রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের ৭০০ কোটি ডলার নছনছ
- আপডেট সময় : ০৪:৫২:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অগাস্ট ২০২৪ ১৮২ বার পড়া হয়েছে
রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের ৭০০ কোটি ডলার নছনছ
রপ্তানিকারকদের সহায়তায় ১৯৮৯ সালে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থে গঠিত হয় রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ)। এ ফান্ড থেকে ঋণ নিয়ে অনেকেই এখন ফেরত দিচ্ছেন না।
ডলারে নেওয়া এসব ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও জালিয়াতি হয়েছে, যার সুবিধাভোগী ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। বিদায়ী সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ঋণ কেলেঙ্কারিতে আলোচিত ক্রিসেন্ট, বিসমিল্লাহ ও এসবি পুণ্য গ্রুপ ইডিএফ ঋণ আত্মসাৎ করেছে। তালিকায় আছে নামসর্বস্ব অনেক প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন বলছে, এই তহবিলের সুবিধাভোগী শীর্ষ ৪০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘদিন ধরে ৬০০ মিলিয়ন বা ৬০ কোটি ডলারের মতো আটকে রয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ঢাকার এখতিয়ারভুক্ত ২০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি ডলার, যার সিংহভাগই ক্রিসেন্ট, বিসমিল্লাহ ও অন্য একটি গ্রুপের।
আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের এখতিয়ারভুক্ত ২০ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে ৩ কোটি ডলারের মতো।
ইডিএফ ঋণ সময়মতো ফেরত না আসার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। কারণ, এই ঋণ ছাড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেক্স ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পূর্বানুমোদন দরকার হয়।
অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদ থেকে সম্প্রতি পদত্যাগে বাধ্য হওয়া কাজী ছাইদুর রহমানের কারণে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা সহজেই এই ঋণের সুবিধা ভোগ করেছেন। আবার তাদের ঋণগুলো তদারকির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দমিয়ে রাখতেন তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য কাজী ছাইদুর রহমানের মোবাইল ফোনে কল দিলেও তিনি ধরেননি।
তবে বিভাগটির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ইডিএফের ওভার ডিউ অনেক দিন ধরে। গ্রাহকের কেউ কেউ প্রভাবশালী হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে চাপ দিয়ে এসব ডলার ফেরত আনার সাহস দেখানো হয়নি। আবার ব্যাংকগুলোতে ডলার না থাকার কারণে তাদের অ্যাকাউন্ট থেকেও সমন্বয় করা যায়নি। এখন নতুন সরকার আসছে। তারা চাইলে চাপ দিয়ে হলেও এসব ডলার ঋণ আদায় করা যাবে।
পণ্য রপ্তানির জন্য কাঁচামাল আমদানিতে রপ্তানিকারকদের ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় কম সুদে ডলারে ঋণ দিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১৯৮৯ সালে গঠিত হয় ইডিএফ। এই ঋণ ফেরত দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে ঋণ পরিশোধে সর্বোচ্চ ২৭০ দিন সময় পান উদ্যোক্তারা। কিন্তু আলোচ্য প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো তা পরিশোধ করেনি।
সূত্রগুলো বলছে, অনিয়ম, জালিয়াতি ও যোগসাজশের মাধ্যমে বেশিরভাগ ইডিএফ ঋণ বের করে নেওয়ায় তা সময়মতো ফেরত আসছে না। বিশেষ করে ঋণের বিপরীতে পণ্য রপ্তানি হলো কি না বা সেই রপ্তানির বিপরীতে আয় দেশে প্রত্যাবাসন হলো কি না, তা নিশ্চিত না হয়েই গুটিকয় গ্রাহককে বারবার ইডিএফ সুবিধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এর মাধ্যমে ইডিএফ সুবিধার অপব্যবহার করা হয়েছে। আর সময়মতো রপ্তানি না হওয়ায় এবং রপ্তানি মূল্য দেশে না আসায় ঋণ ফেরত পাওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, এই ঋণের বিপরীতে রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসন না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুকূলে টাকায় ফোর্সড ঋণ সৃষ্টি করেছে ব্যাংকগুলো।
জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরুর পর ২০২০ সালের এপ্রিলে ইডিএফের আকার ৩৫০ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি ডলার করা হয়।
