২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতার সর্বোচ্চ শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
বুধবার (১২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করা হয়। বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত সাতজনের বিরুদ্ধেই অপরাধের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি এবং তাদের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগই রাষ্ট্রপক্ষ তথ্য-প্রমাণসহ উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে অনেক মানুষকে হত্যা ও আহত করার জন্য তারা সরাসরি দায়ী।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান নিয়ে বলা হয়, কোনো ধরনের অনুকম্পা না দেখিয়ে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেন এমন রাজনীতিবিদ দেশে আর জন্ম না নেন।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের ষষ্ঠ দিনে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ও চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম তাদের বক্তব্য শেষ করেন। এরপর পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম যুক্তিতর্ক শুরু করেন। ট্রাইব্যুনালে এ সময় প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, মঈনুল করিম ও তারেক আবদুল্লাহসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর উপস্থিত ছিলেন। গত ৪ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে টানা পাঁচ কার্যদিবসে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে আসামিরা সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে আন্দোলন প্রতিরোধে আহ্বান জানানো, বিভিন্ন গোপন বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা করা এবং সশস্ত্র হামলা ও কঠোর দমন-পীড়নে ভূমিকা রাখার অকাট্য প্রমাণ হিসেবে ওই সময়ের ফোনালাপ ও কল রেকর্ড দাখিল করা হয়েছে।
এছাড়া গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও আসামিদের সক্রিয় ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। আসামিদের এসব কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে বলে প্রসিকিউশন আদালতকে অবহিত করে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন—আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। বর্তমানে সাতজন আসামিই পলাতক রয়েছেন। তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এর আগে গত ২ আগস্ট এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৮ জন সাক্ষী তাদের জবানবন্দি প্রদান করেছেন। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল-২। এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচারিক কার্যক্রমের সূচনা করা হয়।
আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র ও সহিংসতা চালিয়েছে, তা নজিরবিহীন। রাষ্ট্রপক্ষ মনে করে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এই সর্বোচ্চ শাস্তি অপরিহার্য। ট্রাইব্যুনাল এখন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা করে পরবর্তী রায় ঘোষণার দিন ধার্য করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল দেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিচারিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে। এই মামলার রায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে আইনজ্ঞরা মনে করছেন। সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।
যু//d
Leave a Reply