ঢাকা ০৬:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গাজায় ইসরায়েলকে অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সরবরাহ ভারতের: প্রতিবেদন রূপপুরের ইউরেনিয়াম পরিবহনে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার নিয়ে যা জানাল ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ছয় প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ, ভোট ২৯ অক্টোবর বইয়ের দোকানে হামলা ও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ করার দাবি উয়েফার বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচার ও হয়রানির’: ফিফার অভিযোগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিসিপ প্রকল্পে অফিসার নিয়োগ: আবেদনের নিয়ম আল-আকসায় বসতিস্থাপনকারীদের অনুপ্রবেশে কাতারের তীব্র নিন্দা নড়াইলে মহাসড়কের পাশে অজ্ঞাত নারীর দেহ উদ্ধার দেশের ৬৮ এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার করে নতুন দপ্তরে বদলি বৃহস্পতিবার ফেনী সফরে প্রধানমন্ত্রী, থাকছে দিনভর নানা কর্মসূচি

বইয়ের দোকানে হামলা ও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ করার দাবি

ঢাকা মহানগর প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৪:৫৯:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
(সৃষ্টি নিউজ) অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

 

বইয়ের দোকানে হামলা ও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ করার দাবি

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলায় শাসকগোষ্ঠী বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর রোষানলে বই নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। ব্রিটিশ আমলে নজরুলের ‘বিষের বাঁশী’ বা ‘ভাঙার গান’ থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা—এমন দীর্ঘ তালিকা আমাদের জানা।

এমনকি স্বাধীনতার পরেও বিভিন্ন সময়ে লেখক ও প্রকাশকদের ওপর নেমে এসেছে খড়গ। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে এ কে খন্দকারের ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটি নিষিদ্ধ করার দাবি জাতীয় সংসদে উঠেছিল, যা ছিল ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ। কখনো ক্ষমতা হারানোর ভয়ে, কখনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপে—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে বই নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ।

পড়ুন>>অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিসিপ প্রকল্পে অফিসার নিয়োগ: আবেদনের নিয়ম

ব্রিটিশ শাসনামলে যেমন কাজী নজরুল ইসলামের বিষের বাঁশী ও ভাঙার গান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তেমনি পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়া হয়নি। এসব বইয়ের প্রতি পাঠকদের তেমন আগ্রহ ছিল না। সব বইয়ের গুরুত্ব যে সমান নয়, তা পাঠকেরাও ভালো করেই বোঝেন।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি যেন আরও উত্তাল হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার থেকে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা বই সরিয়ে ফেলার হিড়িক পড়ে গেছে। কোথাও কোথাও বই পুড়িয়ে ফেলার মতো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাও ঘটছে।

 

উদাহরণস্বরূপ, গত ১৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখে বরগুনা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’সহ চার শতাধিক বই পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। শেখ হাসিনার প্রশংসায় ভাসিয়ে বইও লেখা হতো।

পড়ুন>> অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিসিপ প্রকল্পে অফিসার নিয়োগ: আবেদনের নিয়ম

বই পোড়ানো বা লাইব্রেরি ভাঙার এই ‘রাজনীতি’ নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অতীতে একদল সুবিধাবাদী গোষ্ঠী শেখ মুজিবকে নিয়ে নানা অতিরঞ্জিত বা অসাড় বই প্রকাশ করে রাজনৈতিক সুবিধা নিত, যার নিন্দা জানালেও বর্তমানে ইতিহাসের অমূল্য দলিল ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব ইতিহাস ও সমাজ গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই বইয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সাড়ে চার হাজার দিনের জেল জীবন ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের সংগ্রামের সত্য উঠে এসেছে, যা ইতিহাসের জন্য পবিত্র দলিলস্বরূপ।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রাজধানী ঢাকার বাংলাবাজারে অবস্থিত দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)-এর শোরুমে একদল ব্যক্তি হামলা চালায়। তারা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে নিষিদ্ধ বই দাবি করে এর বিপণন বন্ধ করতে বিক্রয়কর্মীদের ওপর আক্রমণাত্মক আচরণ করে। একপর্যায়ে শোরুমের শাটার বন্ধ করে বিক্রয়কর্মীদের হয়রানি করা হয়। পরে পুলিশ তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটকে রাখে এবং পরবর্তীতে ছেড়ে দেয়।

 

পড়ুন>>অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিসিপ প্রকল্পে অফিসার নিয়োগ: আবেদনের নিয়ম

এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, আইনের রক্ষক পুলিশ কীভাবে কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই বই বিক্রি বন্ধের শর্ত দিতে পারে? সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক চিন্তা, বিবেক ও বাক্‌স্বাধীনতার নিশ্চয়তা পান। যদি কোনো বই রাষ্ট্রবিরোধী হয়, তবে তার আইনি প্রতিকারের নির্দিষ্ট পথ রয়েছে—সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে অথবা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। কোনো ব্যক্তি বা উগ্র গোষ্ঠীর দোকানে গিয়ে বই নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার নেই।

