সুপারি চাষ পদ্ধতি
- আপডেট সময় : ০৪:৪৫:২৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২২ ১৫২২ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে সুপারি অন্যতম। আদিকাল থেকেই এদেশের মানুষ পানের সাথে অপরিহার্য উপাদান হিসেবে সুপারি ব্যবহার করে আসছে। বর্তমানে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাসহ দেশের উচু সব স্থানে কিছু পরিমাণ সুপারির চাষ হয়ে থাকে।
উৎপত্তি ও বিস্তার: পাক-ভারত উপ-মহাদেশকেই সুপারির উৎপত্তিস্থল বলা হলেও বাণিজ্যিকভাবে প্রধানত বাংলাদেশ ও ভারতেই সুপারির চাষ করা হয়। বাংলাদেশে উৎপাদিত সুপারির বেশী দক্ষিণাঞ্চলের জেলা সমূহে জন্মে থাকে। সুপারি উৎপাদনের অন্যতম জেলাগুলো হলো বরিশাল, খুলনা এবং নোয়াখালী। তবে এখন দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা গুলোতে ব্যাপক ভাবে চাষ হচ্ছে।
ব্যবহার: মুলত পানের সাথেই সুপারি খাওয়া হয়ে থাকে। আহারের পরে অনেকেই মুখের স্বাদ ফিরে পাবার জন্য শুধু সুপারি খেয়ে থাকেন।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে প্রীতিভোজ শেষে পান সুপারি দিয়ে আপ্যায়ন এর একটা রেওয়াজ আছে এবং বাড়িতে মেহমান এলেও পান, সুপারি দিয়ে আপ্যায়িত করা একটি সামাজিক শিষ্টাচার বলে অবিহিত।
বর্তমানে আমাদের দেশে প্রধানত পানের সাথেই সুপারী ব্যবহার করা হয়। বয়স্ক সুপারি গাছ বেড়া, চালা এবং খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সুপারি পাতা বেড়া ও জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সুপারি গাছ বাড়ির শোভাবর্ধন ও বায়ু প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে। আয়ুর্বেদ ঔষধে ব্যবহৃত শুট সুপারি থেকে তৈরী করা হয়ে থাকে।
উন্নত জাত: কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত দু’টি উচ্চ ফলনশীল সুপারির জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যা বারি সুপারি-১ এবং বারি সুপারি-২ হিসেবে পরিচিত। তবে সুপারির উচ্চ ফলনশীল এই জাতগুলোর অপ্রতুলতার কারণে চাষিরা স্থানীয় জাতের সুপারি বেশি পরিমানে চাষ করে থাকেন। এ গুলো আকারে ছোট এবং ফলন কম।
মাটি নির্বাচন: সুপারি চাষের জন্য উর্বর ও মাঝারী ধরনের মাটি অর্থাৎ হালকা বুনটের মাটি উত্তম, তবে বেলে দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। মাটির পিএইচ মান ৫.৫-৬.০ এর মধ্যে হলে সবচেয়ে ভালো হয়।
চারা উৎপাদন পদ্ধতি: বীজ দ্বারা সুপারি গাছের বংশবিস্তার হয়ে থাকে। প্রথমে বীজতলায় বীজ লাগিয়ে চারা উৎপাদন করা হয়। সুপারির চারা বীজতলায় ১-২ বছর রাখার পর নির্দিষ্ট স্থানে লাগাতে হয়। চারা উৎপাদনের জন্য যেসব বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেওয়া দরকার।
জেনে নিন>> একটি উৎকৃষ্ট সবজি চিচিংগা চাষ পদ্ধতি
বীজতলার জন্য মাটি নির্বাচন: দো-আঁশ, পলি দো-আঁশ মাটি বীজতলার জন্য উপযুক্ত। খোলামেলা, সেচের সুবিধা আছে এমন হালকা বুনটের মাটিতে বীজতলা করা উচিত। বীজতলার মাটিতে বালুর পরিমাণ কম থাকলে কিছু ভিটি বালু মিশিয়ে নিলে ভালো হয়। সুপারির বীজতলা আংশিক ছায়াযুক্ত হলে উত্তম।
জমি তৈরি ও সার প্রয়োগ: বীজতলার জমি ৪-৫ বার ভালোভাবে চাষ দিয়ে আগাছা ও আবর্জনা পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। জমিতে মই দিয়ে সমান করে নিতে হবে। জমির উর্বরতা অনুযায়ী হেক্টর প্রতি ১৫-২০ টন গোবর বা জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে, তবে কোনো রাসায়নিক সার প্রয়োগের দরকার নেই।
জেনে নিন>>রসুনের জাত পরিচিতি ও চাষ পদ্ধতি
বীজতলা তৈরি: প্রতিটি বীজতলা ১-১.৫ মিটার চওড়া এবং ৩ মিটার লম্বা হওয়া উচিত। বীজতলা উত্তর দক্ষিণে লম্বা হলে ভালো হয়। দুই বেডের মাঝখানে চলাফেলার জন্য দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ বরাবর ৫০-৭৫ সেমি বা ২০-৩০ ইঞ্চি জায়গা ফাঁকা রাখতে হয়। এরূপ ফাঁকা স্থানের মাটি তুলে নালা তৈরি করতে হবে এবং নালার মাটি বীজতলায় তুলে দিয়ে বীজতলাকে বেড আকারে ৬-৮ সেমি উঁচু করতে হবে। নালাগুলোর মধ্যে দিয়ে সেচ ও নিকাশের সুবিধা পাওয়া যায় এবং চারার পরিচর্যা করা সহজ হয়।
