admin
৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ৪:৫৩ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বিলম্বিত পোস্ট মডেম: ১৯৭০ এর নির্বাচন

বিলম্বিত পোস্ট মডেম ১৯৭০ এর নির্বাচন
বিলম্বিত পোস্ট মডেম ১৯৭০ এর নির্বাচন

 

বিলম্বিত পোস্ট মডেম: ১৯৭০ এর নির্বাচন

 

সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন বনাম জনমতের ব্যবধান এবং স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় অনৈক্যের বীজ।

 

স্বাধীনতা মানে কেবল একটি পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, ভূখণ্ড বা সংবিধান নয়। যে দেশের নাগরিকের মন খুলে কথা বলার স্বাধীনতা নেই, সে দেশকে কি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন বলা যায়? বিগত ৫৪ বছরে খুব কম সময়ই পাওয়া গেছে যখন দেশের মানুষ মন খুলে কথা বলার স্বাধীনতা পেয়েছে।

আমি ইতিহাসবিদ বা কোনো রাজনৈতিক মানুষ নই। আমি শুধু একজন সাধারণ মানুষ, যে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সবচেয়ে উত্থান-পতনের সময়টা নিজের চোখে দেখেছি।

       আজকের নতুন প্রজন্মের কাছে আমার একটাই ছোট অনুরোধ— ইতিহাস কেবল বইয়ে নয়; মানুষের স্মৃতিতেও থাকে। এই স্মৃতিগুলো মিললেই একটি জাতির সত্যিকারের চরিত্র দেখা যায়।

 

 

১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২৫ মার্চের ভয়াল রাত—সবকিছু আমি দূর থেকে নয়, কাছ থেকে দেখেছি। সেই সময় মানুষের মধ্যে অসাধারণ ত্যাগ, সাহস, দেশপ্রেম ছিল; আবার সেই সময়েই দেখেছি বিভাজন, ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলাদলি, নেতৃত্বের সংঘাত। সেই বীজগুলোই পরবর্তী দশকে আরও বড় হয়ে উঠেছে।

 

 

 

 

আজ ৫৪ বছর পর নতুন প্রজন্ম যখন প্রশ্ন করে, “আমরা কেন এক হতে পারি না?” আমি উত্তর দিই—কারণ এ বিভাজন নতুন নয়; এটা আমাদের ইতিহাসেরই অংশ।

 

 

আমি দেখেছি, যা আমার সহযোদ্ধা, প্রতিবেশী, বন্ধুরা দেখেছে, সেগুলোই বলে দেয়, মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ গড়ার জায়গাটায় আমরা ঐক্যের বদলে দলাদলিকেই বড় করেছি।
আমি এই কথাগুলো লিখছি কাউকে ছোট বা বড় করতে নয়।
বরং চাই, যে ভুলগুলো ৫০+ বছর ধরে আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে, নতুন প্রজন্ম যেন সেগুলো চিনতে পারে। কারণ ভুল স্বীকার ছাড়া উন্নতি হয় না।

 

 

আমাদের ওরাল হিস্ট্রি—সাধারণ মানুষের দেখা ইতিহাস—একদিন না একদিন লেখা ইতিহাসের অংশ হবেই। আমি শুধু আমার অংশটুকু বলে যাচ্ছি।

     ভোটের গাণিতিক চিত্র:

জনপ্রিয় জনমতের অনুপস্থিতি (সমগ্র পাকিস্তান):

১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। এটি একদিকে গণতন্ত্রের রায় প্রকাশ করলেও, অন্যদিকে এটি ছিল একটি গভীর জাতীয় বিভাজন এবং ভবিষ্যতের অনৈক্যের বীজ।

 

 

সমগ্র পাকিস্তানের নিবন্ধিত ভোটারের নিরিখে মুজিব ম্যাজিকে আওয়ামী লীগ বিশাল আসনে জয়ী হলেও, জনপ্রিয় জনমতের (Popular Vote) নিরিখে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন লাভ করতে পারেনি। আমার এই দাবির পোস্টমর্টেম করতে আমার সাথে হাঁটুন ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ঠিকুজি বের করতে। আমি যে পরিসংখ্যান দিচ্ছি, সেগুলো মনোযোগ দিয়ে মনে গেঁথে রাখুন।

 

 

      মোট নিবন্ধিত ভোটার : (সমগ্র পাকিস্তান) ৫,৬৯,৪১,৫০০ জন।
মোট কাস্ট হওয়া ভোট :(সমগ্র পাকিস্তান) ৩,৩০,০৪,০৬৫ টি।
আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট: (পক্ষে ভোট) ১,২৯,৩৭,১৬২ জন। ২২.৭২% সমর্থন

আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়নি: (বিপক্ষে ভোট + ভোটদানে বিরত) ৪,৩৯,০৪,৩৩৮ জন। ৭৭.১০% সমর্থন পাননি।

পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের ভোটার চিত্র:

পশ্চিম পাকিস্তানের মোট ভোটার ২,৩৭,৩০,২৮০ জন
ভোট দিয়েছেন ১,৫৯,৯৮,৯০২ জন। ভোট দিতে আসেননি ৭৭,৩১,৩৭৮ জন।

পূর্ব পাকিস্তানের মোট ভোটার ছিলেন ২,৯৪,৭৯,৩৮৬ জন।
ভোট দিয়ে ছিলেন ১,৭০,০৫,১৬৩ জন। ভোট দিতে আসেননি ১,২৪,৭৪,২২৩ জন।

      গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ:

সমগ্র পাকিস্তানে অনাস্থা:

পাকিস্তানের ৭৭.১০% প্রাপ্তবয়স্ক নিবন্ধিত নাগরিক আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেননি। মাত্র ২২.৭২% মানুষের ভোটে আওয়ামী লীগ সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন লাভ করেছিল।

পূর্ব পাকিস্তানের অনাস্থা:

পূর্ব পাকিস্তানের ৫৬.১২% নিবন্ধিত ভোটার (১ কোটি ৬৫ লক্ষ ৪২ হাজার ২২৪ জন) হয় ভোট দেননি, নতুবা আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য দলকে ভোট দিয়েছিলেন।

      ভোট না দেওয়ার কারণ:

সন্ত্রাস ও সহিংসতা:

আওয়ামী লীগের ‘জঙ্গি বাহিনী’ (গুন্ডা উইং) কর্তৃক দাড়িওয়ালা, টুপিওয়ালা, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক সহ বিরোধী পক্ষের ভোটারদের নাজেহাল করা হতো, যাতে তারা ভয়ে ভোটকেন্দ্রে না আসে। ​”১৯৭০ সালের নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে ভদ্রতার ভাব বিশ্বমিডিয়া প্রদর্শন করা হলেও নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার সাথে সাথে মাঠে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ—যেমন পিডিপি (নুরুল আমিন), জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম লীগ ও অন্যান্য ইসলামী দল বা পাকিস্তানের অখন্ড রাখা পক্ষের দলগুলো—তাদের প্রচারণায় এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি পায়নি; রাজনৈতিক সন্ত্রাস এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।”

     কারচুপি:

ভোট দিতে না আসা সেই ১ কোটি ২৪ লাখ ৭৪ হাজার ২২৩ জন ভোটারের ভোট আওয়ামী লীগের ছিল না। বরং বিরোধী পক্ষ ভোটকেন্দ্রে আসার আগেই তাদের ভোট কাস্ট করা হয়েছিল। এই না আসা ভোটের ৯৯ ভাগ ছিল আওয়ামী লীগ-বিরুদ্ধ ভোট।

     ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক বাধা:

নারী ভোটারদের ধর্মীয় পর্দার কারণে পুরুষরা কেন্দ্রে নিয়ে আসেননি। কৃষিজীবী শ্রমজীবী মানুষেরা পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য কাজ ফেলে ভোট দিতে আসেননি।

ফাঁকিবাজির সিস্টেম:

আসন বনাম জনমত আওয়ামী লীগ ১৬৭ আসন জিতে রাজনৈতিক বৈধতা পেলেও, জনমত ছিল তাদের বিরুদ্ধে। এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় আসনভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থার (FPTP) চরম সুবিধাবাদী আইনি কাঠামোর জন্য।

উদাহরণস্বরূপ: কোনো এক আসনে যদি ১ লাখ ভোটার থাকেন এবং কোনো কারণে ৯৫ হাজার ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে না আসার ব্যবস্থা করা যায়, তবে কাস্ট হওয়া ভোট থেকে মাত্র ২৫০১টি ভোট পেয়েও একজন প্রার্থী আইনত বিজয়ী হতে পারেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনও তেমনি হয়েছিল।

 

 

আওয়ামী লীগ তাদের প্রায় ৯০% ভোট পূর্ব পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত করে। এই কেন্দ্রীভূত সমর্থন ব্যবহার করে তারা জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে, যদিও জনপ্রিয় জনমত তাদের পক্ষে ছিল না। এই কৌশলটিই ছিল তাদের গণতান্ত্রিক বৈধতা অর্জনের একমাত্র পথ, যা সামরিক জান্তাকে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানাতে সুযোগ করে দেয়। জার্মানির হিটলারও তেমন করেই উগ্রজাতীয়তাবাদী মতাদর্শ প্রচার করে নির্বাচনে জিতে এসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধিয়েছিলেন।

      বিভক্ত চেতনার কাফফারা:

এই নির্বাচনের প্রদত্ত পপুলার ভোটের সংখ্যা প্রমাণ করেছিল যে: অধিকাংশ মানুষ চেয়েছিল স্বায়ত্তশাসন, বিচ্ছেদ নয়: পূর্ব পাকিস্তানের ৫৬.১২% নিবন্ধিত ভোটার আওয়ামী লীগের পক্ষে না থাকায় এটি প্রমাণিত হয় যে, দেশের বৃহত্তর অংশ স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে থাকলেও, বিপ্লবী বা উগ্রজাতীয়তাবাদী তথাকথিত জঙ্গি ছাত্র যুব শ্রমিক উইংগুলোর আদর্শের পক্ষে ছিল না।

পাঠককে এখানে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে—ভোট প্রদান না করার অর্থ এই নয় যে দেশ ভাঙা বা দেশ সৃষ্টির বিষয়ে তাদের কোনো মতামত বা অবস্থান ছিল না। বরং, ভোটদানে বিরত থাকা কোটি কোটি ভোটারের এই নীরবতা ছিল ভয়, হতাশা, এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থার সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ, যা দেশের ভাগ্য নির্ধারণে আরও বড় ভূমিকা রেখেছিল।

       রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে অনৈক্য:

নির্বাচনের পূর্ব শর্ত মোতাবেক ১২০ দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পিপলস পার্টির সাথে সমঝোতায় ব্যর্থ হওয়ায় পাকিস্তানের জন্য সংবিধান প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। এর পরিণতিতে ইয়াহিয়া খানের নিরীহ মানুষের ওপর আক্রমণ শুরু হয়। এরপর অনিচ্ছুক বাঙালিদের প্রতিরোধ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করে, যা মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়।

 

 

ভারতের সার্বিক সহযোগিতায় যে নতুন রাষ্ট্র গঠিত হলো, সে রাষ্ট্রের আদর্শ হিসেবে জোর করে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র ‘ইন্সটল’ করা হলো। সে আদর্শ মোট ভোটারের বৃহৎ অংশ (৫৬.১২%) মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। এই ঐতিহাসিক ভুলের জন্য রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই রাষ্ট্রীয় আদর্শ নিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে অনৈক্য জন্ম নিয়েছিল। ৫৪ বছর পরেও সে বিভেদের দেয়াল আরও উঁচু হচ্ছে।

       কারণ, ‘মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু চেতনাকে হত্যা করা যায় না!’ অস্ত্র দিয়ে ভারতের সহযোগিতায় দেশ সৃষ্টি করা গেলেও মানুষ তার শিকড় ভুলে যায় না।

আপনার কী মনে হয়? যে রাষ্ট্র মাত্র ৪৩.৮৮% ভোটারের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল (পূর্ব পাকিস্তানে), সেখানে কি আজকের বিভাজন এবং রাষ্ট্রীয় আদর্শ নিয়ে দ্বন্দ্ব অনিবার্য ছিল না?

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নতুন মিউজিক ভিডিওতে নতুন রূপে হাজির মডেল দেবজ্যোতি

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা-মহানন্দার পানি বৃদ্ধি: পানিবন্দী আড়াই হাজার পরিবার

ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার: চিফ হুইপ

নওগাঁয় সংবাদ সম্মেলন: প্রতিপক্ষের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এক পরিবার

জুলাই সনদের সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের পথে সরকার: চিফ হুইপ

শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনই লক্ষ্য নয়, আখিরাতের সফলতার জন্যও কাজ করতে হবে: এটিএম আজহার

গুলশানে নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ, গ্রেপ্তার ২

জাপানের কাছে বড় হারে হকি জুনিয়র বিশ্বকাপের স্বপ্নভঙ্গ বাংলাদেশের

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দামে রেকর্ড, পাম্পের ডিসপ্লেতে জায়গা হচ্ছে না নতুন দামের

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মার পানি বৃদ্ধি: আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দী, তলিয়েছে ৩৬২ হেক্টর ফসলি জমি

১০

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫ পদে নিয়োগ: প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকসহ আবেদনের সুযোগ

১১

প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও এনআইডি সেবা সহজ করতে ৪১ দেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ

১২

ভারতের কাছে হেরে এশিয়া কাপ থেকে বিদায় বাংলাদেশের, ব্যাটিং ব্যর্থতায় আক্ষেপ

১৩

ব্যয় সংকোচনের চাপে নিম্নআয়ের মানুষ, আইএমএফের নীতি নিয়ে অক্সফামের উদ্বেগ

১৪

নতুন দায়িত্ব পেলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. মঈন খান

১৫

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠন সম্পন্ন

১৬

গৌরনদীতে শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃক্ষরোপণ: প্রতিটি গাছের অভিভাবক এখন শিক্ষার্থীরা

১৭

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়াল

১৮

ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান মানবিক বিপর্যয় ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতা

১৯

প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন ভ্যাট কাঠামো: ইউনিয়ন পর্যায়ে ৫০০ টাকা করের পরিকল্পনা এনবিআরের

২০
error: Content is protected !!