ঢাকা ০৪:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
দিনাজপুরের বিরামপুরে পানিতে ডুবে দুই শিশুর প্রাণহানি পদক্ষেপ মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে ২০০ জনের নিয়োগ কাতারে স্বল্প আয়ের পরিবারের সহায়তায় রফিক ও কাতার চ্যারিটির শ্রীলঙ্কাকে উড়িয়ে এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের ফাইনালে ভারত ভূরুঙ্গামারীতে পিপিআর রোগের বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে: প্রধানমন্ত্রী যৌথ অভিযানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিরসরাইয়ে গৃহায়নের দুই আবাসন প্রকল্পে স্থবিরতা ও অনিয়মের বেড়াজাল ভালো নাম ও ডাকনামের নানামুখী রসায়ন

ইসলামে ধর্ষণের বিচার পেতে চারজন চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষী লাগেনা

মুনীম সিদ্দিকী
  • আপডেট সময় : ১১:৫০:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬ ৩৩০৪৩ বার পড়া হয়েছে

ইসলামে ধর্ষণের বিচার পেতে চারজন চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষী লাগেনা

(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

 

ইসলামে ধর্ষণের বিচার পেতে চারজন চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষী লাগেনা

 

ইসলামে ধর্ষণের বিচার পেতে হলে ধর্ষিতাকে চারজন চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষী লাগে- দাবিটি কেবল অজ্ঞতাই নয়, বরং চরম ধূর্ততা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন ইসলামবিদ্বেষী প্ল্যাটফর্মে ইসলামি আইন (শরিয়ত) নিয়ে একটি জঘন্য অপপ্রচার চালানো হয়। তাদের দাবি “ইসলামে ধর্ষণের বিচার পেতে হলে ধর্ষিতাকে চারজন চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষী হাজির করতে হবে। তা না পারলে উল্টো ভুক্তভোগী নারীকেই ‘মিথ্যা অপবাদের’ দায়ে ৮০টি চাবুক মারা হবে! আর পুরুষরা বেঁচে গেলেও নারীরা গর্ভবতী হওয়ার কারণে ফেঁসে যেতেন।”

 

 

 

​এই দাবিটি কেবল অজ্ঞতাই নয়, বরং চরম ধূর্ততা এবং ইসলামি ফেকাহ শাস্ত্রের মূলনীতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করার এক নিকৃষ্ট প্রচেষ্টা। আসুন, নিখাদ একাডেমিক ও আইনি দলিলসহ এই প্রোপাগান্ডার ব্যবচ্ছেদ করি।

​

       ১. প্রথম মিথ্যা:

“ধর্ষণের প্রমাণে ৪ জন সাক্ষী লাগে” বাস্তবতা: ইসলামি আইনে ‘যিনা’ বা পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যভিচার এবং ‘ধর্ষণ’ বা জবরদস্তিমূলক যৌন নির্যাতন—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অপরাধ।

 

 

​যিনা (ব্যভিচার): এটি দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিতে গোপন পাপাচার। ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে। কিন্তু কেউ যদি সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে জনসমক্ষে এই নোংরামি ছড়াতে চায়, কেবল তখনই ৪ জন প্রত্যক্ষদর্শীর শর্ত দেওয়া হয়েছে। মূলত, সমাজে যেন কেউ কারও চরিত্র হনন করতে না পারে, সেজন্যই এই কঠিন সুরক্ষাকবচ।

​

 

          ধর্ষণ : ধর্ষণ কোনো গোপন পাপ বা পারস্পরিক সম্মতি নয়। এটি একটি সহিংস ফৌজদারি অপরাধ। ইসলামি আইনের পরিভাষায় একে ‘হিরাবাহ’ (সন্ত্রাস, ডাকাতি বা সশস্ত্র আক্রমণ) অথবা ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ (পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি) হিসেবে গণ্য করা হয়।

 

 

 

​       আইনি মূলনীতি:

শরিয়া ফৌজদারি আইনে ‘হিরাবাহ’ বা সাধারণ কোনো সহিংস অপরাধ প্রমাণের জন্য কখনোই ৪ জন সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না। অন্য যেকোনো সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের মতো পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিক আলামত এবং ন্যায়সংগত প্রমাণের ভিত্তিতেই ধর্ষণের বিচার হয়।

