কলকাতার রেস্তোরাঁ ও বাজার থেকে উধাও গরুর মাংস
- আপডেট সময় : ০৭:০২:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬৫ বার পড়া হয়েছে
কলকাতার রেস্তোরাঁ ও বাজার থেকে উধাও গরুর মাংস
কলকাতার ট্যাংরা পাড়ার সরু গলির ঠিক উল্টোদিকে শহরটির একমাত্র গরুর কসাইখানাটি অবস্থিত। পৌরসভা পরিচালিত এই কসাইখানাটি এখন যেন একটি তালাবন্ধ দুর্গের মতো দাঁড়িয়ে আছে। একসময় যা কর্মমুখর থাকত, এখন তার বিশাল লোহার গেটের ফাঁক দিয়ে কেবল স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঠে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়।
মে মাসে কসাইখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এলাকার কিছু তরুণকে দেয়াল বেয়ে ভেতরে ঢুকতে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় খাবারের দোকানের ব্যবস্থাপক মোহাম্মাদ মেহমুদ আলম হতাশার সুরে বলেন, বর্তমান সরকার দ্রুত এটি আবার চালু করার অনুমতি দেবে বলে তার মনে হয় না।
পড়ুন>>বেক্সিমকো ফার্মার পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করছেন সালমান এফ রহমান
তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়ী হয়।
এর মাত্র চার দিন পরেই, ১৩ মে রাজ্য সরকার গবাদি পশু জবাই সংক্রান্ত একটি নতুন বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এই বিজ্ঞপ্তিতে ১৯৫০ সালের ‘পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন’ কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গবাদি পশু জবাই করতে হলে সেটিকে উপযুক্ত হিসেবে প্রত্যয়নকারী সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। কেবলমাত্র ১৪ বছরের বেশি বয়সী, কর্মক্ষমতাহীন বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত পশুর ক্ষেত্রেই এমন সনদ পাওয়া সম্ভব। এছাড়া খোলা জনসমাগমস্থলে জবাই নিষিদ্ধ করে কেবল পৌর বা নির্ধারিত জবাইখানায় কাজ সারার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।
পড়ুন>>পাবনায় অটোভ্যান চালক নিখোঁজ ও উদ্ধারকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন
কুরবানির ঈদের ঠিক আগে এই নির্দেশনা আসায় শহরজুড়ে মাংসের সরবরাহ ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে। তিন মাসের বেশি সময় পার হলেও এই ঘাটতি কাটেনি। অথচ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যতম প্রধান গোমাংস ভোজী রাজ্য হিসেবে পরিচিত। সরকারি তথ্যানুসারে, রাজ্যের প্রায় ১০.৪ শতাংশ গ্রামীণ ও ৭.৯ শতাংশ শহুরে পরিবার গোমাংস বা মহিষের মাংস নিয়মিত গ্রহণ করে, যা আসাম ও কেরালা রাজ্যের চাহিদার সাথে তুলনীয়।
সরবরাহ সংকটের নেপথ্যে কেবল জবাইয়ের শর্তই নয়, পৌর প্রশাসনিক জটিলতাও বড় ভূমিকা রাখছে। বিদায়ী মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগের পর গত জুনে কলকাতার পৌরসভা ভেঙে দেওয়া হয়। এতে মাংস ব্যবসায়ীদের ব্যবসা পরিচালনার লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া আটকে গেছে। ডিসেম্বরে নতুন পৌর নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা কাটবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন>>প্রয়োজনভিত্তিক উপবৃত্তি চালুর ইঙ্গিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর
মেহমুদ আলমের বন্ধু মুশতাক একজন মাংস ব্যবসায়ী, যার ছয় প্রজন্মের পরিবার এই পেশার সাথে যুক্ত। লাইসেন্স নবায়নের অপেক্ষায় থাকা মুশতাক গত তিন মাসে কোনো আয় করতে পারেননি। তিনি জানান, আগে যেসব পদের জন্য ভালো মানের মাংস লাগত, সরবরাহ না থাকায় সেগুলো আর তৈরি করা যাচ্ছে না।
বাজারগুলোতে মাংসের দামও আকাশচুম্বী। বিধিনিষেধের আগে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল ২০০ থেকে ২৫০ রুপি, যা এখন ৩৫০ থেকে ৫০০ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে, রেস্তোরাঁগুলোতেও খাবারের দাম বেড়েছে। মেহমুদ আলমের দোকানের এক প্লেট ভুনা মাংসের দাম ১০০ রুপি থেকে বেড়ে হয়েছে ১২০ রুপি।
এছাড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্রেতা এখন প্রকাশ্যে গোমাংস কিনতে বা খেতে ভয় পাচ্ছেন। আলফাজ লাইক নামের এক স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে বাংলায় মাদক পরিবহনের চেয়ে গরুর মাংস পরিবহন অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন>>কাউনিয়ায় মাদক সেবন করে মাতলামী: দুই যুবকের কারাদণ্ড
শহরের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁগুলোও এর প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি। মানের সাথে আপস না করতে চেয়ে ‘জম জম’ রেস্তোরাঁ তাদের তিনটি শাখা থেকেই গরুর মাংসের মেনু সরিয়ে ফেলেছে। রেস্তোরাঁর পরিচালক শাদমান ফাইজ জানান, এ সিদ্ধান্তে তাদের ক্রেতা যেমন কমেছে, তেমনি ৪০ শতাংশের বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে এবং কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে হয়েছে। পার্ক স্ট্রিটের বিখ্যাত ‘অলি-পাব’-এর মতো প্রতিষ্ঠানও নিয়মিত সরবরাহ না পাওয়ায় তাদের বিখ্যাত ‘বিফ স্টেক’ মেনু থেকে অনিয়মিত করে দিয়েছে।
রাজ্যজুড়ে বিজেপি সরকারের এই কড়াকড়ি নতুন কোনো বিষয় নয়, বরং অতীত থেকেই রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, হরিয়ানা, ছত্তিশগড়, উত্তরাখণ্ড ও কর্ণাটকে গবাদি পশু জবাই বা মাংস বিক্রির ওপর নানা ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে কলকাতায় এই পরিস্থিতি এবারই প্রথম। মালদহের মতো মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও এখন মাংস কেনাবেচা চলে অনেকটা গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিচিত কারও গরু থাকলে গভীর রাতে জবাই করে গোপনে মাংস পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি ও নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করেই প্রান্তিক মানুষগুলো তাদের খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ



















