কৈশোরের আলো ছড়ানোর ১৩ বছর ও আমাদের ভাবনা
- আপডেট সময় : ১১:৪২:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
কৈশোরের আলো ছড়ানোর ১৩ বছর ও আমাদের ভাবনা
কিশোর শব্দটির সাথে জড়িয়ে থাকে এক দারুণ ইতিবাচক ও সুন্দর অনুভূতি। অথচ বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের শিরোনামে এই শব্দের সঙ্গে যখন ‘গ্যাং’ পরিভাষাটি যুক্ত হতে দেখা যায়, তখন তা অত্যন্ত পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ কিশোর-কিশোরী রয়েছে, যাদের সবাই অপরাধ চক্রের সাথে জড়িত নয়। আমাদের রাজধানী ঢাকা শহরের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিক জীবনের বাইরে কুড়িগ্রামের চর অঞ্চলের শ্রমজীবী কিশোর, রংপুরের মাদ্রাসাগামী কিশোরী, রাঙামাটির পাহাড়ি পথ পাড়ি দেওয়া শিক্ষার্থী কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ গ্লাস কারখানা ও গণপরিবহনে কর্মরত অপ্রাপ্তবয়স্করাসহ বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েরাও এই প্রজন্মের অংশ।
কিশোর শব্দটা শুনলেই কী যে সুন্দর একটা ইমেজ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমাদের কালে আমরা স্কুলের বইয়ে গোলাম মোস্তফার ‘কিশোর’ নামের কবিতা পড়তাম, ‘আমরা নূতন, আমরা কুঁড়ি নিখিল বন–নন্দনে,/ ওষ্ঠে রাঙা হাসির রেখা জীবন জাগে স্পন্দনে।
পড়ুন>>ক্যালিফোর্নিয়ায় সরকারি ছুটির স্বীকৃতি পেল ঈদুল ফিতর ও আজহা
দুঃখের বিষয়, কিশোর কথাটার সঙ্গে গ্যাং কথাটাও উচ্চারিত হচ্ছে। আমরা যাঁরা ঢাকায় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে দেশের ভাবনা ভাবি, তাঁদের কাছে জেন–জি মানে আধুনিক সচ্ছল একটা প্রজন্ম। কিন্তু কুড়িগ্রামের চরে যে কিশোর স্কুলে যাচ্ছে, কিংবা গরু চরাচ্ছে, রংপুরে যে কিশোরী মাদ্রাসায় যাচ্ছে, রাঙামাটিতে যে কিশোরেরা পাহাড়–নদী ডিঙিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, যে কিশোরেরা গ্লাস ফ্যাক্টরিতে প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে, যারা টেম্পোর পেছনে ঝুলছে, যারা জুতার দোকানে।
বাস্তবতা হলো, আমরা আমাদের এই নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর শৈশব-কৈশোর নিশ্চিত করতে পারছি না। তাদের সামনে ভালো মানুষ হওয়ার আদর্শ বা লক্ষ্য সেভাবে তুলে ধরা যাচ্ছে না, যা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারত।
পড়ুন>>নেতানিয়াহু সীমা অতিক্রম করেছেন, কড়া বার্তা কাতারের প্রধানমন্ত্রীর
অতীতে খেলাঘর, কচি-কাঁচার মেলা, মুকুল ফৌজ, চাঁদের হাট কিংবা শাপলাশালুকের আসরের মতো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সক্রিয় ছিল। পরবর্তী সময়ে শিশু একাডেমি ও নতুন কুঁড়ির মতো আয়োজনগুলো যুক্ত হয়। বিদ্যালয়গুলোতে তখন সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, নিয়মিত বিতর্ক প্রতিযোগিতা, নাট্যচর্চা, বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দেয়ালপত্রিকা প্রকাশের মতো সৃজনশীল কর্মকাণ্ড চালু ছিল, যা বর্তমান সময়ে অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
আরও পড়ুন>>পেট্রোবাংলায় ৭৫৩ জন নিয়োগ: আবেদন চলবে এক মাস
রংপুরের একটি সাধারণ মফস্বল এলাকার কথা বিবেচনা করলে দেখা যায়, অতীতে যেখানে কোনো বিলাসবহুল গাড়ি বা বহুতল ভবন ছিল না, আজ সেখানে সুউচ্চ অট্টালিকা গড়ে উঠেছে। অর্থনৈতিকভাবে সমাজ সচ্ছল হলেও কিশোরদের একাংশের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা ও মাদকাসক্তি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এই নেতিবাচক স্রোত থেকে তরুণদের রক্ষা করতেই ১৩ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল মাসিক ম্যাগাজিন ‘কিশোর আলো’।
দেশের বিপুলসংখ্যক কিশোর-কিশোরীর তুলনায় এই উদ্যোগটি ছোট মনে হতে পারে, তবে একটি জ্বলন্ত মোমবাতি যেভাবে অন্য মোমবাতিকে প্রজ্বলিত করে, ঠিক সেভাবেই তরুণদের মনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। সমুদ্রসৈকতে আটকে পড়া শত শত স্টারফিশের মধ্য থেকে একটি একটি করে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টার মতোই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস অব্যাহত রাখা জরুরি।
দীর্ঘ ১৩ বছরের এই যাত্রায় যারা প্রথম থেকে কিশোর আলো পড়তে শুরু করেছিল, তাদের অনেকেই এখন চাকরিজীবনে প্রবেশ করেছে এবং কেউ কেউ অভিভাবকও হয়েছে। এই পাঠকদের মধ্যে নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচলতা, দেশপ্রেম ও ইতিবাচক স্বপ্ন লালন করার মানসিকতা লক্ষ্য করা যায়।
আরও পড়ুন>>১৫ অক্টোবরের মধ্যে ৫০০ উপজেলায় এনসিপির আহ্বায়ক কমিটি: সারজিস
উদাহরণস্বরূপ, এই ম্যাগাজিনের এককালীন স্বেচ্ছাসেবী সারণীর কথা বলা যায়, যে কিশোর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে দ্রুত নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। সে নিজের এই আত্মবিশ্বাসের পুরো কৃতিত্ব দেয় কিশোর আলোর পাঠক ও স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে। একইভাবে প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী এম জাহিদ হাসান, যিনি বর্তমানে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন, তিনিও ছোটবেলায় বিজ্ঞান সাময়িকীতে লেখার মাধ্যমে নিজের বৈজ্ঞানিক ভাবনার ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। বিটিভির ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের শুরুতে কবিতাটা গান হিসেবে কতবার যে শুনেছি।
আজ ১৩ বছর পূর্ণ করে কিশোর আলো তার ১৪তম বছরে পদার্পণ করছে। এই দীর্ঘ পথচলায় পাঠক, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনোজগতকে সমৃদ্ধ করতে এবং তাদের বড় মনের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রিন্ট সংস্করণের পাশাপাশি ‘কিশোর আলো ডট কম’ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন কুইজ ও প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তরুণদের বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক গুণসম্পন্ন করে তুলতে তাদের হাতে কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তার মতো মানসম্মত সাময়িকী তুলে দেওয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব।
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ











