কুড়িগ্রামে নানা আয়োজনে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের জন্মদিন পালিত
- আপডেট সময় : ১০:৪৮:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২২ ১২৯৮ বার পড়া হয়েছে
দেশবরেণ্য কথা সাহিত্যিক সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ৮৭তম জন্মদিন নানা আয়োজনে পালিত হয়েছে।
‘দিবসটি উপলক্ষে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ ক্যাম্পাস সংলগ্ন কবির সমাধীতে জেলা প্রশাসক মোহম্মদ সাইদুল আরীফ, পুলিশ সুপার আল আসাদ মো. মাহফুজুল ইসলাম কবি পুত্র দ্বিতীয় সৈয়দ হক, কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি রাজু মোস্তাফিজসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পমাল্য অর্পণ করে।”
কবির জন্মদিন উপলক্ষ্যে কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজ মাঠে সৈয়দ শামসুল হক স্মৃতি একটি মেলার আয়োজন করে। দিন ভর চলে এ মেলা। মেলার উদ্ধোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহম্মদ সাইদুল আরীফ।পড়ুন>>ভূরুঙ্গামারীর মীর জুমলা মসজিদ (Mir jumla mosque)
ইউসুফ আলমগীরের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ মীর্জা নাসির উদ্দিন, সুপার আল আসাদ মো. মাহফুজুল ইসলাম কবি পুত্র দ্বিতীয় সৈয়দ হক, কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি রাজু মোস্তাফিজসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পমাল্য অর্পণ করে।
“কথা সাহিত্যিক সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম শহরের থানা পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।”
২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মারা গেলে কুড়িগ্রাম-চিলমারী সড়কের পাশে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ ক্যাম্পাস চত্ত্বরে তাকে সমাধীস্থ করা হয়। প্রতিদিন তার ভক্তরা আসে এ সমাধীস্থল পরিদর্শনে। এ কমপ্লেক্স নির্মিত হলে কুড়িগ্রামের পর্যটন শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।

সৈয়দ শামসুল হক (২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫ – ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬) বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে সক্রিয় একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী সাহিত্যিক।পড়ন>>নিজ হাতেই বানিয়ে ফেলুন ভেষজগুণ যুক্ত এগারোটি ভিন্ন স্বাদের চা
“কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, অনুবাদ তথা সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য তাকে ‘সব্যসাচী লেখক’ বলা হয়। তার লেখকজীবন প্রায় ৬২ বছর ব্যাপী বিস্তৃত।”
সৈয়দ শামসুল হক মাত্র ৩১ বছর বয়সে ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছিলেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে এ পুরস্কার লাভ করেছেন।
এছাড়া বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক এবং ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।
“ধাঁচের বিষয় ও কাব্যভাষার ব্যবহারে সাফল্য দেখিয়েছেন। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একদা এক রাজ্যে’।”
কিন্তু তার কবিতা রচিত ও প্রকাশিত হচ্ছিল আগের প্রায় এক দশক ধরে। প্রমিত ও পরিচ্ছন্ন কাব্যভাষায় তিনি রচনা করছিলেন নাগরিক মধ্যবিত্তের অন্তর্গত বোধ-বাসনা ও স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষার ব্যাকরণ, যা হয়তো ওই সময়ের পূর্ব বাংলা বা ঢাকা নগরীর আবহের চেয়েও ‘অগ্রসর’।
নিঃসন্দেহে কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলা কাব্যধারা এবং বিশ্ব আধুনিক কবিতার নানা অভিজ্ঞতা তাকে প্রভাবিত করেছিল।
ঢাকার অন্য অনেক কবির মতো তিনিও মগ্ন হয়েছিলেন টি এস এলিয়টের কবিতায়; বুদ্ধদেব বসু অনূদিত বোদলেয়ারের কবিতায়। কিন্তু নিজের কবিতায় স্বতন্ত্র স্বর আর ভঙ্গি যোজনা করতে তাকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।

এ কারণেই প্রথম কাব্য ‘একদা এক রাজ্যে’ প্রকাশিত হলে ঢাকার কাব্যজগৎ তাকে এক নতুন কাব্যস্বর হিসেবেই বরণ করেছিল।
তার এ নতুনত্বকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় অর্থময়তাকে প্রাধান্য দেননি তিনি।প্রধান করে তুলতে চেয়েছিলেন ধ্বনিময় সাঙ্গীতিকতাকে, যেখানে ব্যক্তির অন্তরঙ্গ আর অন্তর্নিহিত অনুভবের এক প্রকার বিমূর্ত চিত্রায়ণ ঘটবে। প্রতিবেশ ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার কোনো স্থান সেখানে ছিল না।

