ঢাকা ০৬:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

ক্যানসার জয় করে ফিরেও ব্যর্থ ম্যাডিনসন, নির্বাচকদের দুষছেন সবাই

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৩৮:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

৩৩ বছর বয়সে টেস্টিকুলার ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর দীর্ঘ লড়াই ও নয় সপ্তাহের কেমোথেরাপি শেষে মাঠের ক্রিকেটে ফিরেছিলেন নিক ম্যাডিনসন। ক্যানসার জয়ের পর দীর্ঘ ১৮ মাস প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলেও, রাজ্য দলের হয়ে সম্প্রতি দুর্দান্ত একটি সেঞ্চুরি করেন তিনি। এই পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই চোটে পড়া ক্যামেরন গ্রিনের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ডারবান টেস্টে অস্ট্রেলিয়া দলে ডাক পান তিনি। তবে দীর্ঘ ১০ বছর পর টেস্ট ক্রিকেটে ফেরার মঞ্চটা তার জন্য মোটেও সুখকর হয়নি। কিংসমিডে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওপেনিং করতে নেমে ৩৩ বল মোকাবিলা করেও রানের খাতা খুলতে পারেননি এই ব্যাটার। ধরুন, ৩৩ বছর বয়সে আপনার শরীরে টেস্টিকুলার ক্যানসার ধরা পড়ল। এসব শেষ করে অনুশীলনে ফিরলেন ছয় মাস পর। পরবর্তী ১৮ মাসে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে একটি ম্যাচও খেলার সুযোগ হলো না। কিন্তু আপনার রাজ্য দল আপনাকে অধিনায়ক বানিয়ে দিল। আপনিও রাজ্য দলের হয়ে সেঞ্চুরি করলেন গত সেপ্টেম্বরে। এরপর খবর এল, জাতীয় দলের দুজন খেলোয়াড় চোটে পড়েছেন। এই টেস্টে নামার আগে উল্লিখিত পটভূমিও তাঁর।

ম্যাডিনসনের এই ব্যর্থতা নিয়ে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে সমালোচনার ঝড়। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাচক জর্জ বেইলির এমন সিদ্ধান্তকে অনেকে ‘জুয়া’ হিসেবে দেখছেন। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া কি আসলে আশা করেছিল, দীর্ঘ বিরতি ও ভয়াবহ অসুস্থতার ধকল কাটিয়ে উঠা একজন ব্যাটার ফিরেই সেঞ্চুরি হাঁকাবেন? অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি গ্রেগ চ্যাপেল সিডনি মর্নিং হেরাল্ড-এ দেওয়া কলামে এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন। তার মতে, একটি শিপিং কোম্পানি যেমন পুরোনো জাহাজকে তীব্র শীতের সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয় না, নির্বাচকেরাও ঠিক সেই ঝুঁকির কাজটিই করেছেন ম্যাডিনসনকে দলে নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তো অস্ট্রেলিয়ার এক ক্রিকেট ভক্ত সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাচক জর্জ বেইলি কি ভেবেছেন, ম্যাডিনসন দীর্ঘ ১০ বছর পর টেস্টে ফিরে এবং তার আগে এমন ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েও প্রত্যাবর্তনেই সেঞ্চুরি মারবেন।

শূন্য রানে আউট হওয়ার এই অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডে ম্যাডিনসন এখন টেস্ট ইতিহাসের তৃতীয় ওপেনার। ১৯৯৫ সালে ডানেডিন টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩৯ বল খেলে শূন্য করেছিলেন ড্যারিন মারে এবং ২০০০ সালে কিংস্টনে ৩৬ বলে শূন্য করেছিলেন ট্রেভর গ্রিপার। ম্যাডিনসনের ক্যারিয়ারের চারটি টেস্টের পরিসংখ্যান বেশ অদ্ভুত। ২০১৬ সালের নভেম্বরে অ্যাডিলেডে নিজের অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসেও তিনি ১২ বলে শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন, আর সেই প্রতিপক্ষ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ৩৪ বছর ২৯ দিন বয়সী ম্যাডিনসনের এই ডারবান টেস্টের পর দলে টিকে থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমনটি হলে তার টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরু ও শেষ দুটিই হবে শূন্য দিয়ে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ডারবান টেস্টে ম্যাডিনসনকে শুরু থেকেই বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছিল। পঞ্চম স্টাম্পের বল তিনি টেনে এনে স্টাম্পে লাগান, যা তার জড়তা ও চাপের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে মার্কো ইয়ানসেন, আনরিখ নরকিয়া ও উইয়ান মুল্ডারদের মতো শক্তিশালী পেস আক্রমণের সামনে দীর্ঘ সময় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকে দূরে থাকা একজন ব্যাটারকে এভাবে ওপেনিংয়ে নামানো ছিল বড় ধরনের ঝুঁকি। অথচ নিয়মিত খেলার মধ্যে থাকলে তার ব্যাটিং অর্ডারে নমনীয়তা আনার যে যুক্তি নির্বাচকেরা দিয়েছিলেন, তা মাঠে প্রতিফলিত হয়নি।

