কক্সবাজার বিমানবন্দর: রানওয়ে ও টার্মিনাল প্রস্তুত
- আপডেট সময় : ০৭:০৮:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
কক্সবাজার বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাগরের নীল জলরাশির দিকে রানওয়ে ১ হাজার ৭০০ ফুট সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বর্তমানে এর মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭০০ ফুট, যা দেশের অন্যতম দীর্ঘ রানওয়ে। এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর-এর মতো সুপরিসর ও বড় আকারের উড়োজাহাজের নিরাপদ ওঠানামা নিশ্চিত করা। রানওয়েতে ক্যাটাগরি-২ এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে, যা প্রতিকূল আবহাওয়ায় উড়োজাহাজ পরিচালনায় সহায়তা করবে। এছাড়া, সমুদ্রের দিকে ২ হাজার ২০০ ফুট দীর্ঘ প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইট ও ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ রক্ষাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের মূল লক্ষ্য ছিল বড় আকারের উড়োজাহাজ, যেমন বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর (দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট ওয়াইড-বডির যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ) এর মতো সুপরিসর উড়োজাহাজের ওঠানামার সক্ষমতা তৈরি করা।
বিমানবন্দরের ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের নতুন ও দৃষ্টিনন্দন ঝিনুক আকৃতির টার্মিনাল ভবন এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। এই টার্মিনাল দিয়ে একসঙ্গে ৫০০ যাত্রী সেবা নিতে পারবেন। আন্তর্জাতিক বহির্গমন লাউঞ্জে ৪৫০ জন যাত্রী ধারণের সক্ষমতা রয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে লিফট, এস্কেলেটর, কনভেয়ার বেল্ট ও বোর্ডিং ব্রিজের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ইমিগ্রেশন ডেস্ক, ডিউটি ফ্রি শপ ও আগমনী লাউঞ্জ চালুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি এবং উন্নত স্ক্যানিং সিস্টেম বসানো হচ্ছে, আর ফ্লাইটের হালনাগাদ তথ্যের জন্য থাকছে ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম ও আধুনিক ঘোষণা ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় বড় অবকাঠামোর বেশির ভাগই প্রস্তুত।
বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোনের আয়তন ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটার, যেখানে একসঙ্গে দুটি সুপরিসর ও তিনটি ক্লাস-৮ উড়োজাহাজ পার্ক করা সম্ভব হবে। টার্মিনাল ও রানওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে দুটি নতুন ট্যাক্সিওয়ে তৈরি করা হয়েছে। যাত্রী ও দর্শনার্থীদের গাড়ির জন্য বিমানবন্দরে ৩৫টি ভিআইপি ও ৯০টি সাধারণ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, আগস্ট মাস পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পের ৯৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং রানওয়ে প্রকল্পের ৯১ দশমিক ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সীমানাপ্রাচীর ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার মতো কিছু খুঁটিনাটি কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে তিনটি উন্নয়ন প্রকল্প। রানওয়ের সঙ্গে পার্কিং ইয়ার্ড বা টার্মিনালের সংযোগ স্থাপনকারী দুটি ট্যাক্সিওয়েও তৈরি করা হয়েছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে মোট তিনটি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। প্রথম দুটি প্রকল্পের কাজ প্রায় সম্পন্ন হলেও তৃতীয় প্রকল্পের কাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তৃতীয় প্রকল্পের পরিকল্পনায় ৬৮২ একর জমিতে নতুন প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল, নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার, কার্গো কমপ্লেক্স, কনভেনশন ও বিজনেস সেন্টার, এয়ারপোর্ট কোয়ারেন্টাইন হাসপাতাল এবং পাইলট প্রশিক্ষণ একাডেমির মতো বড় পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ৫৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে, যা শেষ হওয়ার পর দরপত্র আহ্বান করা হবে।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকের মতে, চলতি মাসেই বিমানবন্দরটির আন্তর্জাতিক কার্যক্রম উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, শুধুমাত্র অবকাঠামো তৈরি করলেই আন্তর্জাতিক কার্যক্রম সফল হয় না। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য কয়েক মাস আগেই বৈশ্বিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমে সূচি ঘোষণা ও টিকিট বিক্রির প্রয়োজন হয়, যা এখন পর্যন্ত কোনো এয়ারলাইনস করেনি। এছাড়া, নিয়মিত আন্তর্জাতিক যাত্রীভিত্তি আছে কি না, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত সমীক্ষা করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। গত ২৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার বিমানবন্দর পরিদর্শন করে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেছেন, অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার পর চলতি মাসে বিমানবন্দরটির আন্তর্জাতিক কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে। এখানে ৪০ থেকে ৫০টি উড়োজাহাজ ওঠানামার সক্ষমতা তৈরির কথা বলা হলেও বিদেশি কোনো এয়ারলাইনস এখনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার আগ্রহ বা সূচি ঘোষণা করেনি।
কাজী ওয়াহিদুল আলম আরও পরামর্শ দিয়েছেন যে, কক্সবাজারকে কেবল পর্যটন হাব হিসেবে না দেখে বিকল্প উপযোগিতার দিকেও নজর দেওয়া উচিত। ঢাকা বিমানবন্দরে কুয়াশা বা জরুরি প্রয়োজনে ফ্লাইট অবতরণ করতে না পারলে কক্সবাজারকে বিকল্প আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি সেখানে আন্তর্জাতিক মানের উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ (এমআরও) ও মেরামতের ব্যবস্থা এবং পাইলট ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তুললে তা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ আরও প্রশস্ত হবে। তবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কক্সবাজারের সক্ষমতা শুধু রানওয়ে বা টার্মিনালের ওপর নির্ভর করছে না।
উল্লেখ্য, গত বছরের অক্টোবরে বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণা করা হলেও পরে সেই প্রজ্ঞাপন স্থগিত করা হয়। বর্তমানে পর্যটন ব্যবসায়ীরা বিদেশি পর্যটক বাড়ার আশা করছেন, যদিও বর্তমানে সৈকতকেন্দ্রিক অবকাঠামোতে আন্তর্জাতিক মানের সেবার সুযোগ কিছুটা সীমিত। বিমানবন্দরের এই বিশাল বিনিয়োগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে তখনই, যখন নিয়মিত ফ্লাইট ও পর্যাপ্ত যাত্রীর চলাচল নিশ্চিত হবে। এই মাসে শুরু হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের প্রাথমিক মাসগুলোতে কতটি ফ্লাইট পরিচালিত হয়, তা এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: প্রথম আলো
Social Media
Communication
Bookmarking
Developer
Entertainment
Academic
Finance
Lifestyle
নিউজটি শেয়ার করুন
-
সর্বশেষ সংবাদ
-
জনপ্রিয় সংবাদ

























