ঢাকা ০৫:২৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লাল কুপরী আলু (Red Skin Potato বা Red Coupery Potato) চাষ পদ্ধতি

সৃষ্টি কৃষি ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৪:২৫:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫ ৩১৪ বার পড়া হয়েছে

লাল কুপরী আলু (Red Skin Potato বা Red Coupery Potato) চাষ পদ্ধতি

(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

 

লাল কুপরী আলু (Red Skin Potato বা Red Coupery Potato) চাষ পদ্ধতি

 

 

লাল কুপরী আলু (Red Skin Potato বা Red Coupery Potato) একটি বিশেষ জাতের আলু। এই আলু মূলত পাতলা লাল চামড়ার একটি জাত, যার মসৃণ গঠন এবং কম পানিযুক্ত কন্দ রন্ধনযোগ্যতা ও বাজারমূল্য—উভয় ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধা এনে দেয়। এই জাতটি দ্রুতবর্ধনশীল এবং ভালোভাবে সংরক্ষণযোগ্য।

 

এখন এটি বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সৃষ্টি হয়েছে লাল পাকড়ি আলু চাষে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। বাংলাদেশের কৃষিতে আলুর ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। তার মধ্যে একটি জনপ্রিয় এবং উচ্চ চাহিদা সম্পন্ন জাত হলো লাল পাকড়ি আলু। এর লালচে রঙ, সুস্বাদু গুণাগুণ ও সংরক্ষণ ক্ষমতা একে কৃষকদের কাছে বিশেষভাবে প্রিয় করে তুলেছে। শুধু তাই নয়, দেশীয় বাজারে ও রপ্তানিতে এই জাতের আলুর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

জাত পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য:

বর্তমানে বাংলাদেশে লাল কুপরী আলুর কয়েকটি ধরণের চাষ হয়ে থাকে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১. কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জাত:

কুপারী লাল-১ (Coupery Red-1): বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) কর্তৃক উন্নত একটি জাত, যা দেশের আবহাওয়ার উপযোগী।

 

BARI আলু-২৫ (Lal Shada): এটি একধরনের লাল খোসার আলু, যার মাংস সাদা হয়।

২. বিদেশি জাত (স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত):

Desiree: নেদারল্যান্ডস জাতের একটি বিখ্যাত লাল কুপরী আলু যা অনেক কৃষক ট্রায়াল বেসিসে চাষ করছেন।

Laura ও Norland: এগুলোও বিদেশি জাত, কিছু অঞ্চলে সীমিতভাবে চাষ হচ্ছে।

৩. স্থানীয় জাত (স্থানীয় নাম অনুযায়ী পরিচিত):

কিছু কিছু স্থানীয় জাত বা সংকর জাত রয়েছে যেগুলোকে কৃষকরা নিজেদের মতো করে লাল কুপরী নাম দিয়ে থাকেন, যেমন: লাল চন্দ্রমুখী,
লাল দেশি কুপরী। তবে মেহেরপুরের লাল জাত (স্থানভেদে আলাদা বৈশিষ্ট্য)।

উপযুক্ত পরিবেশ ও মাটি

এই আলু সাধারণত শীত প্রধান রবি মৌসুমে ভালো জন্মে। বেলে দোঁআশ ও দোঁআশ মাটি এর জন্য সবচেয়ে উপযোগী। মাটির pH মান ৫.৫ থেকে ৬.৮ হলে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়।

জেনে নিন>>আলুর ভাইরাস জনিত রোগ Diseases caused by potato virus

চাষের ধাপ ও প্রযুক্তি

জমি প্রস্তুতি

জমি ৩-৪ বার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করতে হয়। প্রয়োজনে আগাছা দমন করে জৈব সার মিশিয়ে দিতে হয়।

বীজ ও রোপণ

৩৫–৫০ গ্রাম ওজনের সুস্থ কন্দ ব্যবহার করতে হবে। এক হেক্টর জমিতে প্রায় ২৫০০–৩০০০ কেজি বীজ আলু প্রয়োজন হয়।

রোপণের দূরত্ব:

সারি থেকে সারি: ৫০–৬০ সেমি
গাছ থেকে গাছ: ২০–২৫ সেমি

সার ব্যবস্থাপনা

উন্নত ফলনের জন্য নিচের পরিমাণে সার প্রয়োজন হয় (প্রতি হেক্টরে):

