আদিবাসী জনগণের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের নানামূখী চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। এ দিবসটি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যগত জ্ঞান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নে আদিবাসী জনগণের অসামান্য অবদানকেও স্বীকৃতি জানায়। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য: “জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে আদিবাসী ধাত্রীদের অনন্য অবদানকে সম্মান জানানো” যা মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কল্যাণ ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণের ওপর আলোকপাত করে।
বাংলাদেশ তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। এ দেশ বৈচিত্র্যময় জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য আবাসস্থল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি এখানে ৫৪টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস, যারা অন্তত ৩৫টি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, সাঁওতাল, ওরাঁও, গারো, মাহাতো, পাংখোয়া, রাখাইন, মুন্ডা, মণিপুরীসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী যুগ-যুগ ধরে তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বজায় রেখে বসবাস করে আসছে।
বাংলাদেশের সংবিধান সমতা ও ন্যায়বিচারের একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ কিংবা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তবে আরও স্পষ্টীকরণের জন্য সংবিধানে ‘জাতিসত্তা (Ethnicity) অথবা আদিবাসী (Indigenous Peoples)’ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন নং ১০৭ অনুসমর্থন করলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে দেশের জাতিগত বৈচিত্র্য স্বীকৃত হলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আদিবাসী জনগণ (Indigenous Peoples)’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। যদিও কিছু সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, ভূমির মালিকানা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা, বিশেষ করে আইএলও -এর Committee of Experts on the Application of Conventions and Recommendations (CEACR), বার বার গুরুত্বারোপ করেছে যে, এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; যেখানে আদিবাসী জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করতে পারেন।
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনও একটি গুরুতর মানবাধিকার সংকট। Kapaeeng Foundation -এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩২ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুকে কেন্দ্র করে মোট ২৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির মতো অপরাধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী নারীদের চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার প্রতিফলন। তবে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়।
প্রতিশোধের আশঙ্কা, সামাজিক কলঙ্ক, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, আইনি সহায়তা ও সহায়ক সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার বহু ঘটনাই নথিভুক্ত হয় না। এসব প্রতিবন্ধকতা শুধু ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে না; বরং সহিংসতা, প্রান্তিকীকরণ এবং বৈষম্যের চক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। তাই জরুরি ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা ব্যবস্থা এবং অর্থবহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হবে না।
“বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত” – এই বহুল প্রচলিত উক্তিটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সহিংসতার অসংখ্য বেঁচে থাকা মানুষের জন্য বিচার শুধু ধীরগতির নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা অধরাই থেকে যায়। তদন্তে বিলম্ব, দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া, যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বহু ক্ষেত্রে অপরাধীদের জবাবদিহিতার অভাব বিচারপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরী ও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত হন। এতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরও এর বহু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল অধিকতর স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের কার্যকর সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা। পরবর্তী বিভিন্ন সরকার চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করলেও আদিবাসী প্রতিনিধিদের মতে, অর্থবহ বিকেন্দ্রীকরণ, কার্যকর ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বেশ কয়েকটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। এই বাস্তবায়ন ঘাটতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে।
সম্প্রতি সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংরক্ষিত মহিলা আসন ১৯ -এর সংসদ সদস্য আন্না মিনজের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি সাক্ষাতে অংশ নেয়। বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে প্রতিনিধিরা তাদের ন্যায্য দাবিসমূহ তুলে ধরে একটি সুপারিশপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। আদিবাসী নেতৃবৃন্দের এই উদ্যোগ নতুন করে দেশের জাতীয় আলোচনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সংলাপ, সহনশীলতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ বহু জাতীয় সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। একই অঙ্গীকার এখন প্রয়োজন, যাতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীও সংবিধানের পূর্ণ সুরক্ষা এবং অন্যান্য নাগরিকের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে। তাদের কল্যাণে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো দ্রুত বিবেচনার দাবি রাখে:
ভূমি বিরোধের সমাধান: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সরকারকে একটি কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইসঙ্গে সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা জরুরি।
ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করা: আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত আইনি সহায়তা, সুরক্ষা, দ্রুত তদন্ত এবং কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণ ও বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে যাতে তারা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতির নিয়মিত ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সকল অংশীজনের মধ্যে নতুন করে গঠনমূলক সংলাপ শুরু করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ দেশের বাইরের কেউ নয়; বরং তারা এই রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম অংশীদার। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বহু সদস্য বাঙালি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। দেশের প্রতি তাদের এই অবদান শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে নয়, বরং তাদের অধিকার, মর্যাদা এবং সমান নাগরিকত্ব নিশ্চিতকারী নীতিমালার মাধ্যমে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের শক্তি কখনোই সাংস্কৃতিক একরূপতার ওপর নির্ভর করেনি। বরং এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষায়। তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি এবং পূর্বপুরুষের ভূমি রক্ষা করা কোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি দয়া প্রদর্শন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই ভবিষ্যতের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।
নিকোলাস বিশ্বাস
গণমাধ্যম ফ্রীল্যান্সার
মোবাইল: (+৮৮) ০১৭১৫-১০৮১৮৪
ই-মেইল: Gonomaddyom@gmail.com
ফেসবুক আইডি: বাংলাদেশ গণমাধ্যম
(নিকোলাস বিশ্বাস একজন উন্নয়নকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক। )
Leave a Reply