এমনকি অব্যবহিত যে বাস্তবতায় ব্যক্তির সামগ্রিক নিবাস, তার পরিচয়ও কবিতাগুলোতে খুব আবছা থেকে গেছে, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নাগরিক আবহ আর নৈঃসঙ্গ্যের একটা আভাস তাতে পাওয়া যায়। এ ধরনের ‘অ-সামাজিক’ ব্যক্তিতার নিগূঢ় গোপনের যে রহস্যময় প্রাঙ্গণটি সৈয়দ হকের প্রথম পর্বের কবিতায় বড় হয়ে উঠেছে, তার রংটি আবার কালো।
একদিকে অসহায়ত্ব, একাকিত্ব আর হতাশার অন্ধকার, অন্যদিকে প্রবৃত্তিতাড়িত তমসা — এ দুইয়ের প্রবল প্রতাপ সেই জগতে। মৃত্যুময় তমসা আর পঙ্কিল জগতে ব্যক্তির অধিষ্ঠান।
তার কোনো ধারাবাহিক বিবরণী নয়, কবিতাগুলোতে প্রধান হয়ে উঠেছে মুহূর্তের অনুভূতি এবং চকিত উপলব্ধির আলোকসম্পাত। কবিতাগুলোতে বিমূর্ত ভঙ্গি, অস্পষ্ট ও টুকরা চিত্রকল্প, আর অনুভব-উপলব্ধির ধ্বনিপ্রধান সাঙ্গীতিক প্রকাশের প্রাধান্য ঘটেছে মুখ্যত এ কারণেই।
সৈয়দ শামসুল হকের দ্বিতীয় কাব্য বিরতিহীন উৎসব ভাববলয় এবং কাব্যভাষার দিক থেকে প্রথম কাব্যেরই সহোদর। কবিতায় বর্ণনামূলক অর্থময়তার পরিমাণ বেড়েছে বটে, কিন্তু ব্যক্তিক ও মনোজাগতিক যে ধরনের উচ্চারণ তার এ পর্বের কাব্যের বিশিষ্টতা, তা এ কাব্যেও প্রবল।

প্রেম-কামের অতি ব্যক্তিগত আবহের সঙ্গে এ কাব্যে আরও যুক্ত হয়েছে মৃত্যুচেতনা এবং সৃষ্টিশীলতার সমীক্ষা — খোদ কবিতা নিয়ে অনেকগুলো কবিতা আছে এ কাব্যে, যে ধরনের কবিতা তিনি প্রচুর রচনা করেছেন তার কাব্যজীবনের একেবারে শেষ পর্যায় পর্যন্ত।
উত্তরকালে সৈয়দ হকের কবিতা ক্রমশ সহজ ও সরল হয়েছে; নাগরিক প্রমিত উচ্চারণকে চৌকস ভঙ্গিতে কবিতার বশীভূত করাই হয়ে উঠেছে তার প্রধান কাব্যলক্ষণ।
কিন্তু প্রথম দুই কাব্যকে যদি একটা পর্ব হিসেবে সাব্যস্ত করি, তাহলে বলতেই হবে, অলঙ্কার-চঞ্চল ভাষা ও কল্পনার নতুনত্বই এসব কবিতার মূল ভিত্তি। এ পর্বে তিনি মন ও মনোবিকলনের সমীক্ষক, তির্যক, ইমেজপ্রধান ও কল্পনার বশীভূত।
বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে সৈয়দ শামসুল হক প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কবি, যার রচনায় অচেতন মন ও অবদমিত বাসনার প্রবলতা আছে। যাপিত জীবনের ও দৈনন্দিন বাস্তবের প্রত্যক্ষ অনুকরণ নয়, বরং প্রথম পর্বের কবিতায় দেখি মনের জটিল কামনা-বাসনার ধোঁয়াশাচ্ছন্ন প্রকাশ। সেখানে নারী, যৌন অবদমন আর অস্বাভাবিক মনস্তত্ত্বের প্রবল প্রতাপ।
সাধারণভাবে নাগরিক উচ্চবিত্ত আবহের মধ্যেই তিনি তার কাব্য-উপকরণ খুঁজেছেন; তার নারীও — তিনি ব্যবহার করতেন ভদ্র-জনোচিত ‘মহিলা’ শব্দটি — উচ্চবিত্ত বলয়েরই বাসিন্দা, যেমন ঘটেছে তার প্রথম পর্যায়ের উপন্যাস ও গল্পে।
যৌনতার অবারিত আয়োজন আর অতি-ব্যক্তিগত তমশাচ্ছন্ন অনুভবের সংশ্লেষের মধ্য দিয়ে সৈয়দ হক বাংলা কবিতার সমকালীন আবহে এক নতুন ও ভিন্নধর্মী মাত্রা যোগ করতে পেরেছেন।
অর্থকে প্রাধান্য না দিয়ে বিচূর্ণ চিত্রকল্পের ধ্বনিময় সাঙ্গীতিকতাকে কাব্যভাষার প্রধান অবয়ব করে তোলার যে নতুনত্ব সৈয়দ হক প্রথম পর্বের কবিতায় দেখিয়েছেন, তার সমধর্মী কোনো আয়োজন তার পরবর্তী বিপুল রচনায় দেখা যায় না। তবে এ ভাষা উত্তরকালীন কোনো কোনো কবিকে প্রভাবিত করে গেছে।
বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’ কাব্যে সৈয়দ শামসুল হক প্রবেশ করেছেন নতুন কাব্য-পর্বে।
এ কাব্য তার আগের ও পরের কাব্যচর্চা থেকেই শুধু আলাদা নয়, ধরনের দিক থেকে, বিশেষত নায়কের স্বগতোক্তির ভিতর দিয়ে দশ দিগন্তকে স্পর্শ করার প্রকাশভঙ্গির দিক থেকে, আধুনিক বাংলা সাহিত্যেই খুব বিরল ঘটনা।
অন্তমিলহীন প্রবহমান পয়ারে রচিত দীর্ঘ কবিতাটি ভাষা ও ভঙ্গির দিক থেকে বাংলাদেশের কবিতার বিশিষ্ট সংযোজন। অনুমান করা যায়, কবির সঙ্গে এ কাব্যে যোগ দিয়েছিলেন কথাসাহিত্যিক সৈয়দ হক; আর উত্তরকালে কাব্যনাট্য রচনায় যে মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন তিনি, তারও একপ্রকার সূচনা ঘটেছে এ কাব্যে।


