এরপর দফায় দফায় আরও বাড়িয়ে ৭০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। তবে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ডলার সংকট শুরু হওয়ার পর ইডিএফ ঋণ নিরুৎসাহিতে সুদহার বাড়ানো হয়। এরপর গত বছরের মার্চে নানা নিয়মকানুন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূলত আইএমএফের দেওয়া ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের শর্ত পূরণে গত বছরের মাঝামাঝিতে এই তহবিল থেকে ঋণ বিতরণ বন্ধ রাখা হয়। তবে প্রভাবশালীদের তদবিরে এখন আবার সেটি চালু করা হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে এই তহবিলের স্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে ২৬০ কোটি ডলারে।
লুটপাটে এগিয়ে বিসমিল্লাহ ও ক্রিসেন্ট গ্রুপ:
অনিয়ম ও কারসাজি করে জনতা ব্যাংক থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন ক্রিসেন্ট গ্রুপের কর্ণধার এমএ কাদের ও তার ভাই জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজ। তাদের তিনটি প্রতিষ্ঠানও ইডিএফ ঋণের সুবিধাভোগী। জাল-জালিয়াতির আশ্রয়ে রপ্তানি না করেও ভুয়া ডকুমেন্ট দিয়ে এসব ঋণ বের করে নেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ইডিএফ ঋণ আটকে আছে প্রায় ১৭ কোটি ডলার। এ ঋণের সিংহভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রিমেক্স ফুটওয়্যারের নামে ৬ কোটি ১৭ লাখ ডলার, ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টসের নামে ৫ কোটি ৫২ লাখ ডলার ও রূপালী কম্পোজিট লেদার ওয়্যারের নামে ৫ কোটি ১৭ লাখ ডলার বের করে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ভুয়া রপ্তানি বিল তৈরি করে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতাসহ পাঁচটি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া আলোচিত বিসমিল্লাহ গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠান ইডিএফ ঋণেরও সুবিধাভোগী।
এগুলো হলো বিসমিল্লাহ টাওয়েল, হিন্দোলওয়ালী টেক্সটাইল, আলফা কম্পোজিট টাওয়েল ও শাহরীশ কম্পোজিট টাওয়েল।
প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতাসহ কয়েকটি ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১২ কোটি ডলারের ইডিএফ ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে বিসমিল্লাহ টাওয়েলের নামে ৪ কোটি ১৫ লাখ ডলার, আলফা কম্পোজিটে ৫ কোটি ৮১ লাখ ডলার, হিন্দোলওয়ালী টেক্সটাইলে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার ও শাহরীশ কম্পোজিটের নামে ৯৭ লাখ ডলার বের করে নেওয়া হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এসব জালিয়াতির ঘটনা ঘটে।
আকিজের কাছে আটকা ২ কোটি ডলার:
আকিজ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আকিজ জুট মিলসের কাছে ইডিএফের ঋণ আটকে আছে প্রায় ২ কোটি ৮ লাখ ডলার। যোগাযোগ করা হলে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের এমডি মো. আব্দুল জব্বার বলেন, আমি ব্যাংকটিতে এমডি হিসেবে আসার পর নতুন করে কোনো গ্রাহককে ইডিএফ ঋণ দেওয়া হয়নি। আগের বকেয়া ইডিএফ ঋণের অধিকাংশই পরিশোধ করা হয়েছে।
এসবি পুণ্য গ্রুপের পকেটেও গেছে ইডিএফ:
এসবি পুণ্য গ্রুপের শাহজাহান বাবলুও ইডিএফ ঋণের সুবিধাভোগী। তার প্রতিষ্ঠান এসবি এক্সিম বাংলাদেশের কাছে ইডিএফ ঋণের প্রায় ৩ কোটি ১৭ লাখ ডলার আটকে আছে।
তালিকায় নামসর্বস্ব আরও অনেক প্রতিষ্ঠান:
গোলাম ফারুক নামে এক ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন এসকিউ বিরিছিনা এবং মেসার্স এসকিউ সেলসিয়াস লিমিটেডের কাছে আটকা ৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার, হংকং ভিত্তিক মাস্ট গ্রুপের এ দেশীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান লেনি ফ্যাশনস লিমিটেডের কাছে ৩ কোটি ২৬ লাখ ডলার, নর্থপোল বিডির কাছে ১ কোটি ৮ লাখ ডলার, কাদেনা স্পোর্টওয়্যারের কাছে ১ কোটি ডলার, নর্ম আউটফিটের কাছে ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার ডলার, ভালটেক্স ইন্টারন্যাশনালের কাছে ২৮ লাখ ৩২ হাজার ডলার, মোডিস্টি (সিইপিজেড) লিমিটেডের কাছে ২৬ লাখ ২৪ হাজার ডলার,
মেসার্স এস এন ফ্যাশনের ১৬ লাখ ২৪ হাজার ডলার, আনোয়ার ফ্যাশনের ১০ লাখ ৮৫ হাজার ডলার, শিলা এগ্রো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ১০ লাখ ৬৯ হাজার ডলার, মেসার্স রিপন ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ১০ লাখ ৬২ হাজার ডলার, এঅ্যান্ডবি আউটওয়্যারের ৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার, এমএন নিটওয়্যারে ৬ লাখ ৮৯ হাজার ডলার, পদ্মা ওয়্যারসের ৬ লাখ ১০ হাজার ডলার, মডিস্টি বাংলাদেশের কাছে ৫ লাখ ২৮ হাজার ডলার আটকে রয়েছে। তথ্য সুত্র
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ

