বীজ রোপণ: বীজ সংগ্রহ করার পর দেরী না করে বীজতলায় বীজ রোপণ করতে হবে। রোপণের সময় সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেমি বা ১২ ইঞ্চি এবং বীজ থেকে বীজের দূরত্ব হবে ২৫ সেমি বা ১০ ইঞ্চি। ১-২ সেমি. গভীরে এমনভাবে রোপণ করতে হবে যাতে বীজটি মাটির সামান্য নিচে থাকে এবং বীজের উপরে মাটির একটা পাতলা আবরণ থাকে।
রোপণ পরবর্তী যত্ন: রোপণের পরপরই উপরে ছায়া দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া উচিত। খুড়কুটো বা কচুরীপানা দিয়ে বীজতলা ঢেকে রেখে অর্থাৎ মালচিং করে মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখা দরকার।
বীজতলা সবসময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে এবং অবশ্যই বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে গরু ছাগল চারা নষ্ট করতে না পারে।
জেনে নিন> আধুনিক পদ্ধতিতে হাইব্রিড মরিচ চাষ পদ্ধতি
ভালো চারা বাছাই: বীজ লাগানোর পর তিন মাসের মধ্যে যে সকল বীজ গজায় সেগুলো থেকে ভালো চারা পাওয়া যায়। রোপণের পর সে সকল চারা তাড়াতাড়ি গজায়, দ্রুত বাড়ে, গোড়া মোটা হয়, পাতা ও শিকড় বেশি হয় এসব চারা বাছাই করা উত্তম। চারার বয়স ৬ মাস হলেই বাগানের লাগানো যায়। তবে ১২-১৮ মাস বয়সের চারা, যেগুলো খাটো ও মোটা এবং কমপক্ষে ৫-৬টি পাতা থাকে এমন ধরনের চারা মাঠে লাগানোর জন্য বাছাই করা দরকার।
জমি নির্বাচন: সাধারণত আমাদের দেশে বসতবাড়ির আশপাশে, পুকুরের পাড়ে, রাস্তার ধারে স্কুল-কলেজের আঙ্গিনায় সুপারী গাছ লাগানো হয়। তবে সুপারীর বাগান করতে হলে বাগানের জমি সঠিকভাবে নির্বাচন করতে হবে। সুনিষ্কাশিত, উর্বর, কিছুটা ছায়াযুক্ত, তীব্র বাতাস প্রতিরোধী এবং উঁচু জায়গায় বাগানের জন্যে নির্বাচন করা উচিত। জমিতে যেন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় এমন জমি নির্বাচন করতে হবে।
জমি তৈরি এবং চারা রোপণ: ছোট অবস্থায় সুপারি গাছ তীব্র বাতাস এবং প্রখর সূর্যালোক সহ্য করতে পারে না। কাজেই সুপারির চারা মাঠে লাগানোর পূর্বেই ছায়া প্রদানকারী গাছ রোপণ করতে হবে। সুপারির চারা সাধারণত মাদা তৈরি করে লাগানো হয়।
মাদার আকার ৭০ সেমি. x ৭০ সেমি. x ৭০ সেমি হলে ভালো হয়। মাদা তৈরি করার সময় উপরের মাটি একদিকে এবং নিচের মাটি অন্যদিকে আলাদা করে রাখতে হবে।
গর্তের ভেতরটা শুকনো পাতা, খড় এসব দিয়ে ভরাট করে আগুনে পুড়িয়ে দিলে গর্তটা শোধন হয়ে যাবে। প্রতিটি গর্তের জন্যে ১০ কেজি পচা গোবর বা কম্পোস্ট এবং ১ কেজি খৈল গর্তের উপরের অর্ধেক মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে গর্তের তিন-চতুর্থাংশ ঐ মাটি দ্বারা ভরে ফেলতে হবে। সাধারণত মে থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত চারা রোপণ করা যায়।
জুন-জুলাই মাস চারা রোপণের জন্য উত্তম। মাদার দূরত্ব অর্থাৎ চারার দূরত্ব বর্গাকার পদ্ধতিতে ৪ হাত এবং আয়াতাকার পদ্ধতিতে লাইন থেকে লাইন ৮ হাত এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৪ হাত
সাথী ফসল চাষ: সুপারি বাগানে সাথী ফসল হিসাবে পান, চুই ঝাল, আদা, হলুদ,ওল কচু চাষ করা যায়। গাছ থেকে গাছের দুরত্ব ৫ হাত করলে সাথী ফল গাছ হিসাবে লেবু, লটকন, জাম্বুরা বা বাতাবী লেবু, মাল্টা ও কমলা চাষ করা যায়। বাগানে সাথী ফসল চাষ করলে অধিক পরিমান আয় করা যাবে।
অর্ন্তবর্তীকালীন পরিচর্যা: চারা রোপণের পর বিভিন্ন ধরনের অর্ন্তবর্তীকালীন পরিচর্যা প্রয়োজন। খরা মৌসুমে কয়েক বার সেচ দেয়া, গাছের গোড়া সব সময় আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। এবং প্রতি বছর বর্ষার পুর্বে জমিতে বোরণ ও জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে।
পড়ুন>> বৈশাখ (মধ্য এপ্রিল-মধ্য মে) মাসের কৃষিকাজ
পড়ুন>> চৈত্র মাসের কৃষি
পড়ুন>> ফাল্গুন মাসের কৃষি কাজ
পড়ুন>> আশ্বিন (মধ্য সেপ্টেম্বর – মধ্য অক্টোবর) মাসে কৃষকের করণীয়
পড়ুন>> ভাদ্র (মধ্য আগস্ট–মধ্য সেপ্টেম্বর) মাসের কৃষি ও কৃষকের করণীয়
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ






















