বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগ কেন স্থবির?
- আপডেট সময় : ০২:২৪:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগ কেন স্থবির?
জুলাই সনদের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিচার বিভাগ সংস্কারের বিষয়ে প্রাথমিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলেও, বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান সুপারিশগুলো এখনো বাস্তবায়নের মুখ না দেখায় এই প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এই সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন বাড়ানো এবং আদালত বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থায় গতি আনা। জমি নিয়ে বিরোধ থেকে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর। দক্ষিণ আফ্রিকার ২ প্রধান শহরে বন্দুক হামলায় নিহত ২৭।
কমিশনের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা, বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন এবং উপজেলা পর্যায়ে আদালত প্রতিষ্ঠা করা। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাবও ছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বিশেষজ্ঞ আইনি প্যানেলের সদস্য ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল সংস্কারের ধীরগতি নয়, বরং অর্জিত সামান্য অগ্রগতি থেকেও পিছিয়ে আসারই ইঙ্গিত দেয়। মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনার পর শাহ আলী থানার ওসি প্রত্যাহার। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা, বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে বিভাগীয় শহরগুলোতে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ ও উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপন করা, আপিল বিভাগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিচারককে প্রধান বিচারপতি।
সংস্কার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে গত এপ্রিলে জাতীয় সংসদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করার সিদ্ধান্ত। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দুটি অধ্যাদেশ বাতিল করায় বিচার বিভাগ সংস্কারের মৌলিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিক জানান, অধস্তন আদালতে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ, বিচারক নিয়োগ পদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের মতো মূল সমস্যাগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিশ্লেষণ / হাসিনা ইস্যু ঢাকা ও নয়াদিল্লির ওপর ছেড়ে দিল ওয়াশিংটন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তামিম হোসেন শাওন জানান, বিচারক নিয়োগ পদ্ধতি, আপিল বিভাগের আকার নির্ধারণ, অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা সীমিত করার বিষয়গুলো কেবল সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই কার্যকর করা সম্ভব। তিনি অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেওয়া কিছু প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কারের প্রশংসা করেছেন। এর মধ্যে আইনি সহায়তা সংক্রান্ত উদ্যোগ এবং কমার্শিয়াল কোর্ট বা বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবগুলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল। এর মধ্যে রয়েছে—গ্রেপ্তার সংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষণ, পুলিশের পরিচয় নিশ্চিত করা, আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ ও চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া এবং অধিকতর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
তামিম হোসেন শাওনের মতে, ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটদের মিথ্যা মামলার ক্ষেত্রে জরিমানা করার ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের সুরক্ষার নিয়মগুলো কার্যকর রয়েছে। এই সংশোধনীগুলো মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়াতে সাহায্য করেছে। এদিকে, অধস্তন আদালতে বিচারকের সংখ্যা ছয় হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাজেট ও প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, সংস্কারের বড় প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই বড় পরিবর্তনের আশা ব্যক্ত করে তিনি জানান, আপাতত প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধনীগুলো ওই কমিটির আলোচনার অপেক্ষায় রয়েছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৩ জুলাই ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। তবে শুরু থেকেই বিরোধী দলগুলো এই কমিটিকে নীতিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করে এবং সংস্কারের দাবি নিয়ে ওয়াকআউট করে। শুরুতে কমিটি ১২ সদস্যের ছিল এবং বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছিল।
গত ৫ আগস্ট বিশেষ কমিটি তাদের প্রথম বৈঠক করে এবং ২০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বৈঠকে বিভিন্ন দলের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আমন্ত্রিত ২৬টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ১১টি দলই বৈঠকে অনুপস্থিত ছিল। বিএনপি ও অন্যান্য দলগুলোর দাবি ছিল, আগে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। ফলে সংস্কার প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটকে এতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়।
আইন মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, বিচার বিভাগীয় প্রশিক্ষণ জোরদার করতে একটি স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস এবং জাতীয় বিচার বিভাগীয় একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন। বিচার ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতে এসব পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার যেসব অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তা নতুন সরকার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই ও সংশোধনের কথা জানিয়েছিল, কিন্তু এখনো বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
কমিশন কর্তৃক চিহ্নিত সমস্যার মধ্যে বিচারকদের সম্পদের বিবরণী অনলাইনে প্রকাশ এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়গুলো ছয় মাসের মধ্যে স্বাক্ষর করে প্রকাশের মতো বিষয়গুলো প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমেই সম্ভব ছিল।
এছাড়া অপরাধ তদন্ত সংস্থা গঠন ও অ্যাটর্নি সার্ভিসের মতো মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো এখন সংসদীয় আলোচনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে কমিশন যেসব সুপারিশ দিয়েছিল, তার সিংহভাগই এখনো বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়নের গতি আশঙ্কাজনকভাবে ধীর হয়ে আছে।
রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব এবং সংসদীয় জটিলতার কারণে বিচার বিভাগ সংস্কারের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলো এখন একটি অনিশ্চিত চক্রে আটকে পড়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত না করলে শুধু আইনি কাঠামোর সংস্কার দিয়ে বিচার বিভাগের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ার অগ্রগতির দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো বিচার বিভাগীয় সংস্কার কর্মসূচি।
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ

























