১৯৯৩ সালে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) মধ্যে স্বাক্ষরিত অসলো চুক্তিকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার কথা ছিল। সেই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৯৯৯ সালের মে মাসের মধ্যে জেরুজালেম, ফিলিস্তিনি শরণার্থী, ইসরাইলি বসতি এবং সীমান্ত নির্ধারণের মতো জটিল ও স্থায়ী মর্যাদার বিষয়গুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার কথা ছিল।
তবে তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। উল্টো বর্তমানে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি দখলদারিত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত, রক্তক্ষয়ী ও নির্মম হয়ে উঠেছে। চুক্তির মূল নথিতে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি এড়িয়ে গিয়ে ‘অন্তর্বর্তীকালীন স্বশাসন’ পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছে।
এই কাঠামোর অধীনেই ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ (পিএ) গঠিত হয়। শুরুতে একে স্বাধীনতার পথে একটি সেতু মনে করা হলেও, সময়ের ব্যবধানে এর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সমালোচকদের মতে, পিএ এখন ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর পরিবর্তে দখলদার বাহিনীর নিরাপত্তা কাঠামোর সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
স্থানীয় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ দমনে পিএর ভূমিকা এবং তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারী আটকের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০২১ সালের জুনে অধিকারকর্মী নিজার বানাতের মৃত্যু পিএর কর্তৃত্ববাদী আচরণের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়। রামাল্লাহভিত্তিক এই প্রশাসনের নেতৃত্বে রয়েছেন মাহমুদ আব্বাস।
অসলো চুক্তির প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান গাজার পরিস্থিতির মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। ১৯৯৪ সালের কায়রো চুক্তির মাধ্যমে গাজা ও জেরিকো ছিল পিএর নিয়ন্ত্রণে আসা প্রথম অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু আজ গাজা উপত্যকা দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি অবরোধের কারণে একটি খোলা আকাশের কারাগারে পরিণত হয়েছে। সেখানে চলমান ভয়াবহ পরিস্থিতির দায়ভার এবং দখলদার বাহিনীর লাগামহীন নৃশংসতা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বর্তমানে ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ ধারণাটি কেবল একটি কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশ্বশক্তিগুলো এই অলীক ধারণার দোহাই দিয়ে ইসরাইলকে পশ্চিম তীরের ভূমি দখল চূড়ান্ত করতে এবং গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার জন্য সময় করে দিয়েছে। যদিও নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, যুক্তরাজ্য ও স্লোভেনিয়ার মতো দেশগুলো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই কূটনৈতিক স্বীকৃতি বাস্তবে খুব একটা প্রভাব ফেলছে না।
অসলো চুক্তির পর থেকে ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের আগ্রাসন বহুগুণ বেড়েছে। ইসরাইলি মন্ত্রিসভার উগ্র-ডানপন্থি সদস্য ইতামার বেন-গভির এবং বেজালেল স্মোট্রিচ—যারা নিজেরাও অবৈধ বসতি স্থাপনকারী—তারা প্রকাশ্যে পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের সঙ্গে পুরোপুরি সংযুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। এই সহিংসতাকে তারা রাষ্ট্রীয় মদতে উৎসাহিত করছেন, যা শান্তি প্রক্রিয়ার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিয়েছে।
অসলো চুক্তি এখন আর কোনো বৈধ সংঘাত নিষ্পত্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে না। এটি আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা এড়াতে ইসরাইলকে সহায়তা করেছে এবং দখলদারিত্বকে একটি স্থায়ী পরিকাঠামোয় রূপ দিয়েছে। এখন সময় এসেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে এই পুরো কাঠামোটিকে সরাসরি পুনর্মূল্যায়ন ও আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্লিখন করার।
সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ১৯৯৩ সালের সেই অন্তঃসারশূন্য কাঠামোকে বর্জন করে বর্তমান বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিতে হবে। এটি এখন আর কোনো সাধারণ ভূমি-বিরোধ নয়, বরং একটি সুপ্রতিষ্ঠিত বর্ণবাদী দখলদারিত্ব। এই পরিস্থিতি কেবল অন্তর্বর্তীকালীন অলীক কল্পনার মাধ্যমে সংস্কার করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সরাসরি আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দখলদারিত্বের এই কাঠামোকে ভেঙে ফেলা।
Leave a Reply