 

 

 

​        ২. দ্বিতীয় মিথ্যা:

“সাক্ষী না থাকলে ধর্ষিতাকেই ৮০ চাবুক মারা হবে (কাযফ)”। ইসলামবিদ্বেষীদের সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হলো তারা সূরা আন-নূরের ৪ নম্বর আয়াতকে (যা ‘কাযফ’ বা মিথ্যা অপবাদের শাস্তি সংক্রান্ত) ধর্ষণের শিকার নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়।

 

 

সূরা আন-নূর (২৪:৪)-এ বলা হয়েছে, যারা সতী-সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে (ব্যভিচারের) অপবাদ দেয় এবং চারজন সাক্ষী আনে না, তাদের ৮০টি বেত্রাঘাত করো।

​

 

 

       ফিকাহ শাস্ত্রের বাস্তবতা: এই আইনটি তৈরিই হয়েছে নারীর সুরক্ষার জন্য, যাতে কোনো পুরুষ কোনো নারীর চরিত্র নিয়ে মিথ্যা কুৎসা রটাতে না পারে। ধর্ষণের শিকার কোনো নারী যখন বিচার চাইতে আদালতে আসেন, তিনি কারো বিরুদ্ধে অপবাদ দিতে আসেন না, বরং তিনি নিজে একটি অপরাধের ভুক্তভোগী হিসেবে আসেন।

​

​      মহান ইমামগণ স্পষ্ট করে গেছেন যে, ধর্ষণের শিকার নারী সাক্ষী আনতে না পারলে তার ওপর কোনো শাস্তি (কাযফ) আসবে না।

​

 

       ইমাম মালিক (র.)-এর ফতোয়া: মালিকি মাজহাবের বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ ‘আল-মুদাওয়ানাহ’ -এ স্পষ্ট বলা হয়েছে: যদি কোনো নারী ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায়, ক্রন্দনরত অবস্থায় বা রক্তাক্ত শরীরে মানুষের সামনে এসে চিৎকার করে বলে যে অমুক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করেছে, তবে তার এই রক্তাক্ত ও বিপর্যস্ত পরিস্থিতিই প্রমাণ করে যে সে সত্য বলছে। এ ক্ষেত্রে তার ওপর কোনো ‘কাযফ’ বা অপবাদের শাস্তি হবে না, বরং পুরুষটির বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার হবে।

 

 

 

​       ইমাম ইবনে কুদামাহ (র.)-এর রায়: হাম্বলি মাজহাবের প্রধান রেফারেন্স গ্রন্থ ‘আল-মুগনি’ ( Vol. 9, p. 57)-এ বলা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার নারী যদি ধর্ষকের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করে এবং তা প্রমাণ করতে অসমর্থও হয়, তবুও তার ওপর কোনো শাস্তি আরোপ করা যাবে না। কারণ সে নির্যাতিতা।

​        ৩. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আমল: একক সাক্ষ্যেই ধর্ষণের বিচার

​

 

 

আল্লাহর রাসূল (সা.) স্বয়ং চারজন সাক্ষীর শর্ত ছাড়া কেবল পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে ধর্ষকের শাস্তি কার্যকর করেছিলেন।

​হাদীসের রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং: ৪৩৭৯) এবং জামে আত-তিরমিযী (হাদীস নং: ১৪৫৪)।

 

 

 

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এক মহিলা ভোরে মসজিদে নামাজে আসার সময় এক ব্যক্তি দ্বারা ধর্ষিত হন। মহিলাটির চিৎকার শুনে লোকজন ছুটে আসে এবং পরবর্তীতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধরে আনা হয়। আল্লাহর রাসূল (সা.) ওই মহিলার একক বয়ান এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতার ওপর ভিত্তি করে অপরাধীকে পাথর নিক্ষেপ (রজম) বা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। তিনি মহিলার কাছে ৪ জন সাক্ষী চাননি।

 

 

 

​       আজকের যুগে যারা বলে ইসলামে ৪ জন সাক্ষী ছাড়া ধর্ষণের বিচার হয় না, তারা কি আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর এই সুন্নাহ ও বিচারকে অস্বীকার করতে চায়?

