ঢাকা ০১:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভালো নাম ও ডাকনামের নানামুখী রসায়ন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:১৩:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পরিবারের গণ্ডিতে বাবা-মা, দাদা-দাদি বা আত্মীয়স্বজন আদরের ডাকে নানারকম মিষ্টি নাম জুড়ে দেন। খোকা, বাবু, সোনা কিংবা মণি—এসব নাম শুনলে কারোরই মন খারাপ হয় না। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন গায়ের রঙের ওপর ভিত্তি করে কারো নাম রাখা হয়। যেমন, অনেক ফর্সা শিশুর ভিড়ে একটু চাপা রঙের কাউকে বাবা-মা যদি ‘কালু’ বলে ডাকেন, তবে সে শিশুটি মনে মনে বেশ ক্ষুব্ধ হয়। যদিও শৈশবে মুরব্বিদের স্নেহের আতিশয্যে বা ভালো-মন্দের তফাত না বোঝায় ছেলেটি তখন সেভাবে কিছু বলে না। পারিবারিক পর্যায়ে এই নাম একসময় স্থায়ী হয়ে যায়। কিন্তু ডাকনাম হিসেবে প্রকৃত মর্যাদা পেতে হলে বাড়ির গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরের জগতে তার পরিচিতি গড়ে তোলা জরুরি। পাড়া-মহল্লার খেলার সাথী, বন্ধু বা সহপাঠীদের মুখে যখন একই নামে ডাক শোনা যায়, তখনই তা সার্থক ডাকনামে পরিণত হয়।

ডাকনামের পরিচিতি অনেক ক্ষেত্রেই মূল নামের সাথে জড়িয়ে থাকে। যারা দাপ্তরিক নামের সাথে ডাকনাম লেখেন না, তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় সহকর্মীরা সে সম্পর্কে কিছুই জানেন না। অন্যদিকে পরীক্ষার সার্টিফিকেট, চাকরির ফাইল কিংবা নির্বাচনের ভোটার তালিকায় যে নাম থাকে, তাকে আমরা ‘ভালো নাম’ বলি। তবে ডাকনাম মানেই যে খারাপ, তা নয়। নামের গ্রহণযোগ্যতা মূলত তার স্বাদের ওপর নির্ভর করে। কোনো দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজ বা নীতিহীন মানুষের ভালো নাম ‘সিদ্দিক’ হলেও মানুষ তাকে বিশ্বাস করে না। আবার সিনেমার কাল্পনিক চরিত্র ‘ফাটা কেষ্ট’ নামের ব্যক্তিকে মানুষ প্রবলভাবে ভালোবাসে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে বা বন্ধু মহলে অনেক সময় গিভেন নেইম বা আসল নামকে ছোট করে ডাকা হয়। মিজানুরকে যেমন ‘মিজান’, শামছুলকে ‘শামসু’ বা রবিউল বা রবীন্দ্রকে ‘রবি’ বলে ডাকা হয়। অনেকে এর সাথে কিছুটা গ্লামার যুক্ত করতে চাইলেও এগুলোকে সব সময় ডাকনামের সংজ্ঞায় ফেলা যায় না।

ছদ্মনামের ব্যবহার আবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হয়। লেখকরা নিজের আসল পরিচয় লুকাতে এটি গ্রহণ করেন। ভিক্টোরিয়ান যুগের বিখ্যাত ঔপনাসিক মেরি এন ইভানস ‘জর্জ এলিয়ট’ ছদ্মনামে লিখতেন। কবি পাবলো নেরুদা তার শৈশবে বাবার অমতে কবিতা লিখতে গিয়ে চেকস্লোভাকিয়ার কবি জেন নেরুদার নাম থেকে ‘নেরুদা’ অংশটি ধার করেছিলেন। ছদ্মনাম মূলত আসল সত্তাকে আড়াল করার মানসিকতা থেকে আসে, যা ডাকনামের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। বৃহত্তর পরিবার বা বন্ধু মহলে আবার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখে কখনো কখনো হেয় করার মতো নাম দেওয়া হয়, যা স্ল্যাং শব্দের মতো ব্যবহৃত হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্যরা তা উপভোগ করে।

মানুষ বড় হওয়ার সাথে সাথে তার নামের দৈর্ঘ্যও পরিবর্তিত হয়। বিয়ের পর নামের আগে মিস্টার বা মিসেস যুক্ত হয়, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর নামের শেষে এমএ বা পিএইচডি যোগ হয়। আবার জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তাদের নামের সাথে এলাকার পরিচিতি হিসেবে ফরিদপুরি বা জামালপুরি জাতীয় উপাধি যুক্ত হতে দেখা যায়। তবে ডাকনামের সাথে এসব আনুষ্ঠানিকতার যোগসূত্র নেই। কবিতার জগতেও বড় নাম খুব একটা কার্যকর হয় না; সেখানে নাম যত ছোট হয়, মাহাত্ম্য তত বাড়ে। ডাকনামের মতো এই সংক্ষিপ্ত নামগুলো তাই নিজস্ব গণ্ডিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ভালো নাম ও ডাকনামের নানামুখী রসায়ন

আপডেট সময় : ১২:১৩:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

পরিবারের গণ্ডিতে বাবা-মা, দাদা-দাদি বা আত্মীয়স্বজন আদরের ডাকে নানারকম মিষ্টি নাম জুড়ে দেন। খোকা, বাবু, সোনা কিংবা মণি—এসব নাম শুনলে কারোরই মন খারাপ হয় না। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন গায়ের রঙের ওপর ভিত্তি করে কারো নাম রাখা হয়। যেমন, অনেক ফর্সা শিশুর ভিড়ে একটু চাপা রঙের কাউকে বাবা-মা যদি ‘কালু’ বলে ডাকেন, তবে সে শিশুটি মনে মনে বেশ ক্ষুব্ধ হয়। যদিও শৈশবে মুরব্বিদের স্নেহের আতিশয্যে বা ভালো-মন্দের তফাত না বোঝায় ছেলেটি তখন সেভাবে কিছু বলে না। পারিবারিক পর্যায়ে এই নাম একসময় স্থায়ী হয়ে যায়। কিন্তু ডাকনাম হিসেবে প্রকৃত মর্যাদা পেতে হলে বাড়ির গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরের জগতে তার পরিচিতি গড়ে তোলা জরুরি। পাড়া-মহল্লার খেলার সাথী, বন্ধু বা সহপাঠীদের মুখে যখন একই নামে ডাক শোনা যায়, তখনই তা সার্থক ডাকনামে পরিণত হয়।

ডাকনামের পরিচিতি অনেক ক্ষেত্রেই মূল নামের সাথে জড়িয়ে থাকে। যারা দাপ্তরিক নামের সাথে ডাকনাম লেখেন না, তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় সহকর্মীরা সে সম্পর্কে কিছুই জানেন না। অন্যদিকে পরীক্ষার সার্টিফিকেট, চাকরির ফাইল কিংবা নির্বাচনের ভোটার তালিকায় যে নাম থাকে, তাকে আমরা ‘ভালো নাম’ বলি। তবে ডাকনাম মানেই যে খারাপ, তা নয়। নামের গ্রহণযোগ্যতা মূলত তার স্বাদের ওপর নির্ভর করে। কোনো দুর্ধর্ষ চাঁদাবাজ বা নীতিহীন মানুষের ভালো নাম ‘সিদ্দিক’ হলেও মানুষ তাকে বিশ্বাস করে না। আবার সিনেমার কাল্পনিক চরিত্র ‘ফাটা কেষ্ট’ নামের ব্যক্তিকে মানুষ প্রবলভাবে ভালোবাসে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে বা বন্ধু মহলে অনেক সময় গিভেন নেইম বা আসল নামকে ছোট করে ডাকা হয়। মিজানুরকে যেমন ‘মিজান’, শামছুলকে ‘শামসু’ বা রবিউল বা রবীন্দ্রকে ‘রবি’ বলে ডাকা হয়। অনেকে এর সাথে কিছুটা গ্লামার যুক্ত করতে চাইলেও এগুলোকে সব সময় ডাকনামের সংজ্ঞায় ফেলা যায় না।

ছদ্মনামের ব্যবহার আবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হয়। লেখকরা নিজের আসল পরিচয় লুকাতে এটি গ্রহণ করেন। ভিক্টোরিয়ান যুগের বিখ্যাত ঔপনাসিক মেরি এন ইভানস ‘জর্জ এলিয়ট’ ছদ্মনামে লিখতেন। কবি পাবলো নেরুদা তার শৈশবে বাবার অমতে কবিতা লিখতে গিয়ে চেকস্লোভাকিয়ার কবি জেন নেরুদার নাম থেকে ‘নেরুদা’ অংশটি ধার করেছিলেন। ছদ্মনাম মূলত আসল সত্তাকে আড়াল করার মানসিকতা থেকে আসে, যা ডাকনামের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। বৃহত্তর পরিবার বা বন্ধু মহলে আবার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখে কখনো কখনো হেয় করার মতো নাম দেওয়া হয়, যা স্ল্যাং শব্দের মতো ব্যবহৃত হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্যরা তা উপভোগ করে।

মানুষ বড় হওয়ার সাথে সাথে তার নামের দৈর্ঘ্যও পরিবর্তিত হয়। বিয়ের পর নামের আগে মিস্টার বা মিসেস যুক্ত হয়, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর নামের শেষে এমএ বা পিএইচডি যোগ হয়। আবার জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তাদের নামের সাথে এলাকার পরিচিতি হিসেবে ফরিদপুরি বা জামালপুরি জাতীয় উপাধি যুক্ত হতে দেখা যায়। তবে ডাকনামের সাথে এসব আনুষ্ঠানিকতার যোগসূত্র নেই। কবিতার জগতেও বড় নাম খুব একটা কার্যকর হয় না; সেখানে নাম যত ছোট হয়, মাহাত্ম্য তত বাড়ে। ডাকনামের মতো এই সংক্ষিপ্ত নামগুলো তাই নিজস্ব গণ্ডিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

Facebook Comments Box