সার পরিমাণ

পচা গোবর ১০–১৫ টন
ইউরিয়া ২৫০–৩০০ কেজি
টিএসপি ২০০–২৫০ কেজি
এমওপি ১৫০–২০০ কেজি
জিপসাম ৮০ কেজি
জিংক সালফেট ৫–৭ কেজি

জেনে নিন>> পটল চাষ: এক বার রোপণ করলে টানা চার বছর বিক্রি

সেচ ও আগাছা নিয়ন্ত্রণ

প্রয়োজনে ২–৩ বার সেচ দেওয়া উচিত। প্রথম সেচ ১০ দিন পর, দ্বিতীয় সেচ ৩০–৩৫ দিন পর এবং টিউবার গঠনের সময় তৃতীয় সেচ প্রয়োজন হয়।

রোগবালাই ও প্রতিকার

পাতা পোড়া রোগ (Late Blight):

লালচে-বাদামি দাগ পড়ে পাতা পচে যায়।
প্রতিকার: ম্যানকোজেব বা রিডোমিল গোল্ড স্প্রে।

জাবপোকা ও পাতা খেকো পোকা:

পাতা খেয়ে ফেলে বা রস চুষে গাছ দুর্বল করে।
প্রতিকার: ইমিডাক্লোপ্রিড বা সাইপারমেথ্রিন স্প্রে।

ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

গাছের পাতা শুকিয়ে গেলে আলু সংগ্রহের উপযুক্ত সময়। সংগ্রহের পরে আলুগুলো ছায়ায় শুকিয়ে ঠান্ডা, শুষ্ক ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

লাল পাকড়ি আলু একদিকে যেমন উচ্চফলনশীল, তেমনি বাজারে চাহিদা থাকায় লাভজনকও। প্রতি হেক্টরে ২৫–৩৫ টন ফলন পাওয়া সম্ভব। সময়মতো পরিচর্যা ও রোগ দমন করলে এই আলু চাষে খরচের তুলনায় দ্বিগুণ আয় সম্ভব।

উপসংহার

লাল পাকড়ি আলু চাষ শুধুই একটি কৃষিকাজ নয়, এটি হতে পারে একজন কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার। সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো এই জাতের আলু চাষে আরও উৎসাহ দিলে একে দেশের অন্যতম রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব।

আপনার অঞ্চলে যদি লাল পাকড়ি জাতের আলু চাষ না হয়ে থাকে, তবে স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ গ্রহণ করে চাষ শুরু করুন।

 

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

লাল কুপরী আলু (Red Skin Potato বা Red Coupery Potato) চাষ পদ্ধতি

আপডেট সময় : ০৪:২৫:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫

 

 

লাল কুপরী আলু (Red Skin Potato বা Red Coupery Potato) চাষ পদ্ধতি

 

 

লাল কুপরী আলু (Red Skin Potato বা Red Coupery Potato) একটি বিশেষ জাতের আলু। এই আলু মূলত পাতলা লাল চামড়ার একটি জাত, যার মসৃণ গঠন এবং কম পানিযুক্ত কন্দ রন্ধনযোগ্যতা ও বাজারমূল্য—উভয় ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধা এনে দেয়। এই জাতটি দ্রুতবর্ধনশীল এবং ভালোভাবে সংরক্ষণযোগ্য।

 

এখন এটি বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সৃষ্টি হয়েছে লাল পাকড়ি আলু চাষে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। বাংলাদেশের কৃষিতে আলুর ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। তার মধ্যে একটি জনপ্রিয় এবং উচ্চ চাহিদা সম্পন্ন জাত হলো লাল পাকড়ি আলু। এর লালচে রঙ, সুস্বাদু গুণাগুণ ও সংরক্ষণ ক্ষমতা একে কৃষকদের কাছে বিশেষভাবে প্রিয় করে তুলেছে। শুধু তাই নয়, দেশীয় বাজারে ও রপ্তানিতে এই জাতের আলুর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

জাত পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য:

বর্তমানে বাংলাদেশে লাল কুপরী আলুর কয়েকটি ধরণের চাষ হয়ে থাকে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১. কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জাত:

কুপারী লাল-১ (Coupery Red-1): বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) কর্তৃক উন্নত একটি জাত, যা দেশের আবহাওয়ার উপযোগী।

 

BARI আলু-২৫ (Lal Shada): এটি একধরনের লাল খোসার আলু, যার মাংস সাদা হয়।

২. বিদেশি জাত (স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত):

Desiree: নেদারল্যান্ডস জাতের একটি বিখ্যাত লাল কুপরী আলু যা অনেক কৃষক ট্রায়াল বেসিসে চাষ করছেন।

Laura ও Norland: এগুলোও বিদেশি জাত, কিছু অঞ্চলে সীমিতভাবে চাষ হচ্ছে।

৩. স্থানীয় জাত (স্থানীয় নাম অনুযায়ী পরিচিত):

কিছু কিছু স্থানীয় জাত বা সংকর জাত রয়েছে যেগুলোকে কৃষকরা নিজেদের মতো করে লাল কুপরী নাম দিয়ে থাকেন, যেমন: লাল চন্দ্রমুখী,
লাল দেশি কুপরী। তবে মেহেরপুরের লাল জাত (স্থানভেদে আলাদা বৈশিষ্ট্য)।

উপযুক্ত পরিবেশ ও মাটি

এই আলু সাধারণত শীত প্রধান রবি মৌসুমে ভালো জন্মে। বেলে দোঁআশ ও দোঁআশ মাটি এর জন্য সবচেয়ে উপযোগী। মাটির pH মান ৫.৫ থেকে ৬.৮ হলে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়।

জেনে নিন>>আলুর ভাইরাস জনিত রোগ Diseases caused by potato virus

চাষের ধাপ ও প্রযুক্তি

জমি প্রস্তুতি

জমি ৩-৪ বার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করতে হয়। প্রয়োজনে আগাছা দমন করে জৈব সার মিশিয়ে দিতে হয়।

বীজ ও রোপণ

৩৫–৫০ গ্রাম ওজনের সুস্থ কন্দ ব্যবহার করতে হবে। এক হেক্টর জমিতে প্রায় ২৫০০–৩০০০ কেজি বীজ আলু প্রয়োজন হয়।

রোপণের দূরত্ব:

সারি থেকে সারি: ৫০–৬০ সেমি
গাছ থেকে গাছ: ২০–২৫ সেমি

সার ব্যবস্থাপনা

উন্নত ফলনের জন্য নিচের পরিমাণে সার প্রয়োজন হয় (প্রতি হেক্টরে):

সার পরিমাণ

পচা গোবর ১০–১৫ টন
ইউরিয়া ২৫০–৩০০ কেজি
টিএসপি ২০০–২৫০ কেজি
এমওপি ১৫০–২০০ কেজি
জিপসাম ৮০ কেজি
জিংক সালফেট ৫–৭ কেজি

জেনে নিন>> পটল চাষ: এক বার রোপণ করলে টানা চার বছর বিক্রি

সেচ ও আগাছা নিয়ন্ত্রণ

প্রয়োজনে ২–৩ বার সেচ দেওয়া উচিত। প্রথম সেচ ১০ দিন পর, দ্বিতীয় সেচ ৩০–৩৫ দিন পর এবং টিউবার গঠনের সময় তৃতীয় সেচ প্রয়োজন হয়।

রোগবালাই ও প্রতিকার

পাতা পোড়া রোগ (Late Blight):

লালচে-বাদামি দাগ পড়ে পাতা পচে যায়।
প্রতিকার: ম্যানকোজেব বা রিডোমিল গোল্ড স্প্রে।

জাবপোকা ও পাতা খেকো পোকা:

পাতা খেয়ে ফেলে বা রস চুষে গাছ দুর্বল করে।
প্রতিকার: ইমিডাক্লোপ্রিড বা সাইপারমেথ্রিন স্প্রে।

ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

গাছের পাতা শুকিয়ে গেলে আলু সংগ্রহের উপযুক্ত সময়। সংগ্রহের পরে আলুগুলো ছায়ায় শুকিয়ে ঠান্ডা, শুষ্ক ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

লাল পাকড়ি আলু একদিকে যেমন উচ্চফলনশীল, তেমনি বাজারে চাহিদা থাকায় লাভজনকও। প্রতি হেক্টরে ২৫–৩৫ টন ফলন পাওয়া সম্ভব। সময়মতো পরিচর্যা ও রোগ দমন করলে এই আলু চাষে খরচের তুলনায় দ্বিগুণ আয় সম্ভব।

উপসংহার

লাল পাকড়ি আলু চাষ শুধুই একটি কৃষিকাজ নয়, এটি হতে পারে একজন কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার। সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো এই জাতের আলু চাষে আরও উৎসাহ দিলে একে দেশের অন্যতম রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব।

আপনার অঞ্চলে যদি লাল পাকড়ি জাতের আলু চাষ না হয়ে থাকে, তবে স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ গ্রহণ করে চাষ শুরু করুন।

 

Facebook Comments Box