নওগাঁয় শ্যালিকাকে বিয়ে, যুবক ও দুই স্ত্রীর মুখে চুনকালি দিয়ে গ্রামছাড়া
- আপডেট সময় : ০৫:১৩:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ৪৫ বার পড়া হয়েছে
নওগাঁয় প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে থাকা অবস্থায় আপন শ্যালিকাকে বিয়ে করার জেরে এক যুবক ও তাঁর দুই স্ত্রীকে জনসমক্ষে হেনস্তা করে গ্রামছাড়া করার ঘটনা ঘটেছে। সোমবার রাতে জেলার মহাদেবপুর উপজেলার একটি গ্রামে এ ঘটনাটি ঘটে, যার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী ৩৫ বছর বয়সী ওই যুবক নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন আইনজীবীর সহকারী। তিনি গত রোববার সন্ধ্যায় ২১ বছর বয়সী আপন শ্যালিকাকে বিয়ে করেন। এর আগে তাঁরা বদলগাছী উপজেলা সদরে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও সামাজিক ক্ষোভ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুই বোনকে একই সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর এলাকায় তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
বিষয়টি ধর্মীয় বিধানের পরিপন্থী—এমন দাবি তুলে বদলগাছীর ভাড়া বাসা থেকে তাঁদের বের করে দেওয়া হয়।
স্থানীয় লোকজনের অব্যাহত ক্ষোভ ও চাপের মুখে ওই যুবক নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে দুই স্ত্রীকে নিয়ে মহাদেবপুর উপজেলায় শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, শ্বশুরবাড়িতে আসার খবর জানাজানি হলে রাত ১০টার দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে জড়ো হন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, এই ধরনের বিয়ে তরুণ প্রজন্মের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এ যুক্তিতে তাঁদের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। একপর্যায়ে মারধর করে তাঁদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে ও গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী যুবকের শ্বশুরের ভাষ্যমতে, ঘটনার সময় গ্রামবাসী বাড়ি ঘেরাও করে তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে গ্রাম ছাড়া করে। বর্তমানে তাঁরা এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এসেছে। ভুক্তভোগী যুবকের সঙ্গে তাঁর দুই স্ত্রীর একাধিক টিকটক ভিডিও অনলাইনে পাওয়া গেছে, তবে ঘটনার পর থেকে যুবকের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। দুই স্ত্রীর কারও সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়নি। খবর পেয়ে গ্রামের কিছু লোক বাড়িতে এসে তাঁদের নানাভাবে হেনস্তা করেন।
ইসলামী বিধান ও আইনি অবস্থান
- নওগাঁ জেলা ইমাম-মুয়াজ্জিন পরিষদের সাবেক সভাপতি মাওলানা আকরাম হোসেন জানান, ইসলামের বিধান অনুযায়ী একই সঙ্গে দুই বোনকে স্ত্রী হিসেবে রাখা বৈধ নয়। প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকা এবং তাঁর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা অবস্থায় শ্যালিকাকে বিয়ে করা নাজায়েজ।
- প্রথম স্ত্রী মারা গেলে বা বিচ্ছেদ সম্পন্ন হওয়ার পর কেবল শ্যালিকাকে বিয়ে করা জায়েজ হতে পারে, কিন্তু বর্তমানে যা ঘটেছে তা সম্পূর্ণ শরীয়তবিরোধী।
- মহাদেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক জানান, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর মাধ্যমে তাঁরা ঘটনার বিষয়টি অবগত হয়েছেন।
- থানায় এখন পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। তবে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা অভিযোগ দিলে পুলিশ তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, রাতের আঁধারে ওই যুবক ও দুই নারীকে ঘিরে রেখেছে গ্রামবাসী। ভিডিওতে একজনকে যুবককে ধরে রাখতে দেখা যায়, আর অন্য একজন তাঁদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে দিচ্ছে। এ সময় উপস্থিত লোকজনকে উল্লাস করতে দেখা যায় এবং এলাকা থেকে বের করে দেওয়ার সময় লাঠিসোঁটা দিয়ে তাঁদের মারধর করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল এ ধরনের গণপিটুনি ও হেনস্তার প্রতিবাদ জানিয়েছে। আইন অনুযায়ী কোনো অপরাধ থাকলে তা বিচারের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত, কিন্তু চুনকালি মাখিয়ে জুতার মালা পরানো এবং গ্রামছাড়া করা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে অভিমত দিয়েছেন সমাজ সচেতন ব্যক্তিরা। পুলিশি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীর আত্মীয়স্বজন।
সূত্র: প্রথম আলো

























