সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও জরিমানার ক্ষমতা চায় প্রেস কাউন্সিল
- আপডেট সময় : ০১:৪৪:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন ও অপসাংবাদিকতা রোধের কথা বলে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল নিজেদের আইনি পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি মোট ১৯টি নতুন এখতিয়ার ও ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সাংবাদিকদের নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা অর্জন করা।
প্রেস কাউন্সিলের সচিব ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. আবদুস সবুরের স্বাক্ষর করা এই প্রতিবেদনটি সংসদীয় কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়। কমিটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৪টি সংস্থার কার্যক্রম আরও গতিশীল করার বিষয়ে যে আলোচনা করেছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রেস কাউন্সিল এই লিখিত প্রস্তাব দেয়। তবে সংসদীয় কমিটিতে এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এখনো হয়নি।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালে প্রণীত প্রেস কাউন্সিল আইনটি বর্তমান সময়ের আধুনিক ও স্মার্ট গণমাধ্যমের চাহিদার তুলনায় সেকেলে হয়ে পড়েছে। সংস্থাটির দাবি, জাতীয় অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী সংবাদ প্রকাশ, গুজব ছড়ানো কিংবা ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রচারের ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিলকে সরাসরি বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও জনরুচি পরিপন্থী কোনো প্রতিবেদন প্রকাশের দায়ে আর্থিক জরিমানার বিধান যুক্ত করার পক্ষেও মত দিয়েছে তারা। প্রেস কাউন্সিলের ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বর্তমান অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত ও স্মার্ট, আধুনিক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, মানোন্নয়ন, মান সংরক্ষণসহ অপসাংবাদিকতা ও অপপ্রচার প্রতিরোধে ১৯৭৪ সালের প্রেক্ষাপটে প্রণীত দ্য প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট। বিশেষ করে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হানিকর বা অবমাননাকর বিষয়টি বলা হয়েছে; কিন্তু এর সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।’।
প্রেস কাউন্সিল যে নতুন ক্ষমতাগুলো দাবি করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: সাংবাদিকদের সনদ প্রদান, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, অনলাইন পোর্টালগুলোকে কাউন্সিলের নজরদারিতে আনা এবং সাংবাদিকদের জন্য আচরণবিধি তৈরি করা। একইসঙ্গে, আর্থিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের প্রচারসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লেভি বা চাঁদা আদায়ের সুযোগ চেয়েছেন তারা।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী, কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অভিযোগ করলে আগে সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তা সুরাহার নির্দেশ দেওয়া হবে। তবে কোনো সাংবাদিক একই সঙ্গে একাধিক পেশায় নিয়োজিত থাকলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া জেলা জজ মর্যাদার একজন বিচারককে প্রেস কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে যুক্ত করে বিচারিক ক্ষমতা ব্যবহারের একটি রূপরেখাও দেওয়া হয়েছে সেখানে। গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের নির্দেশ বিটিভিকে।
উল্লেখ্য, এর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সালের জুন মাসে প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের প্রস্তাব উঠলে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজন ব্যাপক সমালোচনা করেছিল। তৎকালীন খসড়ায় স্বপ্রণোদিত হয়ে অপরাধ আমলে নেওয়ার যে ক্ষমতা প্রস্তাব করা হয়েছিল, বর্তমানের প্রস্তাবগুলোকে অনেকেই সেই পুরোনো উদ্যোগেরই পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন। এখন সংস্থাটি আবার যেসব ক্ষমতা চাইছে, তা আগের চেষ্টারই পুনরাবৃত্তি। ২০২২ সালের জুনে সংশোধনীর খসড়া মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রথমে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান প্রস্তাব করা হলেও মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদনের সময় টাকার পরিমাণ বাদ দেওয়া হয়। এসব বিষয়ে আপত্তি তুলে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব বলেছিল, ‘প্রস্তাবিত সংশোধনী অস্পষ্ট এবং তাই অপব্যবহারের সুযোগ আছে।
নোয়াবের সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রেস কাউন্সিলকে এমন আইনি ক্ষমতা দেওয়া স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। তিনি বলেন, বর্তমানে বিদ্যমান ক্ষমতাটুকুও এই প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো প্রয়োগ করতে পারে না, অথচ এখন তাদের আরও কঠোর হওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আইন পরিবর্তনের আগে অংশীজনদের সঙ্গে অবশ্যই আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এখনো একই ধরনের চেষ্টা হলে সেটা হবে দুর্ভাগ্যজনক।
সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ প্রেস কাউন্সিলের এই প্রস্তাবনার সমালোচনা করে বলেন, প্রেস কাউন্সিলকে একটি বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানোর প্রবণতা বাড়ছে, যা বিভ্রান্তিকর। এটি একটি সরকারি সংস্থা, যার ভূমিকা নিয়ে অতীতেই বিতর্ক ছিল। তিনি মনে করেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের যে প্রস্তাব ছিল, বর্তমান সরকারের উচিত সেই প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।
সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধা কিংবা হামলার মতো ঘটনা ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশক বা সম্পাদকের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করা এবং সাংবাদিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তারা নিতে চায়। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বপ্রণোদিত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা পেলে প্রেস কাউন্সিল কার্যত নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিণত হবে, যা মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য বড় হুমকি হতে পারে।
সূত্র: প্রথম আলো
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ























