আজ বুধবার, ১২ আগস্ট হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবার। মুসলিম বিশ্বে দিনটি ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ হিসেবে পরিচিত। আরবি ও ফারসি শব্দযোগে গঠিত এই নামের অর্থ সফর মাসের শেষ বুধবার। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান নফল ইবাদত ও দান-সদকা করে থাকেন, তবে দিনটির বিশেষ মর্যাদা ও পালনীয় আমল নিয়ে ইসলামি আলেম ও গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য রয়েছে।
প্রচলিত একটি মত অনুযায়ী, সফর মাসের শেষ বুধবার মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর দীর্ঘ অসুস্থতা থেকে সাময়িক সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। এই সংবাদে সাহাবায়ে কেরাম আনন্দিত হয়ে শুকরিয়া আদায় করেন এবং দান-সদকা করেন। অনেকে এই ঘটনাকে স্মরণ করেই দিনটি পালন করেন। বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, অসুস্থ অবস্থায় মহানবী (সা.) এই দিনে মসজিদে নামাজ পড়তে এসেছিলেন এবং হজরত আবু বকর (রা.)-কে ইমামতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় দাবি করা হয় যে, হজরত আবু বকর (রা.), হজরত ওমর (রা.), হজরত উসমান (রা.), হজরত আলী (রা.) ও আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর মতো সাহাবিরা এই দিনে দান করেছিলেন। তবে ইসলামি পণ্ডিতদের একটি বড় অংশ এসব বর্ণনাকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। তাদের মতে, মহানবী (সা.) ঠিক কোন দিনে সুস্থতা অনুভব করেছিলেন, তার কোনো অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তাঁর ইন্তেকালের পর সাহাবা ও তাবেয়িদের যুগেও এই দিনটিকে বিশেষভাবে পালন করার কোনো নজির পাওয়া যায় না।
মহানবী (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার সময়কাল ও তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনায় যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন অসুস্থতা সফর মাসের শেষ কয়েক রাত থেকে শুরু হয়েছিল, আবার কারো মতে তা রবিউল আউয়াল মাসের শুরুতে ছিল। তাঁর অসুস্থতার স্থায়িত্ব নিয়েও মতভেদ আছে; কোথাও ১০ দিন, কোথাও ১২, ১৩ বা ১৪ দিনের কথা বলা হয়েছে। এমনকি অসুস্থতা শুরুর দিন নিয়েও শনিবার, সোমবার ও বুধবারের মতো ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়।
গবেষক আলেমদের মতে, সপ্তম হিজরিতে মহানবী (সা.)-এর ওপর জাদুর প্রভাব পড়ার যে ঘটনার কথা বলা হয়, তার সময়কাল নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। ফলে ওই ঘটনার সঙ্গে ১১ হিজরির সফর মাসের শেষ বুধবারকে যুক্ত করার কোনো যৌক্তিক সুযোগ নেই। এছাড়া হাদিস ও সিরাতের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে পাওয়া যায় যে, মহানবী (সা.) বুধবারের পরও সুস্থতা অনুভব করেছিলেন এবং নামাজ আদায় করেছিলেন। এমনকি ইন্তেকালের আগের সোমবার সকালেও তিনি সুস্থতা বোধ করেছিলেন বলে বর্ণনা রয়েছে।
ইসলামি শরিয়তে কোনো নির্দিষ্ট দিনকে বিশেষ ইবাদত বা আনুষ্ঠানিকতার জন্য নির্ধারণ করতে হলে কোরআন, হাদিস ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রের ভিত্তি থাকা অপরিহার্য। আলেমদের মতে, কোনো আমলকে শরিয়তের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার অকাট্য প্রমাণ প্রয়োজন। বাংলাদেশে সরকারি ছুটির তালিকায় আখেরি চাহার সোম্বা উপলক্ষে ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থা থাকলেও, ধর্মীয় আমল পালনের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আলেমদের পরামর্শ ও গ্রহণযোগ্য ইসলামী সূত্র অনুসরণ করার ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সূত্র: Dainik Ei Din
Leave a Reply