ম্যাডিনসনের এই দলে ফেরা নিয়েও রয়েছে এক অদ্ভুত তথ্য। ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর মেলবোর্নে পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্ট খেলার পর থেকে ডারবান টেস্টের আগপর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া মোট ৯০টি টেস্ট খেলেছে। কোনো অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারের দুই টেস্টের মাঝে এত বেশি ম্যাচ মিস করার রেকর্ড এটিই প্রথম। এর আগের রেকর্ডটি ছিল টিম পেইন ও ব্র্যাড হগের (৮০ টেস্ট)। অনেকে মনে করেন, নির্বাচকদের পছন্দের তালিকায় ম্যাডিনসনের চেয়ে কুপার কনোলি হয়তো ভালো বিকল্প হতে পারতেন।

একসময় শেফিল্ড শিল্ডে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ম্যাডিনসন ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ৫২.৩৭ গড়ে রান করেছিলেন। সেই সময় অন্তত ২০ ইনিংস খেলা ক্রিকেটারদের মধ্যে শুধু ক্যামেরন গ্রিনের গড়ই ছিল তার চেয়ে বেশি। কিন্তু ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার আগে ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১১ ইনিংসে মাত্র একটি ফিফটি করেছিলেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতা বজায় না থাকা সত্ত্বেও তাকে সরাসরি টেস্টে সুযোগ দেওয়াটা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এই শূন্যের দায় আসলে কার—ম্যাডিনসনের, নির্বাচকদের নাকি সামগ্রিক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট প্রক্রিয়ার? এই উত্তর এখন ক্রিকেট মহলে বড় এক রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ক্যানসার জয় করে ফিরেও ব্যর্থ ম্যাডিনসন, নির্বাচকদের দুষছেন সবাই

আপডেট সময় : ০৫:৩৮:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

৩৩ বছর বয়সে টেস্টিকুলার ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর দীর্ঘ লড়াই ও নয় সপ্তাহের কেমোথেরাপি শেষে মাঠের ক্রিকেটে ফিরেছিলেন নিক ম্যাডিনসন। ক্যানসার জয়ের পর দীর্ঘ ১৮ মাস প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলেও, রাজ্য দলের হয়ে সম্প্রতি দুর্দান্ত একটি সেঞ্চুরি করেন তিনি। এই পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই চোটে পড়া ক্যামেরন গ্রিনের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ডারবান টেস্টে অস্ট্রেলিয়া দলে ডাক পান তিনি। তবে দীর্ঘ ১০ বছর পর টেস্ট ক্রিকেটে ফেরার মঞ্চটা তার জন্য মোটেও সুখকর হয়নি। কিংসমিডে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওপেনিং করতে নেমে ৩৩ বল মোকাবিলা করেও রানের খাতা খুলতে পারেননি এই ব্যাটার। ধরুন, ৩৩ বছর বয়সে আপনার শরীরে টেস্টিকুলার ক্যানসার ধরা পড়ল। এসব শেষ করে অনুশীলনে ফিরলেন ছয় মাস পর। পরবর্তী ১৮ মাসে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে একটি ম্যাচও খেলার সুযোগ হলো না। কিন্তু আপনার রাজ্য দল আপনাকে অধিনায়ক বানিয়ে দিল। আপনিও রাজ্য দলের হয়ে সেঞ্চুরি করলেন গত সেপ্টেম্বরে। এরপর খবর এল, জাতীয় দলের দুজন খেলোয়াড় চোটে পড়েছেন। এই টেস্টে নামার আগে উল্লিখিত পটভূমিও তাঁর।

