রায়, ডা. অবিনাশ রায়, শৈলেস রায়, ক্ষিতিশ গোপ, নীতিশ গোপ, হীরা লাল গোপ, প্যারি দাস, সুভাষ সূত্রধর, প্রমোদ দাস, সুদর্শন দাস, গোপাল রায়, দীগেন্দ্র আচার্য্য, রেবতী রায়, শুকদেব দাস, দীনেশ বিশ্বাস, মনোরঞ্জন বিশ্বাস, রস রাজ দাস, জয় গোবিন্দ্র দাস, বিশ্বনাথ দাস, মহাদেব দাশ, মহেশ দাস, শবরঞ্জন রায় ও মনোরঞ্জন বিশ্বাস।

সেই বীভৎস ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তৎকালীন সাত বছর বয়সী শিশু গোপেন চন্দ্র রায়। বাবার সামনেই অনেককে রশি দিয়ে বেঁধে গুলি করার সেই দৃশ্য আজও তার স্মৃতিতে জীবন্ত। ঘটনার ভয়াবহতা থেকে বেঁচে যান গদাইনগরের দীনবন্ধু ও পরিতোষ রায়ের মতো অনেকেই, তবে চন্ডিপুর পাড়া প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছিল সেদিনের তাণ্ডবে।

১১ বছর বয়সে বাবাকে হারানো বেনুপদ রায় সেই স্মৃতিচারণ করে বলেন, পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের দোসর রাজাকার-আলবদররা মিলে তার বাবা জয় কুমার রায় এবং চাচা চন্দ্র কুমার রায়সহ পরিবারের সাতজনকে হত্যা করে। মরদেহগুলো নদী ও হাওরের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বেনুপদ রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষত সময় পেরিয়ে গেলেও শুকায় না, বরং স্মৃতি হয়ে বুকের ভেতর আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী গোলাম মর্তুজা বলেন, কৃষ্ণপুরের এই গণহত্যা ইতিহাসের এক কলঙ্কিত সাক্ষ্য, যা আজও শিহরণ জাগায়। বর্তমানে ননী গোপাল রায়ের বাড়ির দেয়াল এবং পাশের দুর্গা মন্দিরের দেয়ালে এখনো সেই বুলেটের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে আছে। এই চিহ্নগুলো কেবল দেয়ালের ক্ষত নয়, এগুলো একটি গ্রামের গভীর যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমানে কৃষ্ণপুরের এলাকাবাসী ও স্বজনহারা পরিবারগুলোর দাবি একটাই— এই ইতিহাসের সঠিক সংরক্ষণ করা হোক। গুলির দাগ চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে যেন এই নির্মমতার কথা জানানো হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর তাদের কাছে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের দিন নয়, এটি ১২৭টি প্রাণের স্মরণে শোকের দিন এবং একাত্তরের বর্বরতার এক জীবন্ত দলিলে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ ||। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফিরে আসে স্বজন হারানোর কান্না, আতঙ্কে পালিয়ে বেড়ানোর স্মৃতি আর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের দৃশ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আতঙ্কে কেউ ডোবার কচুরিপানার আড়ালে, কেউ ঘরের গোপন স্থানে, আবার কেউ ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে, সেদিন অনেকের ভাগ্যে বাঁচার সুযোগটুকুও জোটেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একসময় ব্রাশফায়ারের শব্দে কেঁপে ওঠে কৃষ্ণপুরের বাতাস। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়তে থাকেন নিরস্ত্র মানুষ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নির্মাণকাজ বা অবহেলায় যেন একাত্তরের এই সাক্ষ্যগুলো হারিয়ে না যায়।

Facebook Comments Box