ঢাকা ১০:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
এনসিসি ব্যাংকে শাখা ব্যবস্থাপক পদে নিয়োগ তাড়াশ উপজেলা শিক্ষক-কর্মচারী কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিঃ পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন রাণীশংকৈলে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন দোহা–রিয়াদ রুটে কাতার এয়ারওয়েজের একাধিক ফ্লাইট বাতিল বিরল ও পীরগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির পৃথক অভিযানে ইয়াবা ও মদ উদ্ধার রাণীশংকৈলে দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা, ৫৫ মণ্ডপের নিরাপত্তায় জোর মাদরাসার সাবেক উপাধ্যক্ষের পেনশন বণ্টন নিয়ে পরিবারের বিরোধ তাহিরপুরে থমকে গেছে ছাত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগের বিচার দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও স্থানীয় সরকারব্যবস্থা জনগণের কাছে ফেরাতে চায় সরকার: মঈন খান

গারো পাহাড়ের বন দখল, সীমান্তে প্রতিবন্ধকতা আর প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় বিপন্ন মানুষ ও বন্যপ্রাণী

মোখলেছুর রহমান
  • আপডেট সময় : ০৮:০২:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে

গারো পাহাড়ের বন দখল, সীমান্তে প্রতিবন্ধকতা আর প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় বিপন্ন মানুষ ও বন্যপ্রাণী

(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

 

গারো পাহাড়ের বন দখল, সীমান্তে প্রতিবন্ধকতা আর প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় বিপন্ন মানুষ ও বন্যপ্রাণী

 

 

গারো পাহাড়ে প্রায় ১৫০ বন্যহাতির আটকে পড়ার ঘটনা নিছক বন্যপ্রাণীর সংকট নয়; এটি বন সংরক্ষণ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতারও কঠিন পরীক্ষা। ভারতের মেঘালয় থেকে আসা হাতির পাল দীর্ঘদিন ধরে শেরপুর ও জামালপুরের গারো পাহাড়ি এলাকায় বিচরণ করছে। সীমান্তের গেট বন্ধ থাকায় তাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, বনভূমি সংকুচিত হওয়া ও খাদ্যসংকটে হাতিগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসল, বাড়ছে প্রাণহানি।

 

 

 

বন্যহাতি মানুষের শত্রু নয়। খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে তারা লোকালয়ে প্রবেশ করে। অথচ মানুষের তৈরি প্রতিবন্ধকতা, বনভূমি দখল এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের মূল্য দিতে হচ্ছে মানুষ ও হাতি—উভয়কেই। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে হাতির হামলায় ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন মানুষ ও চারটি হাতি। এই পরিসংখ্যান শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নয়, দীর্ঘদিনের অকার্যকর ব্যবস্থাপনারও সতর্কবার্তা।

 

 

গারো পাহাড়ের সংরক্ষিত বনাঞ্চল দখলমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। বনভূমি উদ্ধার করে সেখানে হাতির উপযোগী প্রাকৃতিক খাদ্য ও পানির উৎস ফিরিয়ে আনতে হবে। বন উজাড় ও অবৈধ দখল চলতে দিয়ে শুধু হাতির হামলা ঠেকানোর উদ্যোগ নিলে সমস্যার মূলে পৌঁছানো যাবে না। একই সঙ্গে হাতির চলাচলের ঐতিহ্যগত পথ চিহ্নিত করে তা নিরাপদ রাখতে হবে। অভয়ারণ্য ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; তার কার্যকর ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।

 

সীমান্তের গেট বন্ধ থাকলে হাতির চলাচল কীভাবে নিশ্চিত হবে, আর হাতি লোকালয়ে ঢুকলে মানুষের নিরাপত্তাই বা কীভাবে রক্ষা পাবে? সীমান্ত নিরাপত্তার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দুই দেশকে জরুরি আলোচনায় বসতে হবে। ২০২০ সালে আন্তঃসীমান্ত হাতি সংরক্ষণ নিয়ে স্বাক্ষরিত প্রটোকলের বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কাগজে-কলমে সমঝোতা নয়, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়নই এখন জরুরি।

 

 

 

এদিকে, হাতির হামলায় সর্বস্ব হারানো কৃষকের দুর্ভোগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ফসল নষ্ট হওয়ার পর ক্ষতিপূরণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানি তাঁদের ক্ষোভ বাড়ায়। ক্ষতিপূরণ দিতে হবে দ্রুত, সহজ প্রক্রিয়ায় ও স্বচ্ছতার সঙ্গে। হাতি সংরক্ষণের দায়িত্ব পালনের নামে স্থানীয় মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা যায় না।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রীর গারো পাহাড় পরিদর্শন তাই শুধু আনুষ্ঠানিক সফর হলে চলবে না। এই সফর থেকে বনভূমি উদ্ধারের সময়বদ্ধ পরিকল্পনা, হাতির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ভারতের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণের সুস্পষ্ট ঘোষণা আসা উচিত। হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে এআই-ভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ ইতিবাচক; কিন্তু

মনে রাখতে হবে, হাতির পথ বন্ধ করে সংঘাত ঠেকানো যায় না; বরং সংঘাত আরও বাড়তে পারে। বন ধ্বংস করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্ভব নয়, আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে অবহেলায় রেখে পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যও অর্জন করা যাবে না।

 

 

এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। গারো পাহাড়ের বন দখলমুক্ত করতে হবে, হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ ফিরিয়ে দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। অন্যথায়, প্রতিটি হাতির হামলার পর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হবে, প্রাণহানির খবর আসবে, কিন্তু সংকটের স্থায়ী সমাধান মিলবে না।

প্রশ্নটি তাই শুধু ১৫০ হাতি কোথায় যাবে, তা নয়; প্রশ্ন হলো, মানুষ ও বন্যপ্রাণীকে রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো আর কত দিন নিষ্ক্রিয় থাকবে?

 

 

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

গারো পাহাড়ের বন দখল, সীমান্তে প্রতিবন্ধকতা আর প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় বিপন্ন মানুষ ও বন্যপ্রাণী

আপডেট সময় : ০৮:০২:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

 

 

গারো পাহাড়ের বন দখল, সীমান্তে প্রতিবন্ধকতা আর প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় বিপন্ন মানুষ ও বন্যপ্রাণী

 

 

গারো পাহাড়ে প্রায় ১৫০ বন্যহাতির আটকে পড়ার ঘটনা নিছক বন্যপ্রাণীর সংকট নয়; এটি বন সংরক্ষণ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতারও কঠিন পরীক্ষা। ভারতের মেঘালয় থেকে আসা হাতির পাল দীর্ঘদিন ধরে শেরপুর ও জামালপুরের গারো পাহাড়ি এলাকায় বিচরণ করছে। সীমান্তের গেট বন্ধ থাকায় তাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, বনভূমি সংকুচিত হওয়া ও খাদ্যসংকটে হাতিগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসল, বাড়ছে প্রাণহানি।

 

 

 

বন্যহাতি মানুষের শত্রু নয়। খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে তারা লোকালয়ে প্রবেশ করে। অথচ মানুষের তৈরি প্রতিবন্ধকতা, বনভূমি দখল এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের মূল্য দিতে হচ্ছে মানুষ ও হাতি—উভয়কেই। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেরপুরে হাতির হামলায় ৪৩৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন মানুষ ও চারটি হাতি। এই পরিসংখ্যান শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নয়, দীর্ঘদিনের অকার্যকর ব্যবস্থাপনারও সতর্কবার্তা।

 

 

গারো পাহাড়ের সংরক্ষিত বনাঞ্চল দখলমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। বনভূমি উদ্ধার করে সেখানে হাতির উপযোগী প্রাকৃতিক খাদ্য ও পানির উৎস ফিরিয়ে আনতে হবে। বন উজাড় ও অবৈধ দখল চলতে দিয়ে শুধু হাতির হামলা ঠেকানোর উদ্যোগ নিলে সমস্যার মূলে পৌঁছানো যাবে না। একই সঙ্গে হাতির চলাচলের ঐতিহ্যগত পথ চিহ্নিত করে তা নিরাপদ রাখতে হবে। অভয়ারণ্য ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; তার কার্যকর ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।

 

সীমান্তের গেট বন্ধ থাকলে হাতির চলাচল কীভাবে নিশ্চিত হবে, আর হাতি লোকালয়ে ঢুকলে মানুষের নিরাপত্তাই বা কীভাবে রক্ষা পাবে? সীমান্ত নিরাপত্তার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দুই দেশকে জরুরি আলোচনায় বসতে হবে। ২০২০ সালে আন্তঃসীমান্ত হাতি সংরক্ষণ নিয়ে স্বাক্ষরিত প্রটোকলের বাস্তব অগ্রগতি পর্যালোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কাগজে-কলমে সমঝোতা নয়, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়নই এখন জরুরি।

 

 

 

এদিকে, হাতির হামলায় সর্বস্ব হারানো কৃষকের দুর্ভোগও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ফসল নষ্ট হওয়ার পর ক্ষতিপূরণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানি তাঁদের ক্ষোভ বাড়ায়। ক্ষতিপূরণ দিতে হবে দ্রুত, সহজ প্রক্রিয়ায় ও স্বচ্ছতার সঙ্গে। হাতি সংরক্ষণের দায়িত্ব পালনের নামে স্থানীয় মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা যায় না।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রীর গারো পাহাড় পরিদর্শন তাই শুধু আনুষ্ঠানিক সফর হলে চলবে না। এই সফর থেকে বনভূমি উদ্ধারের সময়বদ্ধ পরিকল্পনা, হাতির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ভারতের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণের সুস্পষ্ট ঘোষণা আসা উচিত। হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে এআই-ভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ ইতিবাচক; কিন্তু

মনে রাখতে হবে, হাতির পথ বন্ধ করে সংঘাত ঠেকানো যায় না; বরং সংঘাত আরও বাড়তে পারে। বন ধ্বংস করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্ভব নয়, আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে অবহেলায় রেখে পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যও অর্জন করা যাবে না।

 

 

এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। গারো পাহাড়ের বন দখলমুক্ত করতে হবে, হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ ফিরিয়ে দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। অন্যথায়, প্রতিটি হাতির হামলার পর ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হবে, প্রাণহানির খবর আসবে, কিন্তু সংকটের স্থায়ী সমাধান মিলবে না।

প্রশ্নটি তাই শুধু ১৫০ হাতি কোথায় যাবে, তা নয়; প্রশ্ন হলো, মানুষ ও বন্যপ্রাণীকে রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো আর কত দিন নিষ্ক্রিয় থাকবে?

 

 

Facebook Comments Box