সরকারকে অবিলম্বে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে। কারা ইউপিএলের কর্মীদের হয়রানি করেছে, তাদের শনাক্ত করা জরুরি। যদি সরকার মনে না করে যে বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার যোগ্য, তবে কেন পুলিশ বিক্রয়কর্মীদের ওপর এমন অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করল? ইতিহাস মোছা দোকানের শাটার নামিয়ে সম্ভব নয়। বইয়ের জবাব বই দিয়ে দিতে হয়, যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে। অন্ধ আবেগে ইতিহাস ধ্বংস করলে আমরা কেবল আমাদের শেকড়কেই বিচ্ছিন্ন করব, যা একটি স্বাধীন ও সভ্য রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

Facebook Comments Box

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বইয়ের দোকানে হামলা ও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ করার দাবি

আপডেট সময় : ০৪:৫৯:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

 

বইয়ের দোকানে হামলা ও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ করার দাবি

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলায় শাসকগোষ্ঠী বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর রোষানলে বই নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। ব্রিটিশ আমলে নজরুলের ‘বিষের বাঁশী’ বা ‘ভাঙার গান’ থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা—এমন দীর্ঘ তালিকা আমাদের জানা।

এমনকি স্বাধীনতার পরেও বিভিন্ন সময়ে লেখক ও প্রকাশকদের ওপর নেমে এসেছে খড়গ। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে এ কে খন্দকারের ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটি নিষিদ্ধ করার দাবি জাতীয় সংসদে উঠেছিল, যা ছিল ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ। কখনো ক্ষমতা হারানোর ভয়ে, কখনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপে—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে বই নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ।

পড়ুন>>অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিসিপ প্রকল্পে অফিসার নিয়োগ: আবেদনের নিয়ম

ব্রিটিশ শাসনামলে যেমন কাজী নজরুল ইসলামের বিষের বাঁশী ও ভাঙার গান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তেমনি পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়া হয়নি। এসব বইয়ের প্রতি পাঠকদের তেমন আগ্রহ ছিল না। সব বইয়ের গুরুত্ব যে সমান নয়, তা পাঠকেরাও ভালো করেই বোঝেন।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি যেন আরও উত্তাল হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার থেকে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা বই সরিয়ে ফেলার হিড়িক পড়ে গেছে। কোথাও কোথাও বই পুড়িয়ে ফেলার মতো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাও ঘটছে।

 

উদাহরণস্বরূপ, গত ১৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখে বরগুনা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’সহ চার শতাধিক বই পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। শেখ হাসিনার প্রশংসায় ভাসিয়ে বইও লেখা হতো।

পড়ুন>> অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিসিপ প্রকল্পে অফিসার নিয়োগ: আবেদনের নিয়ম

বই পোড়ানো বা লাইব্রেরি ভাঙার এই ‘রাজনীতি’ নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অতীতে একদল সুবিধাবাদী গোষ্ঠী শেখ মুজিবকে নিয়ে নানা অতিরঞ্জিত বা অসাড় বই প্রকাশ করে রাজনৈতিক সুবিধা নিত, যার নিন্দা জানালেও বর্তমানে ইতিহাসের অমূল্য দলিল ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব ইতিহাস ও সমাজ গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই বইয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সাড়ে চার হাজার দিনের জেল জীবন ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের সংগ্রামের সত্য উঠে এসেছে, যা ইতিহাসের জন্য পবিত্র দলিলস্বরূপ।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রাজধানী ঢাকার বাংলাবাজারে অবস্থিত দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)-এর শোরুমে একদল ব্যক্তি হামলা চালায়। তারা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে নিষিদ্ধ বই দাবি করে এর বিপণন বন্ধ করতে বিক্রয়কর্মীদের ওপর আক্রমণাত্মক আচরণ করে। একপর্যায়ে শোরুমের শাটার বন্ধ করে বিক্রয়কর্মীদের হয়রানি করা হয়। পরে পুলিশ তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটকে রাখে এবং পরবর্তীতে ছেড়ে দেয়।

 

পড়ুন>>অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিসিপ প্রকল্পে অফিসার নিয়োগ: আবেদনের নিয়ম

এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, আইনের রক্ষক পুলিশ কীভাবে কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই বই বিক্রি বন্ধের শর্ত দিতে পারে? সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক চিন্তা, বিবেক ও বাক্‌স্বাধীনতার নিশ্চয়তা পান। যদি কোনো বই রাষ্ট্রবিরোধী হয়, তবে তার আইনি প্রতিকারের নির্দিষ্ট পথ রয়েছে—সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে অথবা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। কোনো ব্যক্তি বা উগ্র গোষ্ঠীর দোকানে গিয়ে বই নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার নেই।

সরকারকে অবিলম্বে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে। কারা ইউপিএলের কর্মীদের হয়রানি করেছে, তাদের শনাক্ত করা জরুরি। যদি সরকার মনে না করে যে বইটি নিষিদ্ধ হওয়ার যোগ্য, তবে কেন পুলিশ বিক্রয়কর্মীদের ওপর এমন অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করল? ইতিহাস মোছা দোকানের শাটার নামিয়ে সম্ভব নয়। বইয়ের জবাব বই দিয়ে দিতে হয়, যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে। অন্ধ আবেগে ইতিহাস ধ্বংস করলে আমরা কেবল আমাদের শেকড়কেই বিচ্ছিন্ন করব, যা একটি স্বাধীন ও সভ্য রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

Facebook Comments Box