ঢাকা ১২:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ট্রেনের শেষ বগিতেই ৩৫ বছরের জীবন কাটিয়ে দিলেন সিরাজ মিয়া খুলনায় ১৫ মাস বকেয়া বেতনে ৩০ কর্মীকে ছাঁটাই বিমান কর্মকর্তা তাহসিফ হত্যায় দিশার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর সাজেকে ইউপিডিএফ ও জেএসএসের মধ্যে দেড় ঘণ্টা গোলাগুলি ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে জামানত হারালেন চরমোনাইয়ের প্রার্থীসহ তিনজন প্রতিবন্ধকতা জয় করে পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ: অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে স্বপ্ন ছোঁয়া কলি রানীর গল্প আলোর পথে তিন জেলার ৬৫ জন চরমপন্থীর আত্মসমর্পণ ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, শেফালীর সাফল্যে গর্বিত পরিবার পিংক অক্টোবর শেষ, ক্যানসার চিকিৎসায় বিশেষ কর্মসূচিতে সিএসসিআর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পিসিডিতে ২২০ জনের বড় নিয়োগ

ট্রেনের শেষ বগিতেই ৩৫ বছরের জীবন কাটিয়ে দিলেন সিরাজ মিয়া

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:২৩:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মানুষের জীবনের গল্প নানা রঙের হয়, কিন্তু হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে দেখা পাওয়া ৭০ বছর বয়সী সিরাজ মিয়ার গল্পটি একেবারেই ভিন্ন। জীবনের ৩৫টি বছর তিনি কাটিয়েছেন ট্রেনের শেষ বগির পেছনে ঝুলে। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর গ্রামে হলেও, এখন নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য বা স্থায়ী ঠিকানা বলতে কিছুই নেই তার। ট্রেনের চাকায় ভর করেই চলে তার দৈনন্দিন বেঁচে থাকার লড়াই। মো. মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ ||। জীবনের ৩৫ বছর ধরে ট্রেনের সবশেষ বগীর পেছনে বসে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি। ট্রেনের ভেতরে তখন নানা বয়সী মানুষের ব্যস্ততা-কেউ কর্মস্থলে ছুটছেন, কেউ বাড়ি ফিরছেন, কেউবা যাচ্ছেন প্রিয়জনের কাছে। ট্রেনের ভেতরে যাত্রীদের ভিড় থাকলেও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। কাছে গিয়ে কথা বলতেই বেরিয়ে আসে তার জীবনের নানা অজানা অধ্যায়। আজ এক এলাকায়, কাল হয়তো অন্য কোনো জেলায়- এভাবেই কেটে যায় তার দিন। সিরাজ মিয়ার জীবনে স্থায়ী ঠিকানার চেয়ে পথের গুরুত্বই যেন বেশি। সেই সঙ্গে বদলে যায় তার চারপাশের দৃশ্যপটও। তার জীবনের গল্পে বড় কোনো চাওয়া-পাওয়ার হিসাব নেই।

সিরাজ মিয়ার জীবনযাত্রার সংক্ষিপ্ত তথ্য

  • বর্তমান বয়স: প্রায় ৭০ বছর।
  • ভবঘুরে জীবনের স্থায়িত্ব: প্রায় ৩৫ বছর।
  • প্রধান বাহন: ট্রেনের সবশেষ বগির পেছনের অংশ।
  • মূল ঠিকানা: নির্দিষ্ট নেই, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণ করেন।
  • জীবিকার উৎস: মানুষের দেওয়া আর্থিক সহায়তা।

ট্রেন যখন আপন গতিতে শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে গ্রামের সবুজের বুক চিরে এগিয়ে চলে, তখন ভেতরের যাত্রীরা নিজ নিজ গন্তব্যের সন্ধানে ব্যস্ত থাকেন। অথচ ট্রেনের ঠিক শেষ প্রান্তে বসে সিরাজ মিয়া এক অচেনা জগতের বাসিন্দা হয়ে থাকেন। তার এই অভ্যাস এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মানুষের কাছ থেকে সামান্য আর্থিক সহায়তা নিয়ে তিনি খাবার ও জীবনের অন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করেন। কখনো শহর পেরিয়ে, কখনো গ্রামের বুক চিরে, কখনো সবুজ মাঠের পাশ দিয়ে। আর ট্রেনই হয়ে উঠেছে তার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার প্রধান অবলম্বন। কেউ সাহায্য করলে তা দিয়ে খাবারসহ প্রয়োজনীয় খরচ চালান। কেন এমন ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে চলাচল করেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সিরাজ মিয়া বলেন, “টাকার জন্য নয়, অভ্যাস হয়ে গেছে। এ বিষয়ে তাকে সতর্ক করে প্রশ্ন করা হলে সিরাজ মিয়া বিষয়টি স্বীকার করেন। তার ভাষায়, ঝুঁকি আছে, তা তিনি জানেন। তার জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে অনেক প্রশ্নের জন্ম নেয়।

ঝুঁকিপূর্ণ এই জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি অকপটে জানান, টাকার জন্য তিনি এই পথে নামেননি, বরং এটি তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। সিরাজ মিয়ার ভাষ্যমতে, কিছু করার নেই বলেই তিনি স্বাধীনভাবে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ট্রেনকেই বেছে নিয়েছেন। জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কোনো অভিযোগ বা আক্ষেপের পথ ধরেননি, বরং পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন পুরোপুরি। একসময় হয়ত পরিস্থিতির কারণে এমনভাবে ট্রেনে উঠেছিলেন। তার কথায় কোনো অভিযোগ নেই, নেই কারও প্রতি আক্ষেপও। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—জীবন তাকে যে পথে হাঁটিয়েছে, সেই পথেই তিনি হাঁটতে শিখেছেন।

৭০ বছর বয়সে যখন একজন মানুষের প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয় এবং পরিবারের সান্নিধ্য, তখন সিরাজ মিয়ার জীবন পুরোপুরি রেললাইনের ওপর নির্ভরশীল। সামান্য অসতর্কতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তিনি বগির পেছনে বসে থাকাকেই স্বাচ্ছন্দ্য মনে করেন। শীত-গ্রীষ্ম কিংবা বৃষ্টি উপেক্ষা করে ট্রেন থামলে তিনি নামেন, আবার ট্রেন ছেড়ে দিলে নতুন গন্তব্যে রওনা হন। কোনো স্টেশনে পরিচিত মানুষের দেখা মিলে, আবার কোথাও হয় অজানার সাথে বসবাস। সামান্য অসতর্কতা কিংবা হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ। কোথাও পরিচিত মানুষ মেলে, কোথাও অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা পান।

তার জীবনের বড় কোনো চাওয়াপাওয়ার হিসেব নেই, নেই স্বচ্ছলতার স্বপ্ন।

শায়েস্তাগঞ্জ জংশন থেকে ট্রেন ছাড়ার আগে হুইসেলের শব্দ আর যাত্রীদের কোলাহলে সিরাজ মিয়াকে বেশ নির্বিকার দেখায়।

ট্রেনের চাকায় যখন গতি বাড়ে, তখন তার পৃথিবীও বদলে যেতে থাকে।

ট্রেনের শেষ বগির এই মানুষটির গল্প কোনো স্টেশনেই শেষ হয় না, বরং নতুন কোনো দিনের অপেক্ষায় আবার নতুন পথে চলতে শুরু করে।

জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও তার এই ছুটে চলা যেন এক চিরন্তন ভবঘুরে জীবনগাথা।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • বছরের পর বছর ট্রেনের পেছনে বসে চলতে চলতে তার বয়স বেড়েছে। চুলে পাক ধরেছে, শরীরে এসেছে বয়সের ছাপ। কিন্তু বদলায়নি তার চলার ধরন।
Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ট্রেনের শেষ বগিতেই ৩৫ বছরের জীবন কাটিয়ে দিলেন সিরাজ মিয়া

আপডেট সময় : ১১:২৩:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

মানুষের জীবনের গল্প নানা রঙের হয়, কিন্তু হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে জংশনে দেখা পাওয়া ৭০ বছর বয়সী সিরাজ মিয়ার গল্পটি একেবারেই ভিন্ন। জীবনের ৩৫টি বছর তিনি কাটিয়েছেন ট্রেনের শেষ বগির পেছনে ঝুলে। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর গ্রামে হলেও, এখন নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য বা স্থায়ী ঠিকানা বলতে কিছুই নেই তার। ট্রেনের চাকায় ভর করেই চলে তার দৈনন্দিন বেঁচে থাকার লড়াই। মো. মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ ||। জীবনের ৩৫ বছর ধরে ট্রেনের সবশেষ বগীর পেছনে বসে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি। ট্রেনের ভেতরে তখন নানা বয়সী মানুষের ব্যস্ততা-কেউ কর্মস্থলে ছুটছেন, কেউ বাড়ি ফিরছেন, কেউবা যাচ্ছেন প্রিয়জনের কাছে। ট্রেনের ভেতরে যাত্রীদের ভিড় থাকলেও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। কাছে গিয়ে কথা বলতেই বেরিয়ে আসে তার জীবনের নানা অজানা অধ্যায়। আজ এক এলাকায়, কাল হয়তো অন্য কোনো জেলায়- এভাবেই কেটে যায় তার দিন। সিরাজ মিয়ার জীবনে স্থায়ী ঠিকানার চেয়ে পথের গুরুত্বই যেন বেশি। সেই সঙ্গে বদলে যায় তার চারপাশের দৃশ্যপটও। তার জীবনের গল্পে বড় কোনো চাওয়া-পাওয়ার হিসাব নেই।

সিরাজ মিয়ার জীবনযাত্রার সংক্ষিপ্ত তথ্য

  • বর্তমান বয়স: প্রায় ৭০ বছর।
  • ভবঘুরে জীবনের স্থায়িত্ব: প্রায় ৩৫ বছর।
  • প্রধান বাহন: ট্রেনের সবশেষ বগির পেছনের অংশ।
  • মূল ঠিকানা: নির্দিষ্ট নেই, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণ করেন।
  • জীবিকার উৎস: মানুষের দেওয়া আর্থিক সহায়তা।

ট্রেন যখন আপন গতিতে শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে গ্রামের সবুজের বুক চিরে এগিয়ে চলে, তখন ভেতরের যাত্রীরা নিজ নিজ গন্তব্যের সন্ধানে ব্যস্ত থাকেন। অথচ ট্রেনের ঠিক শেষ প্রান্তে বসে সিরাজ মিয়া এক অচেনা জগতের বাসিন্দা হয়ে থাকেন। তার এই অভ্যাস এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মানুষের কাছ থেকে সামান্য আর্থিক সহায়তা নিয়ে তিনি খাবার ও জীবনের অন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করেন। কখনো শহর পেরিয়ে, কখনো গ্রামের বুক চিরে, কখনো সবুজ মাঠের পাশ দিয়ে। আর ট্রেনই হয়ে উঠেছে তার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার প্রধান অবলম্বন। কেউ সাহায্য করলে তা দিয়ে খাবারসহ প্রয়োজনীয় খরচ চালান। কেন এমন ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে চলাচল করেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সিরাজ মিয়া বলেন, “টাকার জন্য নয়, অভ্যাস হয়ে গেছে। এ বিষয়ে তাকে সতর্ক করে প্রশ্ন করা হলে সিরাজ মিয়া বিষয়টি স্বীকার করেন। তার ভাষায়, ঝুঁকি আছে, তা তিনি জানেন। তার জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে অনেক প্রশ্নের জন্ম নেয়।

ঝুঁকিপূর্ণ এই জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি অকপটে জানান, টাকার জন্য তিনি এই পথে নামেননি, বরং এটি তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। সিরাজ মিয়ার ভাষ্যমতে, কিছু করার নেই বলেই তিনি স্বাধীনভাবে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ট্রেনকেই বেছে নিয়েছেন। জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কোনো অভিযোগ বা আক্ষেপের পথ ধরেননি, বরং পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন পুরোপুরি। একসময় হয়ত পরিস্থিতির কারণে এমনভাবে ট্রেনে উঠেছিলেন। তার কথায় কোনো অভিযোগ নেই, নেই কারও প্রতি আক্ষেপও। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—জীবন তাকে যে পথে হাঁটিয়েছে, সেই পথেই তিনি হাঁটতে শিখেছেন।

৭০ বছর বয়সে যখন একজন মানুষের প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয় এবং পরিবারের সান্নিধ্য, তখন সিরাজ মিয়ার জীবন পুরোপুরি রেললাইনের ওপর নির্ভরশীল। সামান্য অসতর্কতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও তিনি বগির পেছনে বসে থাকাকেই স্বাচ্ছন্দ্য মনে করেন। শীত-গ্রীষ্ম কিংবা বৃষ্টি উপেক্ষা করে ট্রেন থামলে তিনি নামেন, আবার ট্রেন ছেড়ে দিলে নতুন গন্তব্যে রওনা হন। কোনো স্টেশনে পরিচিত মানুষের দেখা মিলে, আবার কোথাও হয় অজানার সাথে বসবাস। সামান্য অসতর্কতা কিংবা হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ। কোথাও পরিচিত মানুষ মেলে, কোথাও অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা পান।

তার জীবনের বড় কোনো চাওয়াপাওয়ার হিসেব নেই, নেই স্বচ্ছলতার স্বপ্ন।

শায়েস্তাগঞ্জ জংশন থেকে ট্রেন ছাড়ার আগে হুইসেলের শব্দ আর যাত্রীদের কোলাহলে সিরাজ মিয়াকে বেশ নির্বিকার দেখায়।

ট্রেনের চাকায় যখন গতি বাড়ে, তখন তার পৃথিবীও বদলে যেতে থাকে।

ট্রেনের শেষ বগির এই মানুষটির গল্প কোনো স্টেশনেই শেষ হয় না, বরং নতুন কোনো দিনের অপেক্ষায় আবার নতুন পথে চলতে শুরু করে।

জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও তার এই ছুটে চলা যেন এক চিরন্তন ভবঘুরে জীবনগাথা।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • বছরের পর বছর ট্রেনের পেছনে বসে চলতে চলতে তার বয়স বেড়েছে। চুলে পাক ধরেছে, শরীরে এসেছে বয়সের ছাপ। কিন্তু বদলায়নি তার চলার ধরন।
Facebook Comments Box