হরিপুর সীমান্তে হয়নি মিলনমেলা অশ্রুজলে ফিরতে হলো দুই দেশের স্বজনদের
- আপডেট সময় : ১০:৩৫:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর ২০২২ ৩১৯ বার পড়া হয়েছে
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর সীমান্তে হয়নি মিলনমেলা অশ্রুজলে ফিরতে হলো দেশের স্বজনদের। জেলার হরিপুর উপজেলার মাকড়হাট ক্যাম্পের ৩৪৬ পিলার সংলগ্ন টেংরিয়া গোবিন্দপুর গ্রামের কুলিক নদীর পারে ঐতিহ্যবাহী পাথরকালি মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলা উপলক্ষে ভারত ও বাংলাদেশের লোকজন অপেক্ষায় থাকেন স্বজনদের এক পলক দেখার জন্য।
এই মেলায় যুগ যুগ ধরে দুই বাংলার হাজারো মানুষ স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হয়ে কুশল বিনিময় করে আসছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দুই দেশের মানুষকে আলাদা করে রেখেছে। কিন্তু দুটি ভিন্ন ভৌগোলিক সীমারেখা আলাদা করতে পারেনি মানুষের মনের টান। এ টানেই মানুষ ছুটে যায় কাঁটাতারের বেড়ার কাছে, সুযোগ পেলেই মিশে যায় একে অন্যের সঙ্গে। পেতে চায় মায়া-মমতা, স্বজনদের সান্নিধ্য।
এখানে কয়েক যুগ ধরেই পাথরকালি মেলার আয়োজন করছে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা। কালীপুজার পরে ওই এলাকায় বসে এই পাথরকালি মেলা। মেলাকে ঘিরে একদিনের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।সীমান্ত উন্মুক্ত থাকায় দুই বাংলার মানুষ আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে। তারা মেলায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনেন।
জানা গেছে, হরিপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকা পাকিস্তান-ভারত বিভক্তির আগে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অধীনে ছিলো। দেশ বিভক্তির কারণে আত্মীয় স্বজনেরা দুই দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সারা বছর তারা দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারেনা। তাই অপেক্ষায় থাকে কালীপুজার পরের শুক্রবার পাথরকালি মেলার জন্য। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় মুঠোফোনে চলছিলো আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ । এ মিলনমেলাতে দুই দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাড়াও শত শত মুসলমান দুই বাংলার আত্মীয়-স্বজন একে অপরকে একনজর দেখার জন্য ভারতীয় কাঁটাতারের বেড়ার দুই পাশে এবারও ভিড় জমান।
এ সময় সেখানে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার প্রত্যাশায় কাঁটাতারের এপার-ওপারে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। দেখা গেছে সকালে হাসিমুখে দেখা করতে এসে বিকালে বিদায় বেলায় কাঁদতে হয় তাদের, আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা হওয়ার পরেও এবং দেখা না হওয়ার জন্যেও।
শুক্রবার (২ ডিসেম্বর) সকালেই জমুরকালী (পাথর কালী) জিউ পূজা উপলক্ষে প্রতি বছরের মত এবারও পূজার আয়োজন করেছিল পূজা উদযাপন কমিটি।
তবে এবার আগেরমত পূঁজা উপলক্ষে দুই বাংলার সীমান্তে লাখো মানুষের সমাগমে তৈরি হয় মিলনমেলা। তবে কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁকে কথা বলা আর দেখা না করার আক্ষেপ অধরা রয়ে গেল একবছর ধরে অপেক্ষারত ওপারে থাকা তাদের আত্মীয়স্বজনদের সাথে।
এবার সীমান্তের কাঁটাতারের কাছে কোন মানুষজনকে ভীড় জমাতে দেয়নি ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী। হরিপুর উপজেলা প্রশাসনের সূত্রে জানা যায়, পাথরকালী জিউ পূজা উপলক্ষে প্রতিবছর এইদিনে গোবিন্দপুর কুলিক নদীরপাড়ে কাঁটাতারের কাছে দুই সীমান্তে ইংরেজি মাস ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শুক্রবার দিনে লাখো মানুষের সমাগমে ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ-ভারত মিলনমেলা হয়ে থাকে।
এবারও মিলনমেলা’র আয়োজন করা হলেও ভারতীয় প্রসাশনিক জটিলতার কারনে দেখা সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হয়নি। এতে কাঁটাতারের ওপারে থাকা আত্মীয়স্বজনরা মিলিত হতে পারনেনি।
আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা করার জন্য কাঁটা পাশে অপেক্ষায় ভারতীয়রা কিন্তু বাংলাদেশীদের কাঁটা তারের পাশে আসতে দেয়নি বিএসএফ। ফলে শত অপেক্ষায় কাছ থেকে দেখা মিলনোনা স্বজনদের।
দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলা থেকে আসা নাজমা বেগম বলেন, ভারতে ভাই-ভাবি বসবাস করেন। তাই তাদের সঙ্গে দেখা করতে এই কাঁটাতারের বেড়ার কাছে এসেছি। এখনো দেখা হয়নি, তারা এলে দেখা হবে।
করোনাভাইরাসের কারণে দুই বছর দেখা হয়নি। এবার কালীপূজার পরে পাথরকালি মেলায় কাঁটাতারের বেড়ার কাছে এসেছি তাদের সঙ্গে দেখা করতে। নীলফামারীর জলঢাকা থেকে ভারতে বসবাস করা ছেলেকে দেখতে এসেছিলেন বৃদ্ধা মধুবালা। তিনি কেঁদে কেঁদে জানালেন, টাকার অভাবে ভারতে যেতে পারি না, তাই খবর পেয়ে এলাম ছেলেকে দেখতে; না দেখেই ফিরে যাচ্ছি। প্রতি বছর যেন আমাদের মতো অভাবী মানুষদের জন্য সীমান্তে মিলনমেলার আয়োজন করা হয়।
লালমনিরহাট থেকে আসা শ্রী সুদর্শন বলেন, ভারতে আমার ভাগ্নি থাকেন। তাদের সঙ্গে দুই বছর পর দেখা করতে এসেছে। ভারতে নির্বাচনের অজুহাতে এবার দেখা করতে দেয়া হয়নি। প্রতি বছর যেন দেখা করার সুযোগ করে দেওয়া হয়।
রংপরের পীরগঞ্জ থেকে আসা বাকলী রাণী (৫৭), চন্দ চাঁদ রায় (৬০) আমল (৪৭) সহ বিভিন্ন এলাকার অনেকে বলেন, সকাল থেকে আমরা আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষায় আছি। দুপুর গড়িয়ে বেলা শেষের দিকে তারপরেও দেখা করতে পারছিনা। করোনা ভাইরাসের কারণে সব বন্ধ। আত্মীয়রা ওপারে অপেক্ষায় রয়েছে কাঁটাতারের কাছে আসতে পারছেনা। এবার পূজা সম্পন্ন করেই বাড়ি যাব। আগামী বছর দেখা করার অপেক্ষায় রইলাম ।
পূজা কমিটির সভাপতি মধুবাবু বলেন, গত দুই বছর করোনা ভাইরাসের কারণে মিলনমেলা করা সম্ভব হয়নি শুধু পূ্জা পালন করা হয়েছে। এবার মিলনমেলার আয়োজন করা হলেও স্বজনদের দেখা সাক্ষাত করা সম্ভব হয়নি।
এবিষয়ে ভাতুঁড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান সরকার জানান , করোনার কারণে গত দুই বছর ধরে মিলনমেলা হয়নি। দুই বাংলার এই সম্পর্ক যেন যুগ যুগ অটুট থাকে। সেজন্য প্রতিবছর এইদিনে এটি আয়োজন করা হয়।
হরিপুরের গোবিন্দপুর ও চাপাসার ক্যাম্পে কর্মরত সীমান্ত বাহিনীরা জানান, এবার মিলনমেলায় কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে দেখা করে কথা বলার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে ভারতীয় কতৃপক্ষ। কাঁটাতারের কাছে কোন বাংলাদেশীরা যেন না যায় সে বিষয়ে আমাদের অনুরোধ করেছেন তারা।
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ
