ম্যাডিনসনের এই ব্যর্থতা নিয়ে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে সমালোচনার ঝড়। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাচক জর্জ বেইলির এমন সিদ্ধান্তকে অনেকে ‘জুয়া’ হিসেবে দেখছেন। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া কি আসলে আশা করেছিল, দীর্ঘ বিরতি ও ভয়াবহ অসুস্থতার ধকল কাটিয়ে উঠা একজন ব্যাটার ফিরেই সেঞ্চুরি হাঁকাবেন? অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি গ্রেগ চ্যাপেল সিডনি মর্নিং হেরাল্ড-এ দেওয়া কলামে এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন। তার মতে, একটি শিপিং কোম্পানি যেমন পুরোনো জাহাজকে তীব্র শীতের সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয় না, নির্বাচকেরাও ঠিক সেই ঝুঁকির কাজটিই করেছেন ম্যাডিনসনকে দলে নিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তো অস্ট্রেলিয়ার এক ক্রিকেট ভক্ত সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাচক জর্জ বেইলি কি ভেবেছেন, ম্যাডিনসন দীর্ঘ ১০ বছর পর টেস্টে ফিরে এবং তার আগে এমন ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েও প্রত্যাবর্তনেই সেঞ্চুরি মারবেন।

শূন্য রানে আউট হওয়ার এই অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডে ম্যাডিনসন এখন টেস্ট ইতিহাসের তৃতীয় ওপেনার। ১৯৯৫ সালে ডানেডিন টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩৯ বল খেলে শূন্য করেছিলেন ড্যারিন মারে এবং ২০০০ সালে কিংস্টনে ৩৬ বলে শূন্য করেছিলেন ট্রেভর গ্রিপার। ম্যাডিনসনের ক্যারিয়ারের চারটি টেস্টের পরিসংখ্যান বেশ অদ্ভুত। ২০১৬ সালের নভেম্বরে অ্যাডিলেডে নিজের অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসেও তিনি ১২ বলে শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন, আর সেই প্রতিপক্ষ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ৩৪ বছর ২৯ দিন বয়সী ম্যাডিনসনের এই ডারবান টেস্টের পর দলে টিকে থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমনটি হলে তার টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরু ও শেষ দুটিই হবে শূন্য দিয়ে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ডারবান টেস্টে ম্যাডিনসনকে শুরু থেকেই বেশ নার্ভাস দেখাচ্ছিল। পঞ্চম স্টাম্পের বল তিনি টেনে এনে স্টাম্পে লাগান, যা তার জড়তা ও চাপের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে মার্কো ইয়ানসেন, আনরিখ নরকিয়া ও উইয়ান মুল্ডারদের মতো শক্তিশালী পেস আক্রমণের সামনে দীর্ঘ সময় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকে দূরে থাকা একজন ব্যাটারকে এভাবে ওপেনিংয়ে নামানো ছিল বড় ধরনের ঝুঁকি। অথচ নিয়মিত খেলার মধ্যে থাকলে তার ব্যাটিং অর্ডারে নমনীয়তা আনার যে যুক্তি নির্বাচকেরা দিয়েছিলেন, তা মাঠে প্রতিফলিত হয়নি।

ম্যাডিনসনের এই দলে ফেরা নিয়েও রয়েছে এক অদ্ভুত তথ্য। ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর মেলবোর্নে পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্ট খেলার পর থেকে ডারবান টেস্টের আগপর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া মোট ৯০টি টেস্ট খেলেছে। কোনো অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারের দুই টেস্টের মাঝে এত বেশি ম্যাচ মিস করার রেকর্ড এটিই প্রথম। এর আগের রেকর্ডটি ছিল টিম পেইন ও ব্র্যাড হগের (৮০ টেস্ট)। অনেকে মনে করেন, নির্বাচকদের পছন্দের তালিকায় ম্যাডিনসনের চেয়ে কুপার কনোলি হয়তো ভালো বিকল্প হতে পারতেন।

একসময় শেফিল্ড শিল্ডে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ম্যাডিনসন ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ৫২.৩৭ গড়ে রান করেছিলেন। সেই সময় অন্তত ২০ ইনিংস খেলা ক্রিকেটারদের মধ্যে শুধু ক্যামেরন গ্রিনের গড়ই ছিল তার চেয়ে বেশি। কিন্তু ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার আগে ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১১ ইনিংসে মাত্র একটি ফিফটি করেছিলেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতা বজায় না থাকা সত্ত্বেও তাকে সরাসরি টেস্টে সুযোগ দেওয়াটা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এই শূন্যের দায় আসলে কার—ম্যাডিনসনের, নির্বাচকদের নাকি সামগ্রিক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট প্রক্রিয়ার? এই উত্তর এখন ক্রিকেট মহলে বড় এক রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Facebook Comments Box