প্রতি বছরের মতো এবারও বিজ্ঞানের জগতে এমন কিছু গবেষণার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা প্রথমে মানুষকে হাসায় এবং পরে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। গত বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ৩৬তম ইগ নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পুরস্কারটি মূলত নোবেল পুরস্কারের একটি চমৎকার প্যারোডি হিসেবে পরিচিত।
ইমপ্রোবাবেল রিসার্চের আয়োজনে গত ৩৫ বছর ধরে এই পুরস্কারটি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন থেকে দেওয়া হলেও, এ বছর স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। ‘দ্য অ্যানালস অব ইমপ্রোবাবেল রিসার্চ’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক মার্ক আব্রাহাম জানিয়েছেন, গত এক বছরে অতিথিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করা অনিরাপদ হয়ে ওঠায় জুরিখে এই আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বিজ্ঞানীরা তাঁদের গবেষণার তথ্য উপস্থাপনের সময় একবার ২৪ সেকেন্ড এবং দ্বিতীয়বার মাত্র সাতটি শব্দ ব্যবহার করেছেন।
বায়োমেকানিকস বিভাগে এ বছর চুম্বনের সংজ্ঞা নিয়ে গবেষণার জন্য সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানী মাটিল্ডা বৃন্দল, ক্যাথরিন ট্যালবট এবং স্টুয়ার্ট ওয়েস্ট তাঁদের গবেষণায় দাবি করেছেন যে, পিঁপড়া, পাখি, মেরুভালুক ও মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট নড়াচড়া এবং খাদ্য স্থানান্তর ছাড়া মুখোমুখি অহিংস পারস্পরিক ক্রিয়াকেই চুম্বন বলা যায়। বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চুম্বনের এই নতুন সংজ্ঞাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন গবেষকরা।
অর্থনীতি বিভাগে ইগ নোবেল পেয়েছেন পল পিফ, ড্যানিয়েল স্টানকাটো, স্টেফান কোটে, রোডোলফো মেনডোজা-ডেন্টন ও ড্যাচার কেল্টনার। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা শিশুদের হাত থেকে চকলেট ছিনিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখান। বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে, উচ্চবিত্তরা তুলনামূলকভাবে অনৈতিক আচরণে বেশি অভ্যস্ত।
রসায়ন বিভাগে সম্মাননা পেয়েছেন সঞ্চলারি ব্যানার্জি, নাথান কৌসেন্স, ফ্রাঁসোয়া-জেভিয়ার গ্যালাট, নীতিশ সত্যনারায়ণন, জন্ধ্যাম শ্রীকান্ত, কোইচিরো ইয়াগি, জেমস গ্রে, স্টিফেন টোবে, বারবারা স্টে, লিওনার্ড চাভাস ও সুব্রমানিয়াম রামাস্বামী। তাঁরা আবিষ্কার করেছেন যে, জীবন্ত প্রসবকারী তেলাপোকার প্রজাতি ‘ডিপ্লোপিয়েরা পাঙ্কটাটা’র দুধের প্রোটিন গরুর দুধের তুলনায় তিন গুণ বেশি শক্তি ধারণ করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রয়াত বিজ্ঞানী তোকুজি উন্নোকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। তিনি নাক ঝাড়ার সঠিক কৌশল নিয়ে একটি বায়োডাইনামিক গবেষণা করেছিলেন, যা মূলত জাপানি ভাষায় প্রকাশিত। এতে ইউরোপীয় ও জাপানিদের নাক ঝাড়ার সাংস্কৃতিক পার্থক্যের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
জীববিজ্ঞান বিভাগে জোয়াও মিগুয়েল আলভেস-নুনেস, আদ্রিয়ানো ফেলোনে, সেলমা মারিয়া আলমেইডা-সান্তোস, কার্লোস রবার্তো ডি মেইডেরোস, ইভান সাজিমা ও ওতাভিও অগাস্টো ভুওলো মার্কেস পুরস্কৃত হয়েছেন। গবেষণার সময় তাঁরা ল্যাবে ৭৫টি বিষধর পিট ভাইপারের মুখোমুখি হয়েছিলেন। বিভিন্ন তাপমাত্রায় এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে বিষধর সাপ কেন মানুষকে কামড়াতে প্ররোচিত হয়, তা নিয়ে তাঁরা কাজ করেছেন।
পদার্থবিদ্যায় স্প্ল্যাশমুক্ত মূত্রাগারের নকশা তৈরির জন্য র্যান্ডি হার্ড, ঝাও প্যান, ট্যাড ট্রাসকট ও কাভেশান থুরাইরাজাহ সম্মাননা পেয়েছেন। তাঁদের এই তাত্ত্বিক ও পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা মূত্রাগারের নকশায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রযুক্তি খাতে মশার শুঁড়কে উচ্চ-রেজোল্যুশনের থ্রি–ডি প্রিন্টিং নজেল হিসেবে ব্যবহারের গবেষণাটি পুরস্কৃত হয়েছে। জাস্টিন পুমা, ঝেন ইয়াং, ইভান জনস্টনসহ একদল গবেষক ‘নেক্রোপ্রিন্টিং’ নামের এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন, যা ১৮ থেকে ২২ মাইক্রন রেজোল্যুশনে কাজ করতে সক্ষম।
ঘ্রাণবিদ্যায় ইলোনা ক্রয়, টমাজ ফ্র্যাকোভিয়াক, থমাস হুমেল ও অগ্নিয়েস্কা সোরোকোভস্কা সম্মাননা পেয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, মা–বাবারা তাঁদের শিশুর শরীরের গন্ধকে অত্যন্ত মনোরম মনে করেন, যা মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টারকে সক্রিয় করে। তবে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই অনুভূতি ভিন্ন। ২৩৫ জন মা–বাবার ওপর জরিপ চালিয়ে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
শান্তি বিভাগে জাইমি আরোনা ক্রেমস, রেবেকা হাহনেল-পিটার্স, লরিয়ন মেরি, কিলি উইলিয়ামস ও ড্যানিয়েল সজনসার সম্মাননা পেয়েছেন। তাঁদের মতে, আমরা এমন বন্ধুদের বেশি মূল্যায়ন করি যারা আমাদের অপছন্দের ব্যক্তিদের প্রতি নির্মম আচরণ করে।
মৃত্তিকাবিজ্ঞানে ফ্রাঞ্জ বেন্ডার, মার্সেল ভ্যান ডার হেইডেন, আটলান্ট বিয়েরি ও পিয়া ভিভিয়ানি খেতাব পেয়েছেন। তাঁরা ২৫টির বেশি দেশে অন্তর্বাসের ১ হাজার অভিন্ন জোড়া মাটিতে পুঁতে রেখেছিলেন। দুই মাস পর সেগুলো তুলে পচনের হার পরীক্ষা করে মাটির স্বাস্থ্য ম্যাপ করার একটি নাগরিক বিজ্ঞান প্রকল্প পরিচালনা করেন তাঁরা।
Leave a Reply