ঢাকা ১১:৩৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
আইনি লড়াই ও এআই আতঙ্ক পেরিয়ে অভিনয়ে তানিয়া চট্টগ্রাম বোর্ডে এইচএসসি পাসের হার ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন আলাভেসকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে আবার জয়ে ফিরল বার্সেলোনা এসএসএস-এ ১৭৮২ পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি কাতারে ৩৩ হাজার প্লটে আধুনিক অবকাঠামোর মেগা পরিকল্পনা পল্টনে সাবেক সিআইডি প্রধানের গাড়ির ধাক্কায় রিকশাচালক আহত, গাড়ি জব্দ ৪ নভেম্বরের মধ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার সম্ভাবনা প্রধানমন্ত্রী |: উদ্যোক্তা তৈরিতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশকে হারিয়ে সিরিজ হোয়াইটওয়াশের লক্ষ্য উইন্ডিজ অধিনায়কের বাসায় ডিজে পার্টি ও মাদক উদ্ধার: অতিরিক্ত ডিআইজি জহির বরখাস্ত

চট্টগ্রাম বোর্ডে এইচএসসি পাসের হার ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩৩:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে। বোর্ডের অধীনে অংশ নেওয়া মোট ৯৬ হাজার ৩ ৩৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৫০ হাজার ১৬২ জন, আর অকৃতকার্য হয়েছেন ৪৬ হাজার ১৭৩ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থীই পাসের মুখ দেখতে পাননি। বোর্ডের গত ১৫ বছরের ইতিহাসে এটিই সর্বনিম্ন পাসের হার। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও নাটকীয়ভাবে কমে ২ হাজার ৯২৯ জনে নেমে এসেছে। গত বছর পাসের হার ছিল ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৬ হাজার ১৩০ জন শিক্ষার্থী। ফলে এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ পয়েন্ট এবং জিপিএ-৫ এর সংখ্যা ৩ হাজার ২০১টি হ্রাস পেয়েছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৬ হাজার ৩৩৫ জনের মধ্যে ফেল করেছে ৪৬ হাজার ১৭৩ জন।

বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ইংরেজি বিষয় থেকে।

ইংরেজিতে মোট পরীক্ষার্থী ৯৯ হাজার ৮৫১ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৬৫ হাজার ৬৭ ৪ জন, ফলে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ৭৭ শতাংশে। কেবল এই একটি বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছেন ৩৪ হাজার ১৭৭ জন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে বাংলায় পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যেখানে অকৃতকার্য হয়েছেন ১৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। দুই আবশ্যিক বিষয় বাংলা ও ইংরেজির পাসের হারের ব্যবধান ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ পয়েন্ট। আবশ্যিক আইসিটিতে ৯৯ হাজার ৮৫১ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৭৩ হাজার ২৫৪ জন, যার পাসের হার ৭৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দুর্বলতা ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের গুণগত মান নিয়ে এই ফল বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এ বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৯ হাজার ৮৫১ জনের মধ্যে পাস করেছে ৬৫ হাজার ৬৭৪ জন। বাংলায় তুলনামূলক ভালো ফল করলেও ইংরেজিতে এসে বড় একটি অংশ পিছিয়ে পড়েছে। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাংলা আবশ্যিক বিষয়ে ৯৯ হাজার ৮৫১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৮৩ হাজার ৬১৪ জন। প্রয়োজন ছিল ইংরেজিতে ধারাবাহিকভাবে নিজের বক্তব্য প্রকাশের সক্ষমতা। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষকেরা যথাযথভাবে খাতা মূল্যায়ন করেছেন।

ফলাফলে বিভাগভিত্তিক বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ছিল ৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ, আর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৫৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে মানবিক বিভাগে ফল বিপর্যয় রূপ নিয়েছে চরম দুর্ভোগে, যেখানে পাসের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বিজ্ঞান বিভাগের তুলনায় মানবিক বিভাগে পাসের হার ৩৬ দশমিক ০৬ শতাংশ পয়েন্ট কম। বিষয়ভিত্তিক ফলে দেখা যায়, বিজ্ঞানের পদার্থবিজ্ঞানে ৮৬ দশমিক ০৬ শতাংশ, রসায়নে ৮৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ, জীববিজ্ঞানে ৮৩ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং উচ্চতর গণিতে ৭০ দশমিক ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন।

মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের অন্যান্য বিষয়ের ফলাফলে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। মানবিকে অর্থনীতিতে ৭৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, সমাজবিজ্ঞানে ৭৫ দশমিক ০১ শতাংশ, যুক্তিবিদ্যায় ৭৪ দশমিক ০৮ শতাংশ, ইতিহাসে ৭৩ দশমিক ৬১ শতাংশ, পৌরনীতি ও সুশাসনে ৮০ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ৮৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছেন। অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের হিসাববিজ্ঞানে পাসের হার ৮১ দশমিক ৪৬ শতাংশ, ব্যবসায় সংগঠনে ৮৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বিমায় ৮৯ দশমিক ৯১ শতাংশ।

কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পাসের হার ৯০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মনোবিজ্ঞানে ৯৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, ভূগোলে ৯৪ দশমিক ৬০ শতাংশ, কৃষিশিক্ষায় ৯৫ দশমিক ৮২ শতাংশ, গার্হস্থ্য বিজ্ঞানে ৯৬ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং সামাজিক কর্মে ৯৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। এ ছাড়া খাদ্য ও পুষ্টি এবং গার্হস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও পারিবারিক জীবন বিষয় দুটিতে শতভাগ পাসের হার রেকর্ড করা হয়েছে, যদিও এসব বিষয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৯ জন করে।

ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের প্রয়োগনির্ভর প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। প্রথাগত ব্যাকরণের নিয়ম মুখস্থ করে উত্তর দেওয়ার সুযোগ এবার কম ছিল। ব্যাকরণ (Grammar) অংশে ৬০ নম্বর এবং রচনা (Composition) অংশে ছিল ৪০ নম্বর। ব্যাকরণ অংশে Article, Preposition, Suitable Phrases/Words, Completing Sentences, Right Form of Verbs, Transformation, Narration, Pronoun Reference, Modifiers, Sentence Connectors এবং Synonym-Antonym ও Punctuation থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে বাধা প্রয়োগনির্ভর প্রশ্ন। শিক্ষকদের মতে, এসব প্রশ্নে মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতির চেয়ে বাস্তব বাক্যে ব্যাকরণের নিয়ম প্রয়োগের দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বিশেষ করে Pronoun Reference অংশে বাক্যের অস্পষ্ট নির্দেশক চিহ্নিত করে সংশোধন, Modifiers অংশে বাক্যের অর্থ ও ব্যাকরণগত কাঠামো বুঝে সঠিক স্থান নির্বাচন এবং Narration অংশে Reporting Verb, Pronoun ও Tense-এর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ দক্ষতার প্রয়োজন পড়েছে। আবার Sentence Connectors-এর ক্ষেত্রে বাক্যের কারণ, ফলাফল, বিরোধ ও সংযোজনের সম্পর্ক বোঝার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ফলে শুধু নিয়ম মুখস্থ করে যারা পরীক্ষা দিয়েছেন, তাদের জন্য উত্তর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

রচনামূলক (Composition) অংশে সহজ ও পরিচিত বিষয় থাকলেও ভাষাগত শুদ্ধতা ও কাঠামোগত দক্ষতায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে ছিলেন। পরীক্ষায় Multimedia Facilities স্থাপনে অধ্যক্ষের কাছে আবেদন (Application Writing), তরুণদের ওপর Facebook-এর প্রভাব (Report Writing), A Visit to a Book Fair (Paragraph Writing) এবং The Importance of Tree Plantation (Composition Writing) দেওয়া হয়েছিল। তথ্যের প্রাসঙ্গিকতা, সঠিক বাক্য গঠন ও সাবলীল উপস্থাপনার ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত নম্বর পাননি।

প্রশ্নপত্রে সম্পাদনাগত ভুল বা অসঙ্গতির অভিযোগও উঠে এসেছে। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের তিন নম্বর প্রশ্নের (g) অংশে ‘There live a very clever fox’ মুদ্রিত হতে দেখা গেছে। ব্যাকরণগতভাবে ভুল ও অসঙ্গতিপূর্ণ এই বাক্য পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হলেও সামগ্রিক ফলাফলে এটি কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি।

শিক্ষা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু প্রশ্নপত্রের ধরনই ফল বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ নয়। বছরজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরীক্ষার সময়সূচিতে পরিবর্তন ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিরতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট এবং নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস শেষ করতে না পারাও ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ ছাড়া খাতা মূল্যায়নে বোর্ডের নির্দিষ্ট নির্দেশিকা কঠোরভাবে মানায় ঢালাও নম্বর দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী জানান, শিক্ষার্থীরা বর্তমানে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষমুখী না হয়ে নানা ধরনের স্মার্ট ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্রে কাঙ্ক্ষিত ইংরেজি দক্ষতার প্রতিফলন দেখা যায়নি, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ফলে। তিনি উল্লেখ করেন, খাতা মূল্যায়নের জন্য পূর্বনির্ধারিত নির্দেশিকা মানা হয়েছে। এদিকে সন্তানের জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও সার্বিক ফলাফলে হতাশা প্রকাশ করেছেন সাদেক আহমেদ নামে এক অভিভাবক। তবে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি ও মোবাইল ফোনে আসক্তিও খারাপ ফলের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