​       ৪. আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞান ও শরিয়তের ‘কারাইন’ (Circumstantial Evidence)

​

 

এই শরিয়া বিচারব্যবস্থা জড় বা স্থবির নয়। ইসলামি আইনে বিচার প্রমাণের জন্য অন্যতম একটি বড় হাতিয়ার হলো ‘কারাইন’ বা পারিপার্শ্বিক ও বৈজ্ঞানিক আলামত।

​

 

 

শরিয়া আইনের অন্যতম মূলনীতি হলো: “নিশ্চয়ই শরিয়ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য।” (ইমাম ইবনুল কায়্যিম, আল-তুরুক আল-হুকমিয়্যাহ)।

​

 

মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ ফিকহ বোর্ড যেমন— ওআইসি-র ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমি’ এবং মিসরের ‘দারুল ইফতা’ স্পষ্ট ফতোয়া দিয়েছে যে, বর্তমান যুগে ডিএনএ টেস্ট , মেডিকেল ফরেনসিক রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল আলামত ও আঙুলের ছাপ ইসলামি আদালতে চূড়ান্ত এবং অকাট্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ (কারাইন ক্বাতইইয়াহ) হিসেবে গণ্য হবে। এর জন্য কোনো মানুষের চাক্ষুষ সাক্ষ্যের প্রয়োজন নেই।

 

 

 

​        ৫. তৃতীয় মিথ্যা: “নারীরা গর্ভবতী হওয়ার কারণে ফেঁসে যেতো, পুরুষরা বেঁচে যেতো”

​এটি আরেকটি চরম মিথ্যাচার। ইসলামবিদ্বেষীরা দাবি করে, প্রাচীনকালে ধর্ষণের ফলে কোনো নারী গর্ভবতী হলে তাকে ব্যভিচারের অপরাধে শাস্তি দেওয়া হতো।

​

 

 

 

       শরিয়তের অকাট্য নীতি: ইসলামে বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তির শিকার ব্যক্তির কোনো পাপ বা আইনি শাস্তি নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলবশত করা অপরাধ, ভুলে যাওয়া বিষয় এবং যার ওপর তাকে বাধ্য করা হয়েছে (ধর্ষণ বা জবরদস্তি), তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২০৪৩)।

 

 

​      গর্ভবতী নারীর শাস্তি মওকুফ: ইসলামি আইনের একটি বিখ্যাত মূলনীতি হলো— “সন্দেহের দ্বারা ‘হদ’ বা শাস্তি বাতিল হয়ে যায়” । কোনো নারী গর্ভবতী হওয়া মানেই সে ব্যভিচার করেছে-এটি শতভাগ নিশ্চিত নয়, কারণ এখানে ধর্ষণের (জবরদস্তির) প্রবল সম্ভাবনা বা ‘সন্দেহ’ বিদ্যমান।

​খলিফা ওমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক রায়:

​        আমিরুল মুমিনীন হযরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে একজন অবিবাহিত গর্ভবতী নারীকে বিচারালয়ে আনা হয়। ওমর (রা.) তাকে শাস্তি দেওয়ার উদ্যেগ নিলে হযরত আলী (রা.) বা মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) তাকে বাধা দিয়ে বলেন, “হে আমিরুল মুমিনীন! আপনি নারীর জঠরে থাকা সন্তানের ওপর জুলুম করতে পারেন না। আর এই নারী ধর্ষণের শিকারও হতে পারে।”

 

 

 

​        তখন নারীটিকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে জানায়, সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকা অবস্থায় এক ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছিল। এই কথা শুনে হযরত ওমর (রা.) তৎক্ষণাৎ তার শাস্তি মওকুফ করেন এবং ইসলামের ইতিহাসে এই ঐতিহাসিক বাক্যটি বলেন: “যদি আলী না থাকত, তবে ওমর ধ্বংস হয়ে যেত।” (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৪০৭; কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবাইদ)।

​৬. সাক্ষীর অভাবে কি ধর্ষক পার পেয়ে যাবে? ‘তা’যীর’ আইনের চাবুক

​ইসলামবিদ্বেষীরা সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয় এই বলে যে, যদি কোনো কারণে সর্বোচ্চ শাস্তি (হদ)-এর টেকনিক্যাল প্রমাণ না মেলে, তবে বুঝি ধর্ষক খালাস পেয়ে যায়। এটি কত বড় মূর্খতা!

 

 

​        ইসলামি দণ্ডবিধিতে শাস্তির দুটি বড় অধ্যায় আছে: ১. হদ : যা নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়। ২. তা’যীর : যা বিচারক বা রাষ্ট্রের বিচক্ষণার ওপর নির্ভরশীল।

 

 

 

​        ধর্ষণের মামলায় যদি কোনো টেকনিক্যাল কারণে (যেমন আলামত নষ্ট হওয়া বা ডিএনএ রিপোর্ট অস্পষ্ট হওয়া) ‘হদ’ প্রয়োগ করা নাও যায়, তবুও বিচারক অপরাধীকে ছেড়ে দিতে পারেন না।

 

 

 

​        আদালত তখন ‘তা’যীর’ আইনের অধীনে অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে ধর্ষককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, চাবুক মারা, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, এমনকি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দিতে পারে। শরিয়তের মূল লক্ষ্যই হলো অপরাধ দমন এবং সমাজ থেকে ফাসাদ দূর করা।

 

 

 

 

​     অ্যান্টি-ইসলামিস্টরা যে ৪ জন সাক্ষীর কথা বলে চিৎকার করে, তা আসলে ধর্ষণের ক্ষেত্রে খাটে না, তা খাটে কেবল পারস্পরিক সম্মতির ব্যভিচারের ক্ষেত্রে মিথ্যা অপবাদ রোধ করার জন্য। ইসলামে ধর্ষণের বিচার অত্যন্ত আধুনিক, ভুক্তভোগীবান্ধব এবং কঠোর। ইসলামে ভুক্তভোগী নারীর বিচার পাওয়ার জন্য কোনো অলৌকিক ৪ জন সাক্ষীর প্রয়োজন নেই; বরং আধুনিক বিজ্ঞান, ফরেনসিক ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণই ধর্ষককে ঝুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

 

 

 

 

​     তাই ইসলামবিদ্বেষীদের এই সস্তা প্রোপাগান্ডায় কান না দিয়ে, শরিয়তের প্রকৃত এবং বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব।

 

 

 

 

 

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ইসলামে ধর্ষণের বিচার পেতে চারজন চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষী লাগেনা

আপডেট সময় : ১১:৫০:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

 

 

ইসলামে ধর্ষণের বিচার পেতে চারজন চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষী লাগেনা

 

ইসলামে ধর্ষণের বিচার পেতে হলে ধর্ষিতাকে চারজন চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষী লাগে- দাবিটি কেবল অজ্ঞতাই নয়, বরং চরম ধূর্ততা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন ইসলামবিদ্বেষী প্ল্যাটফর্মে ইসলামি আইন (শরিয়ত) নিয়ে একটি জঘন্য অপপ্রচার চালানো হয়। তাদের দাবি “ইসলামে ধর্ষণের বিচার পেতে হলে ধর্ষিতাকে চারজন চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষী হাজির করতে হবে। তা না পারলে উল্টো ভুক্তভোগী নারীকেই ‘মিথ্যা অপবাদের’ দায়ে ৮০টি চাবুক মারা হবে! আর পুরুষরা বেঁচে গেলেও নারীরা গর্ভবতী হওয়ার কারণে ফেঁসে যেতেন।”

 

 

 

​এই দাবিটি কেবল অজ্ঞতাই নয়, বরং চরম ধূর্ততা এবং ইসলামি ফেকাহ শাস্ত্রের মূলনীতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করার এক নিকৃষ্ট প্রচেষ্টা। আসুন, নিখাদ একাডেমিক ও আইনি দলিলসহ এই প্রোপাগান্ডার ব্যবচ্ছেদ করি।

​

       ১. প্রথম মিথ্যা:

“ধর্ষণের প্রমাণে ৪ জন সাক্ষী লাগে” বাস্তবতা: ইসলামি আইনে ‘যিনা’ বা পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যভিচার এবং ‘ধর্ষণ’ বা জবরদস্তিমূলক যৌন নির্যাতন—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অপরাধ।

 

 

​যিনা (ব্যভিচার): এটি দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সম্মতিতে গোপন পাপাচার। ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে। কিন্তু কেউ যদি সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে জনসমক্ষে এই নোংরামি ছড়াতে চায়, কেবল তখনই ৪ জন প্রত্যক্ষদর্শীর শর্ত দেওয়া হয়েছে। মূলত, সমাজে যেন কেউ কারও চরিত্র হনন করতে না পারে, সেজন্যই এই কঠিন সুরক্ষাকবচ।

​

 

          ধর্ষণ : ধর্ষণ কোনো গোপন পাপ বা পারস্পরিক সম্মতি নয়। এটি একটি সহিংস ফৌজদারি অপরাধ। ইসলামি আইনের পরিভাষায় একে ‘হিরাবাহ’ (সন্ত্রাস, ডাকাতি বা সশস্ত্র আক্রমণ) অথবা ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ (পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি) হিসেবে গণ্য করা হয়।

 

 

 

​       আইনি মূলনীতি:

শরিয়া ফৌজদারি আইনে ‘হিরাবাহ’ বা সাধারণ কোনো সহিংস অপরাধ প্রমাণের জন্য কখনোই ৪ জন সাক্ষীর প্রয়োজন হয় না। অন্য যেকোনো সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের মতো পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিক আলামত এবং ন্যায়সংগত প্রমাণের ভিত্তিতেই ধর্ষণের বিচার হয়।

 

 

 

​        ২. দ্বিতীয় মিথ্যা:

“সাক্ষী না থাকলে ধর্ষিতাকেই ৮০ চাবুক মারা হবে (কাযফ)”। ইসলামবিদ্বেষীদের সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হলো তারা সূরা আন-নূরের ৪ নম্বর আয়াতকে (যা ‘কাযফ’ বা মিথ্যা অপবাদের শাস্তি সংক্রান্ত) ধর্ষণের শিকার নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়।

 

 

সূরা আন-নূর (২৪:৪)-এ বলা হয়েছে, যারা সতী-সাধ্বী নারীর বিরুদ্ধে (ব্যভিচারের) অপবাদ দেয় এবং চারজন সাক্ষী আনে না, তাদের ৮০টি বেত্রাঘাত করো।

​

 

 

       ফিকাহ শাস্ত্রের বাস্তবতা: এই আইনটি তৈরিই হয়েছে নারীর সুরক্ষার জন্য, যাতে কোনো পুরুষ কোনো নারীর চরিত্র নিয়ে মিথ্যা কুৎসা রটাতে না পারে। ধর্ষণের শিকার কোনো নারী যখন বিচার চাইতে আদালতে আসেন, তিনি কারো বিরুদ্ধে অপবাদ দিতে আসেন না, বরং তিনি নিজে একটি অপরাধের ভুক্তভোগী হিসেবে আসেন।

​

​      মহান ইমামগণ স্পষ্ট করে গেছেন যে, ধর্ষণের শিকার নারী সাক্ষী আনতে না পারলে তার ওপর কোনো শাস্তি (কাযফ) আসবে না।

​

 

       ইমাম মালিক (র.)-এর ফতোয়া: মালিকি মাজহাবের বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ ‘আল-মুদাওয়ানাহ’ -এ স্পষ্ট বলা হয়েছে: যদি কোনো নারী ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায়, ক্রন্দনরত অবস্থায় বা রক্তাক্ত শরীরে মানুষের সামনে এসে চিৎকার করে বলে যে অমুক ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করেছে, তবে তার এই রক্তাক্ত ও বিপর্যস্ত পরিস্থিতিই প্রমাণ করে যে সে সত্য বলছে। এ ক্ষেত্রে তার ওপর কোনো ‘কাযফ’ বা অপবাদের শাস্তি হবে না, বরং পুরুষটির বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার হবে।

 

 

 

​       ইমাম ইবনে কুদামাহ (র.)-এর রায়: হাম্বলি মাজহাবের প্রধান রেফারেন্স গ্রন্থ ‘আল-মুগনি’ ( Vol. 9, p. 57)-এ বলা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার নারী যদি ধর্ষকের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করে এবং তা প্রমাণ করতে অসমর্থও হয়, তবুও তার ওপর কোনো শাস্তি আরোপ করা যাবে না। কারণ সে নির্যাতিতা।

​        ৩. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আমল: একক সাক্ষ্যেই ধর্ষণের বিচার

​

 

 

আল্লাহর রাসূল (সা.) স্বয়ং চারজন সাক্ষীর শর্ত ছাড়া কেবল পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে ধর্ষকের শাস্তি কার্যকর করেছিলেন।

​হাদীসের রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং: ৪৩৭৯) এবং জামে আত-তিরমিযী (হাদীস নং: ১৪৫৪)।

 

 

 

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এক মহিলা ভোরে মসজিদে নামাজে আসার সময় এক ব্যক্তি দ্বারা ধর্ষিত হন। মহিলাটির চিৎকার শুনে লোকজন ছুটে আসে এবং পরবর্তীতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধরে আনা হয়। আল্লাহর রাসূল (সা.) ওই মহিলার একক বয়ান এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতার ওপর ভিত্তি করে অপরাধীকে পাথর নিক্ষেপ (রজম) বা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। তিনি মহিলার কাছে ৪ জন সাক্ষী চাননি।

 

 

 

​       আজকের যুগে যারা বলে ইসলামে ৪ জন সাক্ষী ছাড়া ধর্ষণের বিচার হয় না, তারা কি আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর এই সুন্নাহ ও বিচারকে অস্বীকার করতে চায়?

​       ৪. আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞান ও শরিয়তের ‘কারাইন’ (Circumstantial Evidence)

​

 

এই শরিয়া বিচারব্যবস্থা জড় বা স্থবির নয়। ইসলামি আইনে বিচার প্রমাণের জন্য অন্যতম একটি বড় হাতিয়ার হলো ‘কারাইন’ বা পারিপার্শ্বিক ও বৈজ্ঞানিক আলামত।

​

 

 

শরিয়া আইনের অন্যতম মূলনীতি হলো: “নিশ্চয়ই শরিয়ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য।” (ইমাম ইবনুল কায়্যিম, আল-তুরুক আল-হুকমিয়্যাহ)।

​

 

মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ ফিকহ বোর্ড যেমন— ওআইসি-র ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফিকহ একাডেমি’ এবং মিসরের ‘দারুল ইফতা’ স্পষ্ট ফতোয়া দিয়েছে যে, বর্তমান যুগে ডিএনএ টেস্ট , মেডিকেল ফরেনসিক রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল আলামত ও আঙুলের ছাপ ইসলামি আদালতে চূড়ান্ত এবং অকাট্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ (কারাইন ক্বাতইইয়াহ) হিসেবে গণ্য হবে। এর জন্য কোনো মানুষের চাক্ষুষ সাক্ষ্যের প্রয়োজন নেই।

 

 

 

​        ৫. তৃতীয় মিথ্যা: “নারীরা গর্ভবতী হওয়ার কারণে ফেঁসে যেতো, পুরুষরা বেঁচে যেতো”

​এটি আরেকটি চরম মিথ্যাচার। ইসলামবিদ্বেষীরা দাবি করে, প্রাচীনকালে ধর্ষণের ফলে কোনো নারী গর্ভবতী হলে তাকে ব্যভিচারের অপরাধে শাস্তি দেওয়া হতো।

​

 

 

 

       শরিয়তের অকাট্য নীতি: ইসলামে বলপ্রয়োগ বা জবরদস্তির শিকার ব্যক্তির কোনো পাপ বা আইনি শাস্তি নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলবশত করা অপরাধ, ভুলে যাওয়া বিষয় এবং যার ওপর তাকে বাধ্য করা হয়েছে (ধর্ষণ বা জবরদস্তি), তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২০৪৩)।

 

 

​      গর্ভবতী নারীর শাস্তি মওকুফ: ইসলামি আইনের একটি বিখ্যাত মূলনীতি হলো— “সন্দেহের দ্বারা ‘হদ’ বা শাস্তি বাতিল হয়ে যায়” । কোনো নারী গর্ভবতী হওয়া মানেই সে ব্যভিচার করেছে-এটি শতভাগ নিশ্চিত নয়, কারণ এখানে ধর্ষণের (জবরদস্তির) প্রবল সম্ভাবনা বা ‘সন্দেহ’ বিদ্যমান।

​খলিফা ওমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক রায়:

​        আমিরুল মুমিনীন হযরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে একজন অবিবাহিত গর্ভবতী নারীকে বিচারালয়ে আনা হয়। ওমর (রা.) তাকে শাস্তি দেওয়ার উদ্যেগ নিলে হযরত আলী (রা.) বা মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) তাকে বাধা দিয়ে বলেন, “হে আমিরুল মুমিনীন! আপনি নারীর জঠরে থাকা সন্তানের ওপর জুলুম করতে পারেন না। আর এই নারী ধর্ষণের শিকারও হতে পারে।”

 

 

 

​        তখন নারীটিকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে জানায়, সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকা অবস্থায় এক ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছিল। এই কথা শুনে হযরত ওমর (রা.) তৎক্ষণাৎ তার শাস্তি মওকুফ করেন এবং ইসলামের ইতিহাসে এই ঐতিহাসিক বাক্যটি বলেন: “যদি আলী না থাকত, তবে ওমর ধ্বংস হয়ে যেত।” (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৪০৭; কিতাবুল আমওয়াল, ইমাম আবু উবাইদ)।

​৬. সাক্ষীর অভাবে কি ধর্ষক পার পেয়ে যাবে? ‘তা’যীর’ আইনের চাবুক

​ইসলামবিদ্বেষীরা সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয় এই বলে যে, যদি কোনো কারণে সর্বোচ্চ শাস্তি (হদ)-এর টেকনিক্যাল প্রমাণ না মেলে, তবে বুঝি ধর্ষক খালাস পেয়ে যায়। এটি কত বড় মূর্খতা!

 

 

​        ইসলামি দণ্ডবিধিতে শাস্তির দুটি বড় অধ্যায় আছে: ১. হদ : যা নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়। ২. তা’যীর : যা বিচারক বা রাষ্ট্রের বিচক্ষণার ওপর নির্ভরশীল।

 

 

 

​        ধর্ষণের মামলায় যদি কোনো টেকনিক্যাল কারণে (যেমন আলামত নষ্ট হওয়া বা ডিএনএ রিপোর্ট অস্পষ্ট হওয়া) ‘হদ’ প্রয়োগ করা নাও যায়, তবুও বিচারক অপরাধীকে ছেড়ে দিতে পারেন না।

 

 

 

​        আদালত তখন ‘তা’যীর’ আইনের অধীনে অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে ধর্ষককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, চাবুক মারা, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, এমনকি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দিতে পারে। শরিয়তের মূল লক্ষ্যই হলো অপরাধ দমন এবং সমাজ থেকে ফাসাদ দূর করা।

 

 

 

 

​     অ্যান্টি-ইসলামিস্টরা যে ৪ জন সাক্ষীর কথা বলে চিৎকার করে, তা আসলে ধর্ষণের ক্ষেত্রে খাটে না, তা খাটে কেবল পারস্পরিক সম্মতির ব্যভিচারের ক্ষেত্রে মিথ্যা অপবাদ রোধ করার জন্য। ইসলামে ধর্ষণের বিচার অত্যন্ত আধুনিক, ভুক্তভোগীবান্ধব এবং কঠোর। ইসলামে ভুক্তভোগী নারীর বিচার পাওয়ার জন্য কোনো অলৌকিক ৪ জন সাক্ষীর প্রয়োজন নেই; বরং আধুনিক বিজ্ঞান, ফরেনসিক ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণই ধর্ষককে ঝুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

 

 

 

 

​     তাই ইসলামবিদ্বেষীদের এই সস্তা প্রোপাগান্ডায় কান না দিয়ে, শরিয়তের প্রকৃত এবং বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব।

 

 

 

 

 

Facebook Comments Box