শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও অস্থিরতায় উত্তপ্ত ফ্রান্স: সমাধান খুঁজছে সরকার
- আপডেট সময় : ০২:২৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
ফ্রান্সে বর্তমানে একটি প্রজন্ম নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, অথচ তাদের জন্য অপরিহার্য শিক্ষাব্যবস্থা এখন চরম অর্থসংকটের শিকার। ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফরাসি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সেই বিখ্যাত স্লোগান ছিল ‘কল্পনাকে ক্ষমতায় আনো’, যেখানে তারা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। প্রায় পাঁচ দশক পর আজকের বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। বর্তমান শিক্ষার্থীদের প্রধান উদ্বেগ হলো তাদের ভবিষ্যৎ। প্ল্যাকার্ডে তারা স্পষ্ট লিখেছে, ‘আমি চাই আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে কেবল গণিত পরীক্ষা নিয়ে ভাবতে।’ তারা নিজেদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের সামাজিক বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। বিক্ষোভে মানুষের ক্ষোভের গভীরতা স্পষ্ট হয়েছে।
চলমান এই বিক্ষোভে শিক্ষার্থী ছাড়াও বহু অভিভাবক ও শিক্ষক অংশ নিয়েছেন। দীর্ঘদিনের বাজেট ছাঁটাইয়ের ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর চাপ বেড়েছে এবং শিক্ষক-কর্মচারীর তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এছাড়া তীব্র তাপপ্রবাহের সময়েও স্কুলগুলোতে প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জটিল ও অস্বচ্ছ অ্যালগরিদমনির্ভর প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ—এমন সব চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে তারা সরকারের কঠোর ও দমনমূলক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছে। বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করায় সংঘাত অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশজুড়ে স্কুলে অচলাবস্থা তৈরি করা কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর অধিকাংশের লক্ষ্যও এখন তুলনামূলকভাবে সীমিত। মঙ্গলবারের বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। এ ছাড়া মে ও জুন মাসে ঘন ঘন তাপপ্রবাহের কারণে শ্রেণিকক্ষ অসহনীয় হয়ে উঠলেও তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও অর্থের অভাব রয়েছে। তাদের উদ্বেগের মুখে এমানুয়েল মাখোঁ সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কঠোর। বিক্ষোভকারীদের বেশিরভাগই অল্পবয়সী হওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তা বাহিনীকে স্কুলের ‘অবরোধ’ ভাঙতে হস্তক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়।
সংঘর্ষের এই ঘটনায় এ পর্যন্ত ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। এছাড়া ৭০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য এবং বেশ কয়েকজন শিক্ষকও আহত হয়েছেন। লঁস শহরে এক বিক্ষোভে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত বিস্ফোরণে উড়ে গেছে এবং অন্য একজন তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৪ হাজারের বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ককে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে বিদ্যালয়গুলোতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ফ্রান্সের ম্যাক্রোঁ সরকার বাজেট ঘাটতি কমাতে এবং বন্ডবাজারকে সন্তুষ্ট করতে একের পর এক ব্যয় সংকোচনমূলক বাজেট বাস্তবায়ন করেছে, যার প্রভাব পড়েছে সরাসরি শিক্ষা খাতে। দ্বিতীয় মেয়াদে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের পরও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু শিক্ষার্থীদের দাবি পর্যালোচনার কথা বললেও, গত মাসেই তিনি ৫৪ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যার মধ্যে স্কুল শিক্ষার বরাদ্দও ছিল। অথচ এই সংকটের সমাধান হিসেবে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল, যা সরকার দিচ্ছে না।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে মেরিন ল্য পেন বর্তমানে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ল্য পেন দাবি তুলেছেন যে, উগ্র বামপন্থীরা স্কুলের বিক্ষোভে ইন্ধন দিচ্ছে। তিনি দেশের ‘দাঙ্গাবিরোধী’ আইন আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছেন। পরিস্থিতি কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; সরকারি খাতের কর্মীরাও বেতন স্থগিতের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। প্রধান শ্রমিক ইউনিয়নগুলো নভেম্বর মাসে যৌথ আন্দোলনের পরিকল্পনা করায় আসছে শরৎজুড়ে ফ্রান্সে ব্যাপক অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফ্রান্সের সামাজিক কাঠামো আজ যখন চরম চাপে, তখন সরকারি নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর মনোযোগ দিয়ে শোনার প্রয়োজন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের দাবি ও উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে শোনা উচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের।
সূত্র: দৈনিক আমার দেশ
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ






