চট্টগ্রাম বোর্ডে এইচএসসি পাসের হার ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

আপডেট সময় : ১০:৩৩:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে। বোর্ডের অধীনে অংশ নেওয়া মোট ৯৬ হাজার ৩ ৩৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৫০ হাজার ১৬২ জন, আর অকৃতকার্য হয়েছেন ৪৬ হাজার ১৭৩ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থীই পাসের মুখ দেখতে পাননি। বোর্ডের গত ১৫ বছরের ইতিহাসে এটিই সর্বনিম্ন পাসের হার। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও নাটকীয়ভাবে কমে ২ হাজার ৯২৯ জনে নেমে এসেছে। গত বছর পাসের হার ছিল ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৬ হাজার ১৩০ জন শিক্ষার্থী। ফলে এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ পয়েন্ট এবং জিপিএ-৫ এর সংখ্যা ৩ হাজার ২০১টি হ্রাস পেয়েছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৬ হাজার ৩৩৫ জনের মধ্যে ফেল করেছে ৪৬ হাজার ১৭৩ জন।

বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ইংরেজি বিষয় থেকে।

ইংরেজিতে মোট পরীক্ষার্থী ৯৯ হাজার ৮৫১ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৬৫ হাজার ৬৭ ৪ জন, ফলে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ৭৭ শতাংশে। কেবল এই একটি বিষয়েই অকৃতকার্য হয়েছেন ৩৪ হাজার ১৭৭ জন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে বাংলায় পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যেখানে অকৃতকার্য হয়েছেন ১৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। দুই আবশ্যিক বিষয় বাংলা ও ইংরেজির পাসের হারের ব্যবধান ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ পয়েন্ট। আবশ্যিক আইসিটিতে ৯৯ হাজার ৮৫১ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৭৩ হাজার ২৫৪ জন, যার পাসের হার ৭৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে দুর্বলতা ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের গুণগত মান নিয়ে এই ফল বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এ বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৯ হাজার ৮৫১ জনের মধ্যে পাস করেছে ৬৫ হাজার ৬৭৪ জন। বাংলায় তুলনামূলক ভালো ফল করলেও ইংরেজিতে এসে বড় একটি অংশ পিছিয়ে পড়েছে। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাংলা আবশ্যিক বিষয়ে ৯৯ হাজার ৮৫১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৮৩ হাজার ৬১৪ জন। প্রয়োজন ছিল ইংরেজিতে ধারাবাহিকভাবে নিজের বক্তব্য প্রকাশের সক্ষমতা। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষকেরা যথাযথভাবে খাতা মূল্যায়ন করেছেন।

ফলাফলে বিভাগভিত্তিক বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ছিল ৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ, আর ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৫৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে মানবিক বিভাগে ফল বিপর্যয় রূপ নিয়েছে চরম দুর্ভোগে, যেখানে পাসের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বিজ্ঞান বিভাগের তুলনায় মানবিক বিভাগে পাসের হার ৩৬ দশমিক ০৬ শতাংশ পয়েন্ট কম। বিষয়ভিত্তিক ফলে দেখা যায়, বিজ্ঞানের পদার্থবিজ্ঞানে ৮৬ দশমিক ০৬ শতাংশ, রসায়নে ৮৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ, জীববিজ্ঞানে ৮৩ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং উচ্চতর গণিতে ৭০ দশমিক ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন।

মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের অন্যান্য বিষয়ের ফলাফলে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। মানবিকে অর্থনীতিতে ৭৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, সমাজবিজ্ঞানে ৭৫ দশমিক ০১ শতাংশ, যুক্তিবিদ্যায় ৭৪ দশমিক ০৮ শতাংশ, ইতিহাসে ৭৩ দশমিক ৬১ শতাংশ, পৌরনীতি ও সুশাসনে ৮০ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ৮৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছেন। অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের হিসাববিজ্ঞানে পাসের হার ৮১ দশমিক ৪৬ শতাংশ, ব্যবসায় সংগঠনে ৮৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বিমায় ৮৯ দশমিক ৯১ শতাংশ।

কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পাসের হার ৯০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মনোবিজ্ঞানে ৯৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, ভূগোলে ৯৪ দশমিক ৬০ শতাংশ, কৃষিশিক্ষায় ৯৫ দশমিক ৮২ শতাংশ, গার্হস্থ্য বিজ্ঞানে ৯৬ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং সামাজিক কর্মে ৯৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। এ ছাড়া খাদ্য ও পুষ্টি এবং গার্হস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও পারিবারিক জীবন বিষয় দুটিতে শতভাগ পাসের হার রেকর্ড করা হয়েছে, যদিও এসব বিষয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৯ জন করে।

ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের প্রয়োগনির্ভর প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। প্রথাগত ব্যাকরণের নিয়ম মুখস্থ করে উত্তর দেওয়ার সুযোগ এবার কম ছিল। ব্যাকরণ (Grammar) অংশে ৬০ নম্বর এবং রচনা (Composition) অংশে ছিল ৪০ নম্বর। ব্যাকরণ অংশে Article, Preposition, Suitable Phrases/Words, Completing Sentences, Right Form of Verbs, Transformation, Narration, Pronoun Reference, Modifiers, Sentence Connectors এবং Synonym-Antonym ও Punctuation থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে বাধা প্রয়োগনির্ভর প্রশ্ন। শিক্ষকদের মতে, এসব প্রশ্নে মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতির চেয়ে বাস্তব বাক্যে ব্যাকরণের নিয়ম প্রয়োগের দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বিশেষ করে Pronoun Reference অংশে বাক্যের অস্পষ্ট নির্দেশক চিহ্নিত করে সংশোধন, Modifiers অংশে বাক্যের অর্থ ও ব্যাকরণগত কাঠামো বুঝে সঠিক স্থান নির্বাচন এবং Narration অংশে Reporting Verb, Pronoun ও Tense-এর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ দক্ষতার প্রয়োজন পড়েছে। আবার Sentence Connectors-এর ক্ষেত্রে বাক্যের কারণ, ফলাফল, বিরোধ ও সংযোজনের সম্পর্ক বোঝার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ফলে শুধু নিয়ম মুখস্থ করে যারা পরীক্ষা দিয়েছেন, তাদের জন্য উত্তর দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

রচনামূলক (Composition) অংশে সহজ ও পরিচিত বিষয় থাকলেও ভাষাগত শুদ্ধতা ও কাঠামোগত দক্ষতায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে ছিলেন। পরীক্ষায় Multimedia Facilities স্থাপনে অধ্যক্ষের কাছে আবেদন (Application Writing), তরুণদের ওপর Facebook-এর প্রভাব (Report Writing), A Visit to a Book Fair (Paragraph Writing) এবং The Importance of Tree Plantation (Composition Writing) দেওয়া হয়েছিল। তথ্যের প্রাসঙ্গিকতা, সঠিক বাক্য গঠন ও সাবলীল উপস্থাপনার ঘাটতির কারণে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত নম্বর পাননি।

প্রশ্নপত্রে সম্পাদনাগত ভুল বা অসঙ্গতির অভিযোগও উঠে এসেছে। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের তিন নম্বর প্রশ্নের (g) অংশে ‘There live a very clever fox’ মুদ্রিত হতে দেখা গেছে। ব্যাকরণগতভাবে ভুল ও অসঙ্গতিপূর্ণ এই বাক্য পরীক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হলেও সামগ্রিক ফলাফলে এটি কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি।

শিক্ষা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু প্রশ্নপত্রের ধরনই ফল বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ নয়। বছরজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরীক্ষার সময়সূচিতে পরিবর্তন ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিরতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট এবং নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস শেষ করতে না পারাও ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ ছাড়া খাতা মূল্যায়নে বোর্ডের নির্দিষ্ট নির্দেশিকা কঠোরভাবে মানায় ঢালাও নম্বর দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী জানান, শিক্ষার্থীরা বর্তমানে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষমুখী না হয়ে নানা ধরনের স্মার্ট ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়ছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্রে কাঙ্ক্ষিত ইংরেজি দক্ষতার প্রতিফলন দেখা যায়নি, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ফলে। তিনি উল্লেখ করেন, খাতা মূল্যায়নের জন্য পূর্বনির্ধারিত নির্দেশিকা মানা হয়েছে। এদিকে সন্তানের জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও সার্বিক ফলাফলে হতাশা প্রকাশ করেছেন সাদেক আহমেদ নামে এক অভিভাবক। তবে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি ও মোবাইল ফোনে আসক্তিও খারাপ ফলের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

Facebook